জিডিপিতে নারীর কাজের অবদান
ড. আতিউর রহমান
প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৭
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
শিক্ষার বিভিন্ন স্তরেই মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ার ফলে নারী এখন প্রশাসনসহ
নানা ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান। তাছাড়া আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারেও আমাদের দেশের
নারীর অংশগ্রহণ আশপাশের দেশগুলো থেকে অনেকটাই বেশি। এ কারণে বাংলাদেশের
নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে। প্রতি বছর জাতিসংঘ থেকে যে 'জেন্ডার গ্যাপ'
বিশ্নেষণ হয় তাতেও দেখা যায়, বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশ থেকে
এগিয়ে। নারীর স্বাস্থ্য ও প্রজনন সম্পর্কিত সূচকগুলোতেও বাংলাদেশের অর্জন
চোখে পড়ার মতো। তাছাড়া ২০১১ সালের বাংলাদেশ নারী উন্নয়ন নীতিমালা গ্রহণ করে
নারীর অবস্থানকে আরও জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। তা সত্ত্বেও সমাজে ও
সংসারে নারীকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগোতে হচ্ছে। এখনও নারীর ওপর
নানামাত্রিক সহিংসতা বিদ্যমান। হালে নারী শিশুরাও এই সহিংসতা ও পুরুষের
মানসিক বিকৃতির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। আর বাল্যবিয়ের চাপ তো আছেই। এসব
কারণে যে মাত্রায় নারীর ক্ষমতায়ন হওয়ার কথা ছিল, তা হতে পারছে না। নারীর
ওপর অন্যায় অত্যাচারের কারণে তাদের নিরন্তর এক ভয়ের রাজ্যেই বাস করতে
হচ্ছে। স্বাধীনতার পুরো স্বাদ তারা সেই অর্থে গ্রহণ করার সুযোগই পাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদরা বলতে চান যে, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়লে হয়তো এ
পরিস্থিতির আরেকটু উন্নতি হতো। তবে নারী তো শুধু বাজারের জন্যই কাজ করে না।
ঘরে-বাইরে নারী এমন অনেক কাজ করেন, যার সঠিক অর্থমূল্য মেলে না। হিসাবায়ন
হয় না। আর তাই এসব কাজের অবদান দেশের জিডিপির হিসাবেও আসে না। নারীর
উৎপাদনশীল ও তার বাইরের অনেক কাজের ছায়ামূল্য থাকার কথা। কিন্তু এখনও
পর্যন্ত জিডিপি মাপার সময় ওই মূল্য ধরা হয় না। তাই মনে করা হয়, নারীর কাজ
জিডিপিতে কাঙ্ক্ষিত হারে অবদান রাখে না। নারীর পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান
মূল্যায়নে এই হিসাবায়নের প্রভাব গিয়ে পড়ে। ঘরে নারীকে যে একঘেয়ে কাজ দিনের
পর দিন করতে হয়, তার ফলে সমাজ ও অর্থনীতিতে তার যে অবদানের সুযোগ ছিল, তা
থেকে তিনি বঞ্চিত হন। তার শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়।
আয়-রোজগারের সুযোগ কমে যাওয়ায় সমাজে ও সংসারে তার ওপর যে সহিংসতা নেমে আসে,
তা এক কথায় ভয়ংকর। অথচ সমাজই তার বাইরে বেরোনোর পথে সামাজিক রীতিনীতির
নামে অযথা দেয়াল তুলে রেখেছে। এমনকি শিক্ষিত নারীও এই সামাজিক
প্রতিবন্ধকতার শিকার।
সে কারণেই জিডিপিতে নারীর কাজের অবদান কতটা, তা মাপার উদ্যোগ হালে অনেক
দেশের অর্থনীতিবিদরাই নিতে শুরু করেছেন। এখনও সঠিক পদ্ধতি খুঁজে না পেলেও
জিডিপির হিসাবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু অগ্রগতির সন্ধান মিলতে শুরু করেছে।
আমাদের দেশেও এ নিয়ে ভাবনাচিন্তা হচ্ছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে, ড. প্রতিমা
