ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কয়েক দিনের তৎপরতায় ঈদ যাত্রা নিরাপদ হয়?

কয়েক দিনের তৎপরতায় ঈদ যাত্রা নিরাপদ হয়?
×

কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ছবি: মাহবুব খান

বদরুল হাসান

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ২২:৫৩

ঈদে বাড়ি ফেরার তাগাদা শুধু শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার নয়। এ হচ্ছে মায়ের কাছে ফেরা, সন্তানের হাত ধরে উঠোনে দাঁড়ানো, পুরোনো ঘরের গন্ধ নেওয়া, প্রিয়জনের মুখ দেখার তাড়া। সারা বছর যে মানুষ ভাড়া বাড়ি, অফিস, কারখানা, দোকান বা শহরের ব্যস্ততায় কাটিয়ে দেন, ঈদের আগে তাঁর মন পড়ে থাকে একটি জায়গায়—দেশের বাড়ি।

তাই বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন বা মহাসড়কের মানুষের ভিড়কে শুধু ‘চাপ’ বলে বোঝানো যাবে না। সেখানে আছে অপেক্ষা, ক্লান্তি, উদ্বেগ, অভিমান, আনন্দ এবং ঘরে ফেরার এক অদ্ভুত টান। কেউ রাত জেগে টিকিট কাটেন, কেউ বাসের সিট না পেয়ে ইঞ্জিনের পাশে বসেন, কেউ লঞ্চের কেবিন না পেয়ে ডেকের পাটাতনে জায়গা করে নেন। কেউ সন্তানকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, কেউ ব্যাগের ভেতর নতুন কাপড়, সেমাই, খেলনা, মায়ের ওষুধ বা বাবার জন্য পাঞ্জাবি নিয়ে যান।

যখন কোনোভাবে গাড়িতে ওঠা যায়, তখন মানুষের মুখে এক ধরনের স্বস্তি নামে। বাসের জানালার পাশে বসে কেউ ধানক্ষেত, নদী, বাজার, সেতু, গাছপালা দেখতে থাকেন। কেউ ফোনে বলেন, “উঠেছি, রওনা দিয়েছি, চিন্তা করো না।” লঞ্চের ডেকে বসা মানুষও তখন একটু হাঁফ ছাড়েন। মাথার ওপর খোলা আকাশ, সামনে নদী, পাশে অচেনা মানুষ; তবু চোখেমুখে থাকে ঘরে ফেরার আলো। এই আনন্দটুকু যেন ঈদের নামাজ, কোলাকুলি, দুপুরের ভাত, সন্ধ্যার আড্ডা পেরিয়ে আবার কর্মস্থলে ফেরার দিন পর্যন্ত অটুট থাকে—এটাই তো আমাদের সামান্য চাওয়া।

কিন্তু প্রতি বছর এই আনন্দের মাঝখানে দুর্ঘটনার ভয়ংকর সংবাদ এসে দাঁড়ায়। ঈদযাত্রা ও ফিরতি যাত্রায় সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনা, মৃত্যু, আহত মানুষ, কান্না, শোক। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতর যাত্রায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত ও ১,০৪৬ জন আহত হন। একই সময়ে রেল ও নৌপথ মিলিয়ে মোট ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জনের মৃত্যু এবং ১,২৮৮ জন আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। ঈদুল আজহার সময়ও চিত্রটি আলাদা নয়। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহার ছুটিতে যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯০ জন নিহত ও ১,১৮২ জন আহত হন।

সারা বছরের দুর্ঘটনার চিত্রের সঙ্গে ঈদ মৌসুমের এই পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখলে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। সাধারণ সময়েও প্রতিদিন বহু মানুষ সড়কে প্রাণ হারান। কিন্তু ঈদের ১২ থেকে ১৫ দিনের যাত্রায় কয়েকশ মানুষের মৃত্যু দেখায়, উৎসবের সময় ঝুঁকি আরও ঘনীভূত হয়। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনার চিত্র নয়; এটি একটি পুনরাবৃত্ত জাতীয় ব্যর্থতা।

আমরা যারা ঈদে বাড়ি ফিরি না, শহরেই থেকে যাই, আমাদের ঈদের আনন্দও এসব দুর্ঘটনার সংবাদে ম্লান হয়ে যায়। টেলিভিশনের স্ক্রল, ফেসবুকের রিল, অনলাইন পোর্টালের ব্রেকিং নিউজে যখন একের পর এক দুর্ঘটনার খবর আসে, তখন নিজের ঘরে বসে থাকা মানুষও অস্বস্তিতে পড়ে। আমরা হয়তো সেই বাসে ছিলাম না, সেই লঞ্চে উঠিনি, সেই মহাসড়কে চলিনি; তবু বুকের ভেতর একটা চাপা ভয় কাজ করে। কারণ ঈদের পথে থাকা প্রতিটি মানুষই কারও না কারও আপনজন।

আন্তর্জাতিক সড়ক নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের কাতারে দেখা হয়। বাংলাদেশ একা নয়; দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার বহু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশেই সড়ক দুর্ঘটনা বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তবে বাংলাদেশের উদ্বেগ আলাদা, কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুহার দক্ষিণ এশিয়া ও এশিয়া-প্যাসিফিক গড়ের চেয়েও বেশি।

