রাজনীতি
আওয়ামী লীগই তাহলে বিএনপিকে চালায়?
মোশতাক আহমেদ
প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০
প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ১০ ডিসেম্বর আহূত ঢাকা সমাবেশ ঘিরে আওয়ামী লীগের 'খেলা হবে, খেলা হবে' ডঙ্কা নিনাদের মধ্যেই আরেক ডঙ্কা ফাটিয়েছেন দলটির অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ। গত ২৭ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের এই কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, 'বিএনপিকে চালায় আওয়ামী লীগই।' তিনি আরও বলেছেন, 'প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ চালান, বিশ্ব রাজনীতি করেন। আবার মাঝেমধ্যে বিএনপিকেও চালান।' (বাংলা ট্রিবিউন, ২৭ নভেম্বর ২০২২)।
ক্ষমতাসীন দলের একজন সাংগঠনিক সম্পাদকের এহেন বক্তব্য অনিবার্যভাবেই স্মরণে নিয়ে এলো মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ মহাকাব্যের কাহিনি। কোনো এক সময়ে রাজর্ষি দশরথ রানী কৈকেয়ী দেবীর কাছে এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন- তাঁর গর্ভজাত পুত্র ভরতকেই যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করবেন। কালক্রমে রাজা তাঁর প্রতিজ্ঞা বিস্মৃত হয়ে কৌশল্যানন্দন রামচন্দ্রকে যুবরাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কৈকেয়ী দেবী দাসী মন্থরার মুখে এ সংবাদ পেয়ে রাজসমীপে এক পত্র প্রেরণ করেন, যার শুরুটাই ছিল এমন- 'একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে/ রঘুরাজ?' (দশরথের প্রতি কৈকেয়ী, মেঘনাদবধ কাব্য, চতুর্থ সর্গ)।
রামায়ণের যুগ গত হয়েছে সে কবেই। আজ দশরথও নেই, কৌশল্যা-কৈকেয়ীও নেই। কিন্তু মন্থরারা আজও রয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে তারা এমন সব গোপন কথা ফাঁস করে দেয়; কৈকেয়ীরূপী আমজনতা বিস্মিত না হয়ে পারে না। এই তো কিছু দিন আগে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সগর্বে জানিয়েছিলেন, তিনি প্রতিবেশী দেশ ভারত সফরে গিয়ে অনুরোধ করে এসেছেন- ওরা (ভারত) বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রাখার জন্য যা যা করা দরকার, তা-ই যেন করে। অবশ্য এ কথার পর তাঁকে কম ধকল পোহাতে হয়নি। এখন তা অনেকটুকু কমে এসেছে বলে মনে হয়।
এমন উদাহরণ আরও আছে। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ ও কর্তাব্যক্তিরা মাঝেমধ্যে গোপন কথা বলে ফেলেন। কিন্তু আবু সাঈদ আল মাহমুদের প্রকাশ করা তথ্যটি এ দেশের রাজনীতিবোদ্ধাদের ভাবিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট; আজন্ম শত্রু বিএনপিকে চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ! তিনি এ কথা বলেছেন এমন এক সময়, যখন আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। চলছে হুমকিধমকি আর পারস্পরিক দোষারোপের খেলা; সেই সঙ্গে শক্তি প্রদর্শনের মহড়া। এরই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে বিএনপি দীর্ঘদিন পর বেশ কয়েকটি বিভাগীয় শহরে তাদের সমাবেশ করেছে। কুমিল্লা সমাবেশের কথা বাদ দিলে প্রায় সব কয়টি সমাবেশের দিনই সংশ্নিষ্ট অঞ্চলে 'সরকারি ব্যবস্থাপনায়' হরতাল পালিত হয়েছে। এসব অগ্রাহ্য করে হাজার হাজার কর্মী-সমর্থকও জড়ো হয়েছে বিএনপির সমাবেশে। কোনো কোনো জায়গায় ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতাকর্মীর ওপর হামলার অভিযোগও উঠেছে। বেশ ক'জন বিএনপি কর্মী প্রাণও হারিয়েছে। এরই বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বলেছেন- আওয়ামী লীগই বিএনপিকে চালাচ্ছে।
