চারণভূমি ডুবে যাওয়ায় গবাদি পশু নিয়ে বিপদে হাজারো খামারি
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
উজান থেকে আসা ঢলের তোড়ে পদ্মা নদীর পানি হু-হু করে বাড়ছে। এতে ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী, লক্ষ্মীকুণ্ডা ও সাঁড়া ইউনিয়নের অন্তত ৮টি গোচারণভূমি নদীতে তলিয়ে গেছে। গবাদি পশু নিয়ে বিপদে পড়েছেন হাজারো খামারি ও রাখাল। গো-খাদ্যের তীব্র সংকটের কারণে এখন পশুর পাল নিয়ে ছুটছেন শহর ও শহরতলির লোকালয়ে।
খামারিদের দাবি, গত এক দশকের মধ্যে এমন ভোগান্তির মুখে পড়েননি তারা। এখন তাদের দিন-রাত কাটছে পথে পথে। এ দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
চরাঞ্চলের স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী বর্ষায় কিছুটা পানি উঠলেও অল্প সময়ের মধ্যে তা নেমে যায়। তবে এবার পরিস্থিতির ভিন্নতা দেখছেন খামারিরা। সাঁড়া ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের খামারি লাল মিয়া মণ্ডল তাঁর ২২টি মহিষ নিয়ে চারণভূমি হারিয়ে গত ১০ দিন ধরে পথে পথে দিন-রাত কাটাচ্ছেন। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর পদ্মার চরে পানি উঠলেও ১৫ দিন থেকে এক মাসের মধ্যে তা নেমে যায়। এবার চর থেকে পানি পুরোপুরি নামতে অন্তত দুই থেকে তিন মাস লাগবে। নতুন ঘাস গজাতে লাগবে আরও এক মাস। ফলে এবার আমাদের দুর্ভোগ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে।’
আক্ষেপের সুর লক্ষ্য করা গেছে লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের পাকুড়িয়া গ্রামের কৃষক জলিল মালিথার কণ্ঠেও। তিনি জানান, চরের খামারিরা মূলত প্রাকৃতিকভাবে গজানো ঘাস ও লতাপাতা খাইয়ে পশু পালন করেন। বাজার থেকে বাড়তি দামে কেনা খাদ্য কিনে পশুকে খাওয়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য বেশির ভাগ খামারিরই নেই। চারণভূমি ডুবে যাওয়ায় খাদ্য সংগ্রহের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
সাহাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এমলাক হোসেন বাবু জানান, সাহাপুর, লক্ষ্মীকুণ্ডা, পাকশী ও সাঁড়া ইউনিয়ন পদ্মা নদীর তীরবর্তী হওয়ায় চরের বিস্তীর্ণ এলাকা সারাবছর গবাদি পশুর চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে অন্যান্য বর্ষার তুলনায় এবার পানি বেশি। ফলে পুরো চরাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় চরম গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষক ও খামারিদের গবাদি পশুর নিরাপদ খাদ্য সুনিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পরিষদের মাসিক সভায় বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ঈশ্বরদীতে পদ্মার পানি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শিব্বির আহমেদ জানান, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। গতকাল বৃহস্পতিবার সর্বশেষ পরিমাপ অনুযায়ী পানির প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ৮৬ মিটার; যা বিপৎসীমার মাত্র ৯৬ সেন্টিমিটার নিচে। বর্তমানে পাকশী পয়েন্টে ১৫ লাখ ৭০ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
হঠাৎ নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলের বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয় ও উঁচু বাঁধের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। খবর নিয়ে জানা যায়, ঈশ্বরদীর সাঁড়া ইউনিয়নের চরাঞ্চলে প্রায় ৬৫টি পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করে। চর প্লাবিত হওয়ায় তাদের প্রায় এক হাজার মহিষ, পাঁচশ থেকে ছয়শ গরু, পাঁচশ ছাগল-ভেড়া এবং আড়াইশ হাঁস-মুরগি প্রচণ্ড ঝুঁকিতে পড়েছে। চর ডুবে যাওয়ায় খামারি বজলুর রহমানের মতো অনেকে তড়িঘড়ি করে নিজেদের গবাদি পশু সরিয়ে লোকালয়ে নিয়ে এসেছেন।
চরাঞ্চলের এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে মাঠে নেমেছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর। ইতোমধ্যে একটি প্রতিনিধি দল ট্রলার ও নৌকাযোগে সাঁড়ার ‘চরজাজিরা’ এলাকা পরিদর্শন করে খামারিদের সার্বিক খোঁজখবর নিয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন জানান, দু-একটি পরিবার ছাড়া চরাঞ্চলের প্রায় সব খামারি তাদের পশু-পাখি নিরাপদে সরিয়ে নিতে পেরেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘বন্যার এই সময়ে খাদ্য সংকট মোকাবিলায় খামারিদের কেনা ভুষি, ধৈঞ্চা, আখ, গমের খোসা ও গামা ঘাস ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্যোগের সময়ে গবাদি পশুর মহামারি রোধে আমাদের দপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, জরুরি টিকাদান এবং কৃমিনাশক ওষুধ প্রয়োগে খামারিদের সার্বিক সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।’
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আসাদুজ্জামান সরকার জানান, প্লাবিত ও নিচু অঞ্চলের যেসব কৃষক ও খামারিরা গবাদি পশু নিয়ে সংকটে পড়েছেন, সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মাধ্যমে তাদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যে এলাকায় গবাদি পশুর সংখ্যা বেশি, সেখানে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে। পাশাপাশি নিচু ও প্লাবিত এলাকার গবাদি পশুর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- খামারি