অর্থনীতি
বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার শক্তি শুধু সস্তা শ্রমেই?
সৈয়দ এরশাদ আহমেদ
সৈয়দ এরশাদ আহমেদ
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
একসময় বিশ্বে শিল্প প্রতিযোগিতার একটি সহজ সূত্র ছিল– যে দেশে শ্রম সস্তা, সেখানে কারখানা যাবে। বাংলাদেশ এ বাস্তবতার অন্যতম বড় সুবিধাভোগী। তৈরি পোশাকশিল্প তার বড় উদাহরণ। কিন্তু সেই পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগামী দিনের কারখানায় একজন শ্রমিকের পাশে হয়তো আরেকজন শ্রমিক থাকবে না। থাকবে একটি যন্ত্র, যে একই কাজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা করতে পারবে। সে ক্লান্ত হবে না, ছুটি চাইবে না এবং একই কাজ বারবার করার সক্ষমতা রাখবে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক এখন হিউম্যানয়েড রোবট। এটি মানুষের আকৃতির এমন যন্ত্র, যা মানুষের জন্য তৈরি পরিবেশে মানুষের মতো বিভিন্ন কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হচ্ছে। চীন এই দৌড়ে যে গতি অর্জন করেছে, তা এখন আর শুধু প্রযুক্তি প্রদর্শনীর বিষয় নয়। এটি শিল্পনীতি, উৎপাদন ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
গত মাসে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব রোবট সম্মেলনে প্রায় তিন হাজার রোবোটিক পণ্য প্রদর্শিত হয়। সেখানে কারখানা, গুদাম, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহনসহ নানা ক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহার তুলে ধরা হয়। একই সম্মেলনে অনুষ্ঠিত মানবাকৃতির রোবট প্রতিযোগিতায় দুই হাজারের বেশি রোবট অংশ নেয়।
হিউম্যানয়েড রোবটের সাফল্যের গল্প শুনলে আমরা প্রায়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা বলি। কিন্তু এর পেছনে আরও একটি শক্তিশালী বিষয় আছে– উৎপাদনের সক্ষমতা। একটি মানবাকৃতির রোবট তৈরি করতে প্রয়োজন মোটর, সেন্সর, ব্যাটারি, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যান্ত্রিক সংযোগ, চিপ, সফটওয়্যার এবং অসংখ্য সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ। চীনের সুবিধা হলো, এসবের অনেক কিছু তাদের আগে থেকেই রয়েছে।
চীন বহু বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্প রোবটের বাজার। আন্তর্জাতিক রোবট ফেডারেশনের হিসাবে, ২০২৪ সালে চীনে প্রায় দুই লাখ ৯৫ হাজার শিল্প রোবট স্থাপন করা হয়েছে, যা ওই বছরের বৈশ্বিক স্থাপনের ৫৪ শতাংশ। দেশটিতে চালু শিল্প রোবটের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ হিউম্যানয়েড রোবট চীনের জন্য শূন্য থেকে শুরু করা কোনো শিল্প নয়। এর পেছনে রয়েছে বিদ্যমান কারখানা, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রকৌশলী, যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার।
২০২৬ সালের বিশ্ব রোবট সম্মেলনে এমনও দেখা গেছে, অত্যাধুনিক বলে প্রদর্শিত একটি রোবট একটি সাধারণ শার্ট ভাঁজ করার কাজেই সমস্যায় পড়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, চীনের রোবট শিল্প এখন প্রদর্শনী ও প্রযুক্তিগত চমক থেকে বেরিয়ে বাস্তব ব্যবসায়িক মূল্য তৈরি করার পরীক্ষায় ঢুকেছে।
প্রশ্ন হলো, রোবট কি একজন মানুষের কাজের নির্দিষ্ট অংশ নির্ভরযোগ্যভাবে করতে পারে? তার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কত? কতক্ষণ কাজ করতে পারে? ভুল করলে ক্ষতি কত? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ– রোবটে বিনিয়োগ করলে কারখানার উৎপাদন খরচ সত্যিই কমবে কিনা? এই পরীক্ষায় এখনও বিশ্ব অনেকটা পিছিয়ে।

চীন উৎপাদন ক্ষমতায় এগিয়ে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত কম্পিউটিং, গবেষণা এবং বিনিয়োগে। আমেরিকার লক্ষ্য অনেকাংশে এমন রোবট তৈরি করা, যা শুধু একটি নির্দিষ্ট কাজ করবে না; বরং মানুষের নির্দেশ বুঝে পরিবেশ অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ করতে পারবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রও বুঝতে পারছে, শুধু মেধা ও সফটওয়্যার দিয়ে হবে না। উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা। এই প্রতিযোগিতা এখন প্রযুক্তির পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়েও পরিণত হয়েছে। গত জুলাইয়ে মার্কিন ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন বিদেশে তৈরি কিছু উন্নত রোবটকে নিরাপত্তাজনিত কারণে তার নিষিদ্ধ তালিকায় যুক্ত করে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের রোবট প্রতিযোগিতা একই সঙ্গে প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিযোগিতা।