অবাক হওয়ার মতো কথা বৈ কি! তবে যে দেশে সরকার, রাষ্ট্র আর ক্ষমতাসীন দল সমার্থক হয়ে গেছে, সেখানে দলের সাংগঠনিক সম্পাদকের কথাকে ফেলনা ভাবা যায় না। তাই বিষয়টি কিঞ্চিৎ হলেও বিশ্নেষণের দাবি রাখে।

যদি আবু সাঈদ আল মাহমুদে কথা সত্য হয়, তাহলে তো মানতেই হবে- আওয়ামী লীগ আর বিএনপি আসলে 'এক বৃন্তে দুটি ফুল' কিংবা একে অপরের 'বি টিম'। যে ক্ষমতায় থাকে সে 'এ'; আর ক্ষমতার বাইরের দল 'বি'। কিন্তু এই যে 'খেলা হবে, খেলা হবে'- এটি তাহলে কোন খেলা? এ কি তবে আমজনতাকে বিভ্রান্ত করার জন্য সাজানো কোনো প্রীতি ম্যাচ? আবু সাঈদ এটি স্পষ্ট করেননি। কিন্তু বলতেও ভোলেননি- 'আওয়ামী লীগ চাইলে বিএনপি নির্বাচনে আসবে, না চাইলে আসতে পারবে না।' অর্থাৎ, কে নির্বাচনে আসবে আর কে আসবে না- তাও নিয়ন্ত্রণ করছে আওয়ামী লীগ। তাহলে এই যে আগামী নির্বাচন নিয়ে এত আলোচনা; নির্বাচন কমিশনের এত লাফ-ঝাঁপ, এসবেরই বা কী দরকার? কাদেরকে নিয়ে নির্বাচন করা হবে, আগামীতে সরকারে কে কে থাকবে- এ সংক্রান্ত একটা আমলাতান্ত্রিক ডিক্রি জারি করে দিলেই তো সব সমস্যা চুকে যায়!
আসলে আবু সাঈদ যে উদ্দেশ্যেই কথাটি বলে থাকুন না কেন, তাঁর কথায় একটা প্রচ্ছন্ন দলীয় কর্তৃত্ববাদের ছাপ লক্ষণীয়। আর তা হলো, এ দেশে যে যা-ই করুক; আওয়ামী লীগের কর্তৃত্বের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। এই মানসিকতা দেশে গণতন্ত্র বিকাশের ক্ষেত্রে যে পর্বতপ্রমাণ এক বাধা- তা বলাই বাহুল্য।
এই নিবন্ধ যখন লিখছি, তখনই দেখলাম, সুইডেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা দ্য ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স বিশ্বে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে 'দ্য গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্রেসি-২০২২' শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বাংলাদেশকে কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। (প্রথম আলো, ১ ডিসেম্বর ২০২২)। আওয়ামী লীগ নেতার বক্তব্য যেন ওই প্রতিবেদনকেই সত্যায়িত করে।
তবে বিএনপি নিয়ে আবু সাঈদ আল মাহমুদের মন্তব্য আরও কিছু বিষয় ও প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে, যে প্রশ্নগুলোর জবাব জাতির কাছে তুলে ধরার দায়িত্ব ক্ষমতাসীন দলের ওপরেই বর্তায়। আওয়ামী লীগ এত দিন বলে এসেছে, বিএনপিকে চালাচ্ছে বিদেশে বাস করা একজন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। অথচ এখন তাদেরই নেতা বলছেন- 'আওয়ামী লীগই বিএনপিকে চালাচ্ছে, মাঝেমধ্যে প্রধানমন্ত্রীও বিএনপিকে চালান।'
আওয়ামী লীগ আরও দাবি করে আসছে, সেনা ছাউনির রহস্য গহ্বর থেকে জন্ম নেওয়া দল বিএনপি এ দেশের তাবৎ অপকর্মের জন্য দায়ী। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি, নির্বাচনে কারচুপি, হরতালের নামে বাসে আগুন এবং জানমালের ক্ষতিসাধনসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