ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদের বিষময় ফল

ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদের বিষময় ফল
×

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২২ | ১৫:০২

এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে নড়াইলে দুটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটল। ১৬ জুন জেলার সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষকে মুসলমানদের 'ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত' দেওয়ার অভিযোগে এক দল পুলিশ ও জনতার সামনে গলায় জুতার মালা পরিয়ে ন্যক্কারজনকভাবে হাঁটানো হয়। ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই গত ১৫ জুলাই শুক্রবার লোহাগড়ার দিঘলিয়ায় এক হিন্দুপল্লিতে একই ধরনের অভিযোগে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হলো। বাংলাদেশে যে কয়টি জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস তুলনামূলক বেশি, সেগুলোর মধ্যে নড়াইলকে ধরা হয় প্রথম সারির একটি জেলা। এক সময়ের প্রগতিশীল রাজনীতির পীঠস্থান এ জেলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাব তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চেয়ে এতটাই বেশি; ভোটের রাজনীতিতে উদারপন্থিদের প্রথম পছন্দের দলটি গোপালগঞ্জের পরে সম্ভবত নড়াইলকেই নিরাপদ মনে করে। তা ছাড়া গত কয়েক দশকে দেশের বিভিন্ন স্থানে অমুসলিমদের ওপর ডজন ডজন হামলার ঘটনা ঘটলেও নড়াইলে এসবের প্রভাব পড়তে দেখা যায়নি। তেমন একটি এলাকায় একেবারে প্রশাসন ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নাকের ডগায় পরপর দুটি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন যে কোনো মানুষকে বিচলিত করবে, এটাই স্বাভাবিক।

আরেকটি বিষয় খেয়াল করার মতো। তা হলো, জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে যিনি আছেন, তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। আবার মির্জাপুর কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিও একই ধর্মের অনুসারী। প্রাণিজগতে সবার মাঝেই কন্ডিশন রিফ্লেক্স হিসেবে এক ধরনের জাত বা গোত্রপ্রীতি থাকে। মানুষও এর বাইরে নয়। ওই দুটি ঘটনায় দায়িত্বের অংশ হিসেবে না হলেও অন্তত ফেলো ফিলিং থেকেও আক্রান্তদের বাঁচাতে জেলার পুলিশ সুপার ও কলেজ সভাপতির কি কোনো চেষ্টা ছিল? কলেজ সভাপতি অবশ্য বলেছেন, ঘটনার সময় তিনি এলাকায় ছিলেন না। তিনি থাকলে নাকি এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারত না। এটি এক দায়সারা গোছের বক্তব্য; সন্দেহ নেই। তার পরও একটি বেনিফিট অব ডাউট তিনি পেতে পারেন, যেহেতু ঘটনার হোতা স্থানীয় আওয়ামী লীগেরই এক নেতা বলে পরে পরিস্কার হয়েছে এবং কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি হলেই যে রাজনৈতিকভাবে তিনি প্রভাবশালী হবেন- এমনটা মনে করার কারণ নেই। কিন্তু পুলিশ সুপার তো সবই জানতেন। তাঁর অধীনস্তদের সামনেই কলেজ অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানো হয়েছে। অথচ ঘটনা নিয়ে সমাজমাধ্যমে যখন হৈচৈ শুরু হলো; বলে দিলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। শুক্রবারের হামলার ঘটনাও তাৎক্ষণিক কিছু নয়। মহানবী (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর যে ফেসবুক পোস্টের জেরে ওই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, সেই পোস্টটি কিন্তু শুক্রবার সকালেই হামলাকারীদের নজরে আসে; আর হামলাটা চলে বিকেলে। প্রশ্ন হলো, ওই বিতর্কিত পোস্টের খবর সাধারণ মুসল্লিরা সকালেই জেনে গেছেন, অথচ পুলিশ জানল না! আর হামলার আগে কয়েক ঘণ্টা সময় পেয়েও প্রশাসন তা ঠেকাতে কোনো ব্যবস্থা নিল না কেন?

