ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তাৎক্ষণিক

গাইবান্ধা উপনির্বাচনে ভোট বন্ধের তিন তাৎপর্য

গাইবান্ধা উপনির্বাচনে ভোট বন্ধের তিন তাৎপর্য
×

শেখ রোকন

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০

বুধবার ভরদুপুরে সর্বার্থেই চমক হয়ে এসেছিল 'ভোট বন্ধ' হওয়ার খবর। এর আগে কখনও এভাবে গোটা আসনে 'ভোট বন্ধ' হয়েছিল? নাতিদীর্ঘ স্মৃতি হাতড়ে তার জবাব মেলে না। কখনও কখনও মাত্র কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত হওয়ার কথা মনে পড়ে বৈকি। কয়েক দিন পর সেসব কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের পর ফলাফল প্রকাশ হলেও পরিস্থিতি উনিশ-বিশ মাত্র। এই তো!
গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে ভোটের দিন সকাল পর্যন্তও ওই সংসদীয় এলাকার বাইরে খুব আগ্রহ ছিল বলে মনে হয় না। বরং খানিকটা কৌতূহল ছিল সম্ভবত ১৪৫টি ভোটকেন্দ্রে প্রায় সাড়ে ১২শ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের রেকর্ড নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল মাস্টাররা হয়তো কি-প্যাডে আঙুল দিয়েই বসে ছিল সিসিটিভি-বেষ্টিত ভোটের ফলাফলের অপেক্ষায়।
বস্তুত সাম্প্রতিক বছরগুলোর জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচনগুলোর একটি 'প্যাটার্ন' দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বিএনপির নির্বাচন বর্জন; ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রশাসনের পক্ষপাত নিয়ে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর অভিযোগ; ইভিএমের ব্যাপারে ভোটারের শঙ্কা ও নাগরিক সমাজের প্রশ্ন; ভোটগ্রহণে অনিয়ম ও জালিয়াতি দেখেও নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ততা- এর বাইরে বিশেষ কিছু ঘটত না। ষোল আনা আশঙ্কা ছিল- গাইবান্ধার উপনির্বাচনেও পরিস্থিত থাকবে তথৈবচ। কিন্তু সকাল গড়াতেই যখন নির্বাচন কমিশন একের পর এক কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করতে করতে সংখ্যাটিকে প্রায় অর্ধশতে নিয়ে যায়, তখন সবাই যেন নড়েচড়ে বসে।
গাইবান্ধার ফুলছড়ি-সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো সংযুক্ত ছিল ঢাকার নির্বাচন ভবনে স্থাপিত পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে। সেখান থেকে নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ ব্যক্তিরা সরাসরি দেখতে পান বিভিন্ন গোপন কক্ষে অবৈধভাবে একাধিক ব্যক্তি অনুপ্রবেশ করছে; একজনের ভোট আরেকজন দিয়ে দিচ্ছে। বেলা সোয়া ২টার দিকে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সামনে এসে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন- 'নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ায় আমরা পরিশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সমগ্র নির্বাচনী এলাকা, গাইবান্ধা-৫ নির্বাচনী এলাকার ভোট কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছি।'
প্রশ্ন হচ্ছে, গাইবান্ধা-৫ আসনের এই উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার তাৎপর্য কী? গত জুলাই মাসে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার প্রয়াণের পর দ্বাদশ জাতীয় সংসদের শেষার্ধে আয়োজিত অনেকটা নিয়ম রক্ষার এই নির্বাচন রাজনৈতিকভাবেও খুব একটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না। তারপরও এমন নজিরবিহীন পরিস্থিতির নেপথ্যের কারণ কী? আমার ক্ষুদ্র পর্যবেক্ষণমতে এর মধ্য দিয়ে আগামী দিনের জন্য অন্তত তিনটি তাৎপর্য থাকতে পারে।
প্রথমত, পূর্বসূরি দুই কমিশন বিরোধী রাজনৈতিক দল, সাধারণ ভোটার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে গেছে; বর্তমানটি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাইতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর আউয়াল কমিশনের প্রথম পরীক্ষা ছিল জুন মাসে; কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। লক্ষণীয়, সেখানেও ভোটগ্রহণকালে গুরুতর কোনো অভিযোগ ওঠেনি। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর প্রধান প্রতিপক্ষ ও কুসিকের দুইবারের মেয়র ভোটের দিন বিকেলেও সাংবাদিকদের বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। গোল বেধেছিল ভোট গণনার একেবারে শেষ মুহূর্তে, যেখানে কিছুক্ষণ গণনা বন্ধ রেখে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে মাত্র ৩৪৩ ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এবার আর সেই সুযোগও রাখতে চায়নি নির্বাচন কমিশন।
দ্বিতীয়ত, সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের ফলাফল হতে পারে গাইবান্ধার এ পরিস্থিতি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেভাবে ভোটের দিনের আগেই 'রাতের আঁধারে' ভোটবাক্স ভরিয়ে ফেলা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও যেভাবে দিনের আলোয় ভোট ডাকাতি চলছিল; তা দেশে ও বিদেশে কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচন নিয়ে অগ্রহণযোগ্যতা আর্থসামাজিক ও নিরাপত্তা ইস্যুগুলোতেও প্রভাব ফেলছিল। হতে পারে, গাইবান্ধা উপনির্বাচনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ প্রভাবশালী পক্ষগুলোর কাছে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে ইতিবাচক বার্তা দিতে চাইছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। যাতে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রশ্নে কোনো ছাড় না দেয়- সেই বার্তাও ক্ষমতাসীনদের উচ্চ পর্যায় থেকে নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হতে পারে বৈকি।
তৃতীয়ত, গাইবান্ধা উপনির্বাচনের ঝি'কে মেরে মাঠ প্রশাসনের বউকে শেখাতে চাইছে নির্বাচন কমিশন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের 'রোডম্যাপ' অনুযায়ী চলতি সপ্তাহে দেশের ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিল নির্বাচন কমিশন। রুদ্ধদ্বার ওই বৈঠকে নির্বাচন কমিশন ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে যে অস্বস্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে এসে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধের খবরও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। গাইবান্ধা উপনির্বাচনে যখন মাঠ প্রশাসন আগের মতোই পক্ষপাত করতে চাইছিল; তখন নির্বাচন কমিশন কি তার 'ক্ষমতা' দেখিয়ে দিল?
জাতীয় নির্বাচনের আগে আগে আপাত অগুরুত্বপূর্ণ কোনো উপনির্বাচনে সৃষ্ট পরিস্থিতি পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতি ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখেছে- এমন নজির বাংলাদেশের রাজনীতিতে কম নেই। গাইবান্ধা-৫ উপনির্বাচন তেমনই একটি 'নমুনা' হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
টানা তিন মেয়াদ ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ স্বাভাবিকভাবেই এতদিন নির্বাচন কমিশনের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলে এসেছে। সমকাল অনলাইনের খবর, বুধবার বিকেলে গাইবান্ধা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নির্বাচন বন্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের শাস্তি দাবি করেছে। এই উপনির্বাচন বন্ধের অভিঘাতে আগামী দিনগুলোতে এমন আরও কিছু 'বিস্ময়কর' ঘটনা যে ঘটতে থাকবে না- সেই নিশ্চয়তা কে দিতে পারে?
শেখ রোকন: সম্পাদকীয় বিভাগপ্রধান, সমকাল
skrokon@gmail.com

আরও পড়ুন

×