বাংলাদেশের করণীয়
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ সামনে। সরকার ইতোমধ্যে উত্তরণের প্রস্তুতি-সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমিটি অতিরিক্ত সময় দেওয়ার পক্ষে সুপারিশ করেছে। এই বাড়তি সময় বাংলাদেশের জন্য শুধু সময় কেনার সুযোগ নয়; অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার সুযোগ। কিন্তু যদি আমরা এখনও মনে করি, আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রধান শক্তি শুধু কম মজুরি, তাহলে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে শ্রমনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বলা হয়েছে, অটোমেশন, রোবট, ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ এবং নতুন প্রযুক্তি বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থাকে বদলে দেবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য প্রযুক্তি গ্রহণ জরুরি। তাই রোবটকে আমাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখলে চলবে না। আমাদের দেখতে হবে রোবটকে কীভাবে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার শক্তিতে পরিণত করা যায়।
বাংলাদেশের চীনের সঙ্গে সরাসরি রোবট তৈরির প্রতিযোগিতায় নামা উচিত নয়। আমাদের পুঁজি, গবেষণা অবকাঠামো, উপকরণ শিল্প, বাজার– কোনোটিই এখন সেই পর্যায়ে নেই। কিন্তু পুরো রোবট না বানিয়েও আমরা এই নতুন শিল্পের অংশ হতে পারি। প্রথম সুযোগ যন্ত্রাংশ। মোটর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, তারের সংযোগ, সেন্সর, গ্রিপার, ব্যাটারি-সংক্রান্ত যন্ত্রাংশ, ধাতব কাঠামো এবং বিভিন্ন উপযন্ত্রাংশ তৈরিতে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে।
দ্বিতীয় সুযোগ সফটওয়্যার ও রোবট প্রশিক্ষণ। একটি রোবটকে শুধু তৈরি করলে সে কাজ শিখে যায় না। তাকে নির্দিষ্ট কাজের তথ্য ও প্রশিক্ষণ দিতে হয়; ভুল থেকে শেখাতে হয়। এখানে বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলী, সফটওয়্যার কর্মী এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় সুযোগ রোবট ব্যবহার ও সংযোজন। আমাদের পোশাক কারখানা, গুদাম, বন্দর, ওষুধশিল্প এবং অন্যান্য উৎপাদন খাতে কোথায় রোবট ব্যবহার করলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে– সেই বিষয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে। সরকার চাইলে নির্বাচিত শিল্পাঞ্চলে রোবট পরীক্ষা কেন্দ্র তৈরি করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিকে একসঙ্গে এনে ছোট পরিসরে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
এই প্রশ্নটি সবচেয়ে স্বাভাবিক। উত্তরটি সরল নয়। কিছু কাজ অবশ্যই যন্ত্রের হাতে যাবে। বিশেষ করে একই ধরনের, পুনরাবৃত্তিমূলক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কিন্তু প্রযুক্তি একই সঙ্গে নতুন কাজও তৈরি করে– রোবট পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রোগ্রামিং, তথ্য বিশ্লেষণ, মান নিয়ন্ত্রণ, যন্ত্রপাতি মেরামত এবং নতুন ধরনের ব্যবস্থাপনা। সমস্যা রোবট নয়। সমস্যা হবে যদি রোবট আসে, কিন্তু আমাদের কর্মীরা নতুন দক্ষতা না পান। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত শুধু যন্ত্র কেনায় নয়; মানুষকে নতুন প্রযুক্তির উপযোগী করে তোলায়।
চীন আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তৈরি করেছে। তারা রোবট শিল্পকে শুধু প্রযুক্তির বিষয় হিসেবে দেখেনি। এটিকে শিল্পনীতি, উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তবে তাদের পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। মঞ্চে রোবটের দৌড় যতই চমকপ্রদ হোক, কারখানায় প্রতিদিন নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করাই হবে আসল পরীক্ষা।
এলডিসি থেকে উত্তরণ সামনে রেখে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে– আমরা কি আগামী দশকেও শুধু কম মজুরির শ্রমের ওপর প্রতিযোগিতা করব; নাকি উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি ও দক্ষতার ওপর নতুন প্রতিযোগিতার ভিত্তি তৈরি করব?
ভবিষ্যতের কারখানায় মানুষ এবং রোবট একে অপরের বিকল্প– এমন ধারণা হয়তো খুব সরল। বরং বাস্তবতা হতে পারে আরও জটিল। যে শ্রমিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে জানবে, সে সেই শ্রমিকের চেয়ে এগিয়ে থাকবে, যে প্রযুক্তিকে ভয় পাবে।
সৈয়দ এরশাদ আহমেদ: ফিকি এবং অ্যামচ্যামের সাবেক সভাপতি
- বিষয় :
- অর্থনীতি