ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া
নির্বিচারে জাল টানায় হুমকির মুখে বড়বিলার জীববৈচিত্র্য
ফুলবাড়িয়ার বড়বিলায় নিষিদ্ধ জালে মাছ শিকার। সম্প্রতি তোলা ছবি: সমকাল
কবীর উদ্দিন সরকার হারুন, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৪৬
ময়মনসিংহের বৃহৎ জলমহাল ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বড়বিলা। যা স্থানীয়দের কাছে ‘পদ্ম বিল’ নামে পরিচিত। একসময় বিস্তীর্ণ বিলে ফুটে থাকা পদ্ম, শাপলা। পাখির আনাগোনায় মুখর থাকত বিলটি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে এখনও দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। তবে সেই সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য নানা কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। বিল জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে সম্প্রতি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল হোসেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ– নির্বিচারে মাছ শিকার, বেড়জাল টানার সময় পদ্ম-শাপলা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ উপড়ে ফেলা, বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম জাল ব্যবহার এবং বিল-সংলগ্ন খামারের বর্জ্য পানিতে ফেলার কারণে বড়বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য সরকারি অর্থায়নে নির্মিত সড়কের একটি অংশ ফিশারির কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
জালের টানে উঠে আসে জলজ উদ্ভিদ
মাছ ধরার জন্য বিলের পানিতে বেড়জাল টানার সময় মাছের সঙ্গে অসংখ্য পদ্ম, শাপলা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ উঠে আসে। এতে বিলের সৌন্দর্য ও জলজ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন অভিযোগ করেন, দিনের বেলায় জাল টানায় বাধা দেওয়া হলে কখনও কখনও রাতে একই কাজ চালানো হয়। ফলে নিয়মিত নজরদারি না থাকায় বিলের জলজ উদ্ভিদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সূক্ষ্ম জালে পোনা নিধন
বিলে মাছ শিকারে বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম জাল ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া এক অভিযোগে চায়না ভাইড়, মেজিক ভাইড় ও জম ভাইড়সহ বিভিন্ন মাছ ধরার উপকরণ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব জালে বড় মাছের পাশাপাশি ছোট মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও আটকা পড়ছে। এতে দেশীয় মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তারে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ এখনও পাননি তিনি। তবে বড়বিলে কী ধরনের জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে, তা সরেজমিন যাচাই করা হবে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফিশারির কাজে সরকারি সড়ক
বড়বিলের পশ্চিম পাড়ের হাতিলেইট অংশে দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য সরকারি অর্থায়নে নির্মিত একটি সড়কের অংশ ফিশারির পাড় হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের শঙ্কা, দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য নির্মিত সড়ক এভাবে মাছের ঘের বা ফিশারির কাজে ব্যবহার করলে সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
খামারের বর্জ্যে দূষণের শঙ্কা
বড়বিলের চারপাশে গড়ে ওঠা লেয়ার মুরগি ও গরুর খামারের বর্জ্য নিয়েও রয়েছে স্থানীয়দের উদ্বেগ। তাদের অভিযোগ, কয়েকটি খামারের বিষ্ঠা ও অন্যান্য বর্জ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরাসরি বিলের পানিতে গিয়ে পড়ছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, এসব বর্জ্যের কারণে পানির গুণগত মান পরিবর্তিত হলে মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও অন্যান্য জলজ প্রাণির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
বিলের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দাবি
স্থানীয়রা জানান, মাছ আহরণ পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে নিয়ম মেনে মাছ ধরা, নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর জাল ব্যবহার বন্ধ, পদ্ম-শাপলা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ, খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি সড়ক রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। ফুলবাড়িয়ার ইউএনও শহিদুল ইসলাম সোহগ বলেন, একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সোমবার (আজ) সকালে বড়বিলার পাড়ে স্থানীয়দের নিয়ে আলোচনাসহ মাছের পোনা অবমুক্ত করবেন তারা।
- বিষয় :
- ময়মনসিংহ