ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রশাসনের চিঠিতে হাওর ভাতা উত্তোলনকারীদের অস্বস্তি

প্রশাসনের চিঠিতে হাওর ভাতা উত্তোলনকারীদের অস্বস্তি
×

 আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

তাহিরপুর উপজেলায় সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের হাওর-ভাতা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগে যারা হাওর ভাতা তুলেছেন তাদের ভাতা আদায়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের সব দপ্তরের প্রধান/ডিডিওকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এমন নির্দেশে অস্বস্তিতে পড়েছেন ভাতা উত্তোলনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

গতকাল বুধবার পাওয়া তথ্য হতে জানা যায়, এই চিঠি দিয়েছেন তাহিরপুর উপজেলা হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা (অ.দা.) শাহ আলম। চিটিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ গেজেট ডিসেম্বর ২৫, ২০২২ সালের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন কর্মচারীদের সুষ্ঠুভাবে পদায়নের লক্ষ্যে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন কর্মচারীদের সুষ্ঠুভাবে পদায়নের লক্ষ্যে উপজেলাগুলো ক, খ এবং গ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। পরিশিষ্ট গ অনুযায়ী পার্বত্য/নবসৃষ্ট/ হাওর/দ্বীপ/চর/সমুদ্র উপকূলবর্তী ও দুর্গম উপজেলাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয় যা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ঘোষিত উপজেলাগুলোর বাইরের কয়েকটি উপজেলা অন্তর্ভুক্ত করে।

চিঠিতে বলা হয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ঘোষিত উপজেলাগুলোর বাইরের অন্তর্ভুক্ত হাওর উপজেলাগুলোর হাওর ভাতা প্রদান-সংক্রান্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন না থাকায় নতুন অন্তর্ভুক্ত হাওর উপজেলাগুলোর হাওর ভাতা প্রাপ্য নয়। এরমধ্যে তাহিরপুর উপজেলায় কর্মরত যে সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী নতুন অন্তর্ভুক্ত হাওর উপজেলা (তাহিরপুর) হাওর ভাতা গ্রহণ করেছেন তা বন্ধ করত আগে গৃহীত হাওর ভাতা আদায়ের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সব অফিস প্রধান/ডিডিওকে অনুরোধ জানানো হয়।
জানা যায়, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ১১টি জেলার ১৬টি উপজেলাকে হাওর দ্বীপ ও চর উপজেলা হিসাবে ঘোষণা করা হয়। এর প্রেক্ষিতে ৫ মে ২০১৯ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয় হাওর, দ্বীপ, চর ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে এবং তারা এখনও পেয়ে যাচ্ছেন।
পরে ২০২২ সালের ২৫ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দ্বিতীয় পর্যায়ে পার্বত্য/নবসৃষ্ট/ হাওর/দ্বীপ/চর/সমুদ্র উপকূলবর্তী উপজেলাগুলো নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ ২০১৯ সালের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ১৬টি উপজেলার সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী হাওর, দ্বীপ, চরভাতা পাবেন। ২০২২ সালের জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের প্রজ্ঞাপনে দ্বিতীয় পর্যায়ের পার্বত্য/নবসৃষ্ট/ হাওর/দ্বীপ/চর/সমুদ্র উপকূলবর্তী উপজেলাগুলো হাওর-ভাতা পাবেন না।

এ বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পিআরএলে থাকা স্বাস্থ্য পরিদর্শক বিকাশ রঞ্জন তালুকদার সামাজিক মাধ্যমে একটি খোলা চিঠিতে লিখেন, তাহিরপুরের হাওর ভাতা– দায় কার? তাহিরপুরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাওর-ভাতা বন্ধ এবং এরমধ্যে গ্রহণ করা ভাতা ফেরত নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়– দায়টা কার? একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী তো নিজে থেকে সরকারি কোষাগার থেকে টাকা নেননি। অফিস বিল করেছে, কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেছে, হিসাবরক্ষণ কার্যালয় যাচাই করেছে, তারপর সরকারি প্রক্রিয়ায় ভাতা পরিশোধ হয়েছে।
তিনি লিখেছেন– এখন যদি বলা হয়, ‘ভাতা ভুলভাবে দেওয়া হয়েছে, ফেরত দিন’ তাহলে আগে জানতে চাই: ভুলটি করেছিলেন কে? সিদ্ধান্তের দায় নেবে কে? যারা আজ অবসরপ্রাপ্ত– পিআরএল জীবনে একই সরকারি প্রক্রিয়ায় এই ভাতা পেয়েছি, তাদের কাছ থেকেও যদি টাকা ফেরত চাওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন আরও গুরুতর। সরকারি ব্যবস্থার ভুলের দায় কি একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষের ওপর চাপানো ন্যায়সংগত?

তারা চান– সুস্পষ্ট সরকারি আদেশ, বিধিসম্মত সিদ্ধান্ত, যথাযথ দায় নির্ধারণ এবং বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি ন্যায়সংগত ও মানবিক আচরণ। তাহিরপুরের হাওর ভাতা নিয়ে সিদ্ধান্ত হোক বিধি, যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে– শুধু একটি অফিস আদেশের ভিত্তিতে নয়। কারণ প্রশ্নটি শুধু একটি ভাতার নয়– প্রশ্নটি প্রশাসনিক জবাবদিহিতার।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার শরীফ হোসাইন বলেন, তিনি তাহিরপুরে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে চাকরিতে যোগদান করে প্রতি মাসে চার হাজার ৪০০ টাকা করে হাওর ভাতা উত্তোলন করেছেন। চিঠির আলোকে তাঁকে প্রায় ৮০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি অজয় কুমার দে বলেন, উপজেলার সব শিক্ষক হাওর ভাতা পাওয়ার জন্য অনেক আন্দোলন করেছেন। ভাতা তারা না পাওয়ায় তাদের জন্য ভালো হয়েছে। ফেরত দিলে তাদের অনেক জ্বালা বাড়ত। শাহগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুবাশ্বির আলী বলেন, হাওরের উপজেলা তাহিরপুর। বর্ষায় বিশাল ঢেউ আর জলরাশি উপেক্ষা করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে যেতে হয়। তাহিরপুরের সরকারি চাকরিজীবীরা হাওর ভাতা না পাওয়া দুঃখজনক। 
স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকেই বলছেন, সারাদেশের মানুষ হাওর দেখতে তাহিরপুরে আসে। যা প্রমাণ করে এই অঞ্চলে হাওরের বিস্তৃতি সবচেয়ে বেশি। সেখানে কর্মরত ব্যক্তিরা হাওর ভাতা না পাওয়ার কারণ দেখেন না। এমন কিছু হলে এখানে ভালো কর্মকর্তা-কর্মাচারীরা কেন আসবেন সেবা দিতে?
তাহিরপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (অ.দা.) শাহ আলম বলেন, উপজেলার বিভিন্ন অফিসের বরাদ্দের চিঠি পেয়ে হিসাব রক্ষণ অফিস হাওর ভাতা প্রদান করেছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না থাকায় আগে নেওয়া হাওর ভাতা আদায়ের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সব অফিস প্রধান/ডিডিওকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
 

আরও পড়ুন

×