ঈদ মৌসুমে দুর্ঘটনার কারণগুলো আমাদের অজানা নয়। অতিরিক্ত যাত্রী, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের ঘুম ও ভ্রমণক্লান্তি, এক চালক দিয়ে দীর্ঘ পথ চালানো, ফিটনেসবিহীন বাস বা লঞ্চ নামানো, টায়ার-ইঞ্জিন-ব্রেক পরীক্ষা না করা, অদক্ষ চালক, লাইসেন্সবিহীন চালনা, ভাঙা সড়ক, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার বা ধীরগতির যান, টার্মিনালে বিশৃঙ্খলা, টিকিটের বাড়তি চাপ, মালিকের অতিরিক্ত ট্রিপের লোভ—সব মিলিয়ে এক বিপজ্জনক পরিবেশ তৈরি হয়। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, আবহাওয়া সতর্কতা উপেক্ষা করা, জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম না থাকা এবং ডেকের ধারণক্ষমতা না মানাও একইভাবে প্রাণঘাতী।

আরও বড় সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় ঝুঁকিকে নিয়তি মনে করে মেনে নিই। যাত্রী ভাবেন, “যেভাবেই হোক যেতে হবে।” চালক ভাবেন, “আরেকটা ট্রিপ দিলেই মালিক খুশি।” মালিক ভাবেন, “ঈদের সময়ই তো আয়।” কর্তৃপক্ষ ভাবে, “এই কয়েক দিন সামলে গেলেই হলো।” এই ‘যেভাবেই হোক’ সংস্কৃতিই অনেক মৃত্যুর পেছনে থাকে। কিন্তু নিরাপত্তা ছাড়া বাড়ি ফেরা কোনো ঈদযাত্রা নয়; সেটি শুধু ভাগ্যের ওপর ভর করে পথ চলা।

আমাদের করণীয়ও সবার জানা। চালকের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে। অতিরিক্ত গতি, মোবাইল ফোনে কথা বলা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ঘুমঘুম অবস্থায় গাড়ি চালানো কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। যানবাহনের ফিটনেস, ব্রেক, টায়ার, লাইট ও ইঞ্জিন পরীক্ষা ছাড়া দীর্ঘপথে ছাড়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। যাত্রীদেরও অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে ওঠা, ছাদে ওঠা, পণ্যবাহী গাড়িতে ভ্রমণ এবং অনিরাপদ লঞ্চে ওঠা থেকে বিরত থাকতে হবে। মহাসড়কে স্পিড মনিটরিং, হাইওয়ে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি, ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, টার্মিনাল ও ঘাটে যাত্রীসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি চিকিৎসা প্রস্তুতিকে মাঠের বাস্তবতায় পরিণত করতে হবে।

সবকিছু ছাপিয়ে সরকারের দায়টাই সবচেয়ে বড়। কারণ সাধারণ যাত্রী নিজের টিকিটের দাম দিতে পারেন, কিন্তু বাসের ফিটনেস নিশ্চিত করতে পারেন না। তিনি চালককে বিশ্রাম দিতে পারেন না, মহাসড়কের গতি মাপতে পারেন না, লঞ্চের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করতে পারেন না, ভাঙা রাস্তা মেরামত করতে পারেন না, মালিকের অতিরিক্ত মুনাফা থামাতে পারেন না। এগুলো রাষ্ট্রের কাজ। আইন আছে, কর্তৃপক্ষ আছে, বাজেট আছে, পুলিশ আছে, বিআরটিএ আছে, নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ আছে। তাহলে প্রতি ঈদে একই শোক কেন ফিরে আসে?

ঈদের আগে কয়েক দিনের তৎপরতা দিয়ে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। এটি সারা বছরের কাজ। চালকের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং ব্যবস্থার শুদ্ধতা, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, মালিকপক্ষের জবাবদিহি, সড়ক নকশা, মহাসড়কে শৃঙ্খলা, নৌপথের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার তদন্ত ও শাস্তি—সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হবে। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ বা শোকবার্তা যথেষ্ট নয়। মানুষ মরার আগেই ব্যবস্থা নেওয়াই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

তবু আমরা ঈদকে ভয় দিয়ে শেষ করতে চাই না। আমরা চাই, মানুষ ঘরে ফিরুক। বাড়ির উঠোনে পা রাখুক। মা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকুন, বাবা চোখ মুছুন, শিশুরা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরুক। দুপুরে সেমাইয়ের গন্ধ উঠুক, সন্ধ্যায় আত্মীয়স্বজনের আড্ডা বসুক, গ্রামের পথে হাঁটা হোক। যে মানুষটি ঘেমে-নেয়ে মাকে জানিয়েছিলেন, “গাড়ি পেয়েছি, চলে আসছি”, তিনি যেন সত্যিই আবার ফোন করে বলতে পারেন, “মা, পৌঁছে গেছি।”

নিরাপদ যানবাহন চলাচল কোনো বিলাসী দাবি নয়; এটি মানুষের অধিকার, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং সমাজের ন্যূনতম মানবিক প্রতিশ্রুতি। ঈদের পথে থাকা প্রতিটি মানুষই কারও অপেক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। তাই একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি যানবাহন থামায় না; বরং থামিয়ে দেয় জীবনের চিরচঞ্চল গতি।

বদরুল হাসান: উন্নয়ন ও মানবিক নীতিবিশেষজ্ঞ, badrulsocial@gmail.com

আরও পড়ুন

×