ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

শিক্ষাগুরুর শির

শিক্ষাগুরুর শির
×

দেওয়ান সামছুর রহমান

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘আজ হতে চির-উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির’– কাজী কাদের নওয়াজের এই উচ্চারণে একদিন যে শিক্ষক ছিলেন শ্রদ্ধার সর্বোচ্চ আসনে, আজ সেই শিক্ষকের মাথা নত হয় অপমানের ভারে।
যে হাত একদিন ধরে ধরে অক্ষর চিনিয়েছে; যে কণ্ঠ ভুল উচ্চারণ শুধরে দিয়েছে; যে চোখ শিক্ষার্থীর সাফল্যে আনন্দে ভিজে আর ব্যর্থতায় উদ্বিগ্ন হয়; আজ সেই শিক্ষক কখনও শিক্ষার্থীর সামনে অপমানিত, কখনও অভিভাবকের রোষের মুখে, কখনও ক্ষমতাবানদের ধমকের শিকার। কোথাও কোথাও তাঁর গায়ে হাত তোলার দুঃসাহসও দেখা যায়। এটা কি ভাবা যায়, যে মানুষটি নিজের ঘরে অভাব রেখে অন্যের সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব পালন করেন, তাঁর নিজের সম্মানটুকু রক্ষার দায়িত্ব আসলে কার?

সময়ের স্রোতে শিক্ষকের মর্যাদা ধীরে ধীরে সরে গেছে শ্রদ্ধার আসন থেকে; দাঁড়িয়েছে প্রশ্ন, অবিশ্বাস, অবমাননা ও অসম্মান। এই প্রশ্ন শুধু শিক্ষকের নয়; আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মূল্যবোধের। তাই বড় প্রশ্ন, শিক্ষকের শির যদি নত হয়ে যায়, তবে জাতির শির কতটা উঁচু থাকে?

শিক্ষকতা নিঃসন্দেহে একটি পেশা। শিক্ষক তাঁর শ্রম ও মেধার বিনিময়ে বেতন পান। কিন্তু শিক্ষকতাকে কেবল চাকরির সংজ্ঞায় আবদ্ধ করলে এই পেশার প্রকৃত তাৎপর্য হারিয়ে যায়। শিক্ষকতা একই সঙ্গে দায়িত্ব, সেবা, নৈতিক অঙ্গীকার এবং মানুষ গড়ার এক মহান কর্মযজ্ঞ।
একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শুধু পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় শেষ করেন না। তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তার জগৎ তৈরি করেন। ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখান; যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখান; সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে শেখান; অন্যকে সম্মান করতে শেখান।

শিক্ষকও মানুষ; ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তাঁর ভুল হতে পারে। দায়িত্বে অবহেলা থাকেতে পারে। কোনো কোনো শিক্ষক পেশাগত আচরণবিধি লঙ্ঘন করতে পারেন। শিক্ষার্থীর সঙ্গে কোনো শিক্ষক অন্যায় আচরণও করতে পারেন। এসব কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। বরং শিক্ষক যেহেতু মানুষ গড়ার দায়িত্বে আছেন, তাঁর কাছ থেকে সমাজের প্রত্যাশাই বেশি। তাই কোনো শিক্ষক অন্যায় করলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা দরকার– জবাবদিহি আর অপমান এক নয়। বিচার আর প্রতিশোধ এক নয়। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী শাস্তি হবে। প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে একজন শিক্ষককে জনসমক্ষে অপমান, ধমক, হুমকি দেওয়া কিংবা শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আইনের; প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার কারও নেই।

একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষকও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন। তাঁর কাজের মূল্যায়ন হবে। তাঁর ভুল ধরিয়ে দেওয়া হবে। অভিভাবক তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারেন। শিক্ষার্থীও কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারে।
শাসনহীন শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের শিক্ষার্থীদের অতিমাত্রায় উগ্র করে দিচ্ছে। বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীর অধিকার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কোনো শিক্ষার্থীকে শারীরিক নির্যাতন বা অপমান করা গ্রহণযোগ্য নয়।

শিক্ষককে অবশ্যই মানবিক, সংবেদনশীল ও পেশাদার আচরণ করতে হবে। কিন্তু শিক্ষার্থীর অধিকার যেমন আছে, তেমনি দায়িত্বও। শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা সীমাহীন নয়। শ্রেণিকক্ষে নিয়ম মানা, শিক্ষককে সম্মান করা, সহপাঠীর প্রতি দায়িত্বশীল থাকাও শিক্ষার অংশ।
শিক্ষককে শাসনের ক্ষমতা দিতে হবে, তবে সেই শাসন হবে মানবিক, যুক্তিসংগত, আইনসম্মত ও শিক্ষাবান্ধব। শাসন মানে শুধু মারধর নয়; আবার প্রয়োজনে মার দিতে হলে সে অধিকারটুকুও শিক্ষকদের দিতে হবে। সন্তানের মঙ্গলের জন্য যদি পিতামাতা শাসন করতে পারেন, তাহলে শিক্ষকের এ অধিকার থাকা কি অন্যায়?
শাসন মানে ভুলকে ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা এবং সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা।

দেওয়ান সামছুর রহমান: 
লেখক ও শিক্ষক

আরও পড়ুন

×