ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খাদ্য সংকট

আজকের ক্ষুধা বনাম আগামীর দুর্ভিক্ষ

আজকের ক্ষুধা বনাম আগামীর দুর্ভিক্ষ
×

রফিউর রাব্বি

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০

বাংলাদেশে ২০২১-২২ অর্থবছরে চাল ও গম উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৩০ হাজার টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৭৩ লাখ টন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত পাঁচ বছরে জনসংখ্যা বাড়ার হার সোয়া ৫ শতাংশের বেশি। কিন্তু খাদ্যোৎপাদন বাড়ার হার ৪.৪ শতাংশেরও কম। জনসংখ্যা বাড়ার বিপরীতে প্রতিবছর দেশে বড় ধরনের উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে চাল ও গম আমদানি করা হয়েছিল ৬৭ লাখ ৩০ হাজার টন। অথচ ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি নেমে এসেছে ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার টনে। বিশ্ববাজারে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও ডলারের বিনিময় হার বাড়ার ফলে আমদানি কমিয়েছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন বারবারই বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস স্মরণ করিয়ে জনগণকে সাশ্রয়ী হতে পরামর্শ দিচ্ছেন। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে তিনি 'জাতিসংঘ ফুড সিস্টেমস সামিট ২০২১' শীর্ষক ভার্চুয়াল এক সম্মেলনে বলেছেন, 'বর্তমানে বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন বাড়ার হার জনসংখ্যা বাড়ার হারকে ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে।' (প্রথম আলো, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১) আমরা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীর মুখেও দীর্ঘদিন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠার কথা শুনেছি। হরহামেশা সর্বত্র তাঁরা এ অগ্রগতির বার্তা শোনাতেন।
কয়েক দিন আগে খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক জানালেন, প্রতিবছর আমাদের শুধু ভোজ্যতেল আমদানি করতে লাগে ২০ থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ডাল, ভুট্টা, গুঁড়া দুধের মতো মৌলিক খাবারের বড় অংশ বাংলাদেশকে আমদানি করতে হয়। আমদানি করতে হয় পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ বিভিন্ন মসলা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে প্রতিবছরই বাংলাদেশ কমবেশি চাল-গম আমদানি করেছে। চাল, ডাল, গম, তেল থেকে শুরু করে অনেক খাদ্যপণ্যই প্রতিবছর আমদানি করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। তা হলে প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের মন্ত্রীদের জনগণকে 'খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ' জাতীয় গল্প শোনানোর কী কারণ ছিল? তাঁরাই আমাদের শুনিয়েছেন, আমাদের চাহিদার চেয়েও অনেক অনেক বেশি বিদ্যুৎ আমরা উৎপাদন করতে পারছি। দেশব্যাপী শতভাগ বিদ্যুতায়নের আনন্দে আতশবাজি পুড়িয়ে উৎসব করে আমরা সে সক্ষমতা বিশ্বব্যাপী জানান দিয়েছি। এখন আবার আমাদের জনগণকে রেড়ির তেলে কুপিবাতি জ্বালানোর প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ১৩ অক্টোবর একটি জরিপভিত্তিক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ৬৮ শতাংশ মানুষ এখন খাবার কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। বড় একটি অংশ ঋণ করছেন, কেউবা সম্পদ বিক্রি করে খাদ্য কিনছেন। দেশের ৮৮ শতাংশ মানুষ এখন খাদ্যের উচ্চ মূল্যকে বড় আঘাত মনে করছেন। অন্যদিকে, খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেইজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি) বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় জরিপ চালিয়ে 'বাংলাদেশ আইপিসি ক্রনিক ফুড ইনসিকিউরিটি রিপোর্ট' শিরোনামে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করে দেখানো হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ বছরে দুই থেকে চার মাস এবং তার চেয়েও বেশি সময় দিনে গড়ে একবেলা পর্যাপ্ত ও মানসম্মত খাদ্য পান না। এ সংখ্যাটি দেশের মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ।
বর্তমান এই সংকটের কারণ হিসেবে সরকার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করলেও দেশের ও বাইরের বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ ও প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের জন্য একমাত্র বৈশ্বিক পরিস্থিতিকেই দায়ী মনে করছেন না। সরকারের ভুল নীতি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং যোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে আমলা ও অদক্ষদের প্রাধান্য দেওয়ার নীতিকেও কারণ মনে করেন। অনেকেই মনে করেন, বৈশ্বিক মন্দা তৈরি না হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এমনি সংকটে পড়ত।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, দুর্ভিক্ষটি খাদ্যোৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে হয়নি, হয়েছে বণ্টন ও বিতরণ ব্যবস্থায় সরকারের ব্যর্থতা, মজুতদারি ও কালোবাজারির কারণে। ১৯৭৪ সালে আগের তিন বছরের চেয়ে খাদ্যোৎপাদন ছিল সর্বোচ্চ। কিন্তু তখন দুর্বৃত্তচক্র বাজারে খাদ্যপণ্যের ওপর একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করে রেখেছিল। কালোবাজারি ও মজুতদারদের সিন্ডিকেটকে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে তার চাপ পড়ে জনগণের ওপর। বর্তমানে দেশে যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে এই সিন্ডিকেটের ওপর সরকারের কতটা নিয়ন্ত্রণ আছে তা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী এখন দেশের এক ইঞ্চি জমি অনাবাদি না রাখার কথা বলছেন; অথচ দেশে প্রধান সার ইউরিয়ার চাহিদা ৩০ লাখ টন হলেও দেশে ১০ লাখ টন মাত্র উৎপাদিত হচ্ছে। গ্যাস ও যন্ত্রাংশের অভাবে বছরের পর বছর ধরে সার কারখানাগুলো বন্ধ রেখে একে আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছে। এখন ডলার সংকটের কারণে কৃষি ব্যবস্থাতেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গত ১২ বছরে দেশে খাদ্য আমদানি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। যেসব খাদ্য আমদানিতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে, তা দেশে উৎপাদন সম্ভব হলেও সেদিকে নজর দেওয়া হয়নি।
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে গড়ে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে তা বাড়ানো হয়েছে ৫২ শতাংশ। জ্বালানি তেলের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ম্ফীতিকে আশঙ্কাজনক হারে বাড়িয়ে দিয়েছে। জ্বালানির কথা না ভেবে তৈরি করা হয়েছে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সরকার গত ১০ বছরে ১২টি কোম্পানিকে ৪৭ হাজার ২৬২ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়েছে বসিয়ে রেখে।
আমাদের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, রিজার্ভ বৃদ্ধি ইত্যাদি আত্মতুষ্টির কথা বলে অর্থনৈতিক সংকট দিনে দিনে ঘনীভূত করা হয়েছে। বর্তমানে টিকে থাকার সংগ্রামে মানুষ এখন পর্যুদস্ত। মানুষকে বহু 'কায়দা করে' টিকে থাকতে হচ্ছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস এখন তাদের আতঙ্কিত করছে না। বর্তমান ক্ষুধার কাছে আগামীর দুর্ভিক্ষ কোনো গুরুত্ব বহন করছে না।
রফিউর রাব্বি :লেখক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×