পাল মজুমদার ও আমি বিআইডিএস থেকে জেন্ডার বাজেটিং নিয়ে গবেষণার সূত্রপাত
করেছিলাম। দেরিতে হলেও বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর হিস্যা
নিয়ে বাজেট প্রণেতারা বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন। গবেষকরাও এ বিষয়ে কাজ করতে
এগিয়ে আসছেন। ক'দিন আগে সানেম আয়োজিত এক সম্মেলনের উদ্বোধন করতে গিয়ে এ
বিষয়ে বেশ কিছু নতুন ভাবনার খোঁজ পেলাম। ড. সেলিম রায়হান ও ড. সায়েমা হকের
নেতৃত্বে গবেষণা কর্মটির আর্থিক সমর্থন দিয়েছে 'মানুষের জন্য'। এই কাজের
অনুপ্রেরণা এসেছে এসডিজি-৫-এর অনুশাসন থেকে। এই এসডিজিতে বলা হয়েছে যে,
নারীর 'আনপেইড সার্ভিস' ও গৃহস্থালি কাজের অবদানের স্বীকৃতি দিতে হবে। সব
ধরনের কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে। আর এই স্বীকৃতি মিললেই সমাজে নারীর অবস্থান
উন্নত হবে এবং তার ওপর সহিংসতাও কমে আসবে। তবে নারী সংসারে যে সেবা দেয়,
তার অর্থমূল্য নির্ধারণ করা মোটেও সহজ নয়। আর সে জন্যই শ্রমবাজারে নারীর
অংশগ্রহণের হার বরাবরই কম দেখানো হয়। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্যই
গবেষকরা 'ছায়া হিসাব'-এর মাধ্যমে জিডিপিতে নারীর অবদানের একটা অঙ্ক দাঁড়
করানোর চেষ্টা করছেন। সানেম গবেষক দল এই গবেষণায় একটি হিসাব পদ্ধতি দাঁড়
করিয়েছেন। এ হিসাবটি যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হয়। 
নারীর কাজের অর্থনৈতিক অবদান তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়- ক. মজুরির বিনিময়
এবং স্বনিয়োজন-নির্ভর 'পেইড' কাজ, যা শ্রমশক্তি হিসেবে গণ্য করা হয় এবং
জাতীয় হিসেবে যুক্ত হয়; খ. 'আনপেইড' পারিবারিক কাজ, যা জাতীয় হিসাব যুক্ত
হয়; কিন্তু কোনো মজুরি মেলে না; গ. 'আনপেইড' ও অস্বীকৃত গৃহস্থালি কাজ, যা
বাজারজাত করা হয় না। জিডিপিতে যুক্ত হয় না। শ্রমশক্তি হিসাবেও গণ্য হয় না।
গৃহস্থালি যে কাজের বেতন দেওয়া হয় না, তার হিসাবায়ন করা সহজ নয়। এই কাজের
বাজারমূল্য ঠিক করাও তাই কষ্টসাধ্য। সে জন্যই এ কাজের 'ছায়া হিসাব' তৈরি
করা হয়। 'ছায়া হিসাব'-এর মাধ্যমে নারীর গৃহস্থালি কাজের সম্ভাব্য মূল্য
স্থির করা সম্ভব। আগে উল্লিখিত তিন শ্রেণির অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের মূল্য
হিসাব করে তারা পেয়েছে যে, এমন কাজের পুরুষের ভাগ জিডিপির ৯ শতাংশ এবং নারী
৩৯.৫৫ শতাংশ। উভয়ে মিলে ৪৮ শতাংশ। বলা যায় প্রায় অর্ধেকটাই।
আজকাল অবশ্য বাজেটে নারীর অবদানের কথা স্বীকার করা হয়। তাদের পক্ষে সুযোগ
বাড়ানোর জন্য নানা ধরনের কর্মসূচিও নেওয়া হয়। তবে প্রশাসনে নারীর সংখ্যা কম
বলে নারীবান্ধব অনেক প্রকল্পের সুফল নারীর কাজে অনেক সময় ঠিকমতো পৌঁছানো
যায় না। নারীবান্ধব সহায়ক সার্ভিসের (যেমন উপযুক্ত ডে-কেয়ার সেন্টার) অভাবে
অনেক নারীকর্মী মন দিয়ে কাজও করতে পারেন না। এ ধরনের সুযোগের অভাবে অনেক
প্রশিক্ষিত নারীও মূলধারার কাজে যোগদান করতে চান না। অন্যদিকে যেসব
শ্রমজীবী নারী ঘণ্টা ধরে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে যান, তাদের বাচ্চাদেরও
দেখভালের কোনো বন্দোবস্ত নেই। সরকার ও সিটি করপোরেশন, ব্যক্তি খাতের সিএসআর
ব্যবহারকারী সমাজকর্মীরা এমন কেন্দ্র সহজেই গড়ে তুলে নারীর শ্রমবাজারে