১৬ জুন অধ্যক্ষ লাঞ্ছনা এবং ১৫ জুলাই হিন্দুপল্লিতে হামলার ঘটনা ঠেকানোর দায় অবশ্যই জেলা প্রশাসনের ছিল। এ কারণেই ১৬ জুনের ঘটনার পর সচেতন মহল এর প্রতিকার হিসেবে সেখানকার পুলিশ সুপারের পাশাপাশি জেলা প্রশাসকেরও প্রত্যাহার দাবি করেছিল। কিন্তু আমাদের উদ্বেগের জায়গাটা হলো, সমাজের রল্প্রেব্দ রল্প্রেব্দ নানা কারণে যে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে; হয়তো সংখ্যাগুরুর সমাজের সদস্য হিসেবে জেলা প্রশাসকও তা থেকে মুক্ত নন। কিন্তু পুলিশ সুপারের তো তেমন মনোভাব পোষণ করার কথা নয়। তবে কি খোদ রাষ্ট্রের মধ্যেই এ সাম্প্রদায়িকতা রোগ বাসা বেঁধেছে, যার বাইরে এমনকি স্বজাতের জন্য তা চরম ক্ষতিকর জেনেও নড়াইলের পুলিশ সুপার যেতে পারছেন না?

সেই ২০১২ সালের রামুর বৌদ্ধপল্লিতে ওই একই ধর্ম অবমাননার অজুহাতে জঘন্য হামলার পর প্রায় ১০ বছর চলে গেছে। এ সময়ের মধ্যে পাবনা, নাসিরনগর, কুমিল্লাসহ কয়েক ডজন এলাকায় একই ধরনের অজুহাত তুলে এবং একই কায়দায় হিন্দু সমাজের লোকদের ধর্মস্থান, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। কোনো কোনোটায় এমনকি প্রাণহানিও ঘটেছে। সর্বত্রই দেখা গেছে, যথেষ্ট সময় পাওয়ার পরও পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসন অন্তত হামলা ঠেকাতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এমনকি আজ পর্যন্ত এসব মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো বিচারও হয়নি। অনেকের ধারণা, বর্তমান সরকার উদার পন্থার কথা বললেও দশকের পর দশক ধরে এ দেশে বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদের যে চর্চা হয়ে আসছে; এর সঙ্গে কোনো বিরোধে যেতে চায় না। এমনকি এ বিষময় আদর্শ চর্চার ফল হিসেবে যে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা হূষ্টপুষ্ট হয়েছে, তাদেরও ঘাঁটাতে চায় না এ সরকার। কেউ কেউ তো এমনও বলেন, আওয়ামী লীগ বরং কোনোভাবে ওই উগ্রবাদীদের সমর্থন পাওয়া যায় কিনা সেই চেষ্টায় লিপ্ত। আর এমন নীতির কারণেই বারবার অঙ্গীকার করার পরও দলটি এ দীর্ঘ দুই যুগেও একটা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনারও বিচার করতে পারেনি। এমন অবস্থায় মাঠ প্রশাসন অমুসলিমদের অধিকার রক্ষায় গুরুত্ব দেবে- এমন বিশ্বাস কোনো অবোধেও করবে না।

সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষার বিষয়টা সরকারের অগ্রাধিকারে নেই- এ কথা বিশ্বাস করার কারণ হলো, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনোত্তর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার একটা বড় জায়গা ছিল যশোর। তখনও সেখানে পুলিশ সুপার ছিলেন একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু ওই হামলা ঠেকাতে বা এর পর হামলার বিচারের ব্যাপারেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে তাঁকে দেখা যায়নি। গত বছর কুমিল্লার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রংপুরের গঙ্গাচড়ায় জেলেপল্লিতে হামলার সময়ও জেলার পুলিশপ্রধান ছিলেন একজন হিন্দু। পুলিশ প্রশাসনে অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ওই কর্মকর্তা কিন্তু যথেষ্ট সময় পেয়েও হামলাটা ঠেকাতে পারেননি।

প্রসঙ্গটির অবতারণা এ জন্য করা হলো, বিশেষ করে রামুর ঘটনার পর অনেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যকে বলতে শোনা গেছে, প্রশাসনে বিএনপি-জামায়াতের লোক থেকে যাওয়াতেই সেখানে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের সময়োচিত হস্তক্ষেপ দেখিনি। কিন্তু এখনকার নড়াইল কিংবা গত বছরের রংপুর কিংবা ২০১৪ সালের যশোরের পুলিশপ্রধানকে আর যা-ই হোক বিএনপি-জামায়াতের ট্যাগ লাগানো যাবে না। আর রাষ্ট্র যদি এমনভাবে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদের পক্ষ নিয়ে চলতে থাকে, তাহলে তা শুধু সংখ্যালঘুদের নির্বাসনেই পাঠাবে না; আজকে অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাও অচিরে থমকে দাঁড়াবে।

সাইফুর রহমান তপন: সাংবাদিক ও সাবেক ছাত্রনেতা

আরও পড়ুন

×