প্রবেশের পথকে প্রসারিত করতে পারে। আমাদের মূল শিল্প গার্মেন্ট নারী
শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত থাকার সুযোগ, তাদের সন্তানদের জন্য শিশু যত্ন
কেন্দ্র, লেখাপড়ার সুযোগের দিকেও জেন্ডার বাজেট প্রয়োজনীয় নজর দেয়, সে কথা
বলা যাবে না। অবশ্য অনেক শিল্প কারখানায় এমন সুযোগ বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ
করে, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর থেকে।
ভালো জেন্ডার বাজেট তৈরি করার পূর্বশর্ত হলো, ভালো তথ্যভাণ্ডার। সময়
ব্যবহার করার ডায়েরিভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করার নিবিড় উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ
ধরনের তথ্যভাণ্ডার গড়া সহজ হবে। জিডিপি হিসাবকে আরও নারীবান্ধব করার জন্য
উপযুক্ত নীতিমালা সংস্কারের লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞ একটি কমিটি গঠন করা যেতে
পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোই এ উদ্যোগ নিতে পারে। অফিসের সময় শেষ
হওয়ার পরও যেন নারীকর্মীদের ধরে না রাখা হয়, সে রকম একটা উদ্যোগ আমরা
ব্যাংকিং খাতে নিয়েছিলাম। জানি না এখনও সেই নিয়ম চালু আছে কিনা। যারা
নারীবান্ধব সুযোগ সৃষ্টি করবে, সেসব ব্যক্তি খাতকে বাড়তি কর সুবিধা, ঋণ
সুবিধা প্রদানের সুযোগ সরকারকে করে দিতে হবে।
নারীর অবৈতনিক কাজের গুরুত্ব কতটা, তা বোঝানোর জন্য সরকার তথ্যাভিযান
চালাতে পারে। এনজিও, সংবাদমাধ্যমও এ কাজে সরকারের সহযোগী হতে পারে। পরিবারও
নারীর কাজের গুরুত্ব অনুধাবনে এবং নেতিবাচক সামাজিক বাধা দূর করতে সহায়ক
ভূমিকা পালন করতে পারে। শিক্ষাসূচিতে নারীবান্ধব কর্মকাণ্ডের কথা এমনভাবে
তুলে আনা যায়, যাতে ছোটবেলা থেকেই নারীর এই কাজের অবদানের পক্ষে
ছেলেমেয়েদের মনবদল ঘটে। উপযুক্ত স্বীকৃতির চাহিদা তৈরি হয়। সবশেষে বলব,
বাজেট দেওয়ার সময় নারীর ক্ষমতায়নের কথাটি অর্থমন্ত্রী যদি শুরুতেই গুছিয়ে
বলেন, তাহলে তার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সব সরকারি কর্মকর্তার ওপর নিশ্চয়
পড়বে। সমাজেরও মনবদলে সহায়ক হবে। জাতীয় বাজেটে ও পরিকল্পনায় অবৈতনিক শ্রমের
মূল্যের চলমান অনুপস্থিতির কথা স্পষ্ট করে বলতে হবে। সেবা শিল্পের জন্য
সার্ভিসগুলোর উন্নয়নে বাজেটে বাড়তি নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তাছাড়া সমাজও
এদিকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারে। এর মধ্যে খবরে দেখলাম যে, একটি এনজিও ৫০ জন
নারীকে নিয়ে জামালপুরের এক গ্রামে নারী বাজার গড়ে তুলেছে। নারী ব্যবসায়ীরা
সব ধরনের পণ্য বিক্রি করছেন। এভাবে সংগঠিত নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতিতে
সমাজ নারীর উদ্যম ও সম্মান দুই-ই বাড়ানোর জন্য দারুণ উদ্ভাবনীমূলক উদ্যোগ
গ্রহণ করায় নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্র প্রসারিত হচ্ছে। সমাজ-সংসার-সরকার
একযোগে কাজ করলে নিশ্চয় জিডিপিতে নারীর কাজের অবদানের স্বীকৃতি আরও স্পষ্ট
করা সম্ভব হবে।
অর্থনীতিবিদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ
ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
dratiur@gmail.com
- বিষয় :
- সমতা
- ড. আতিউর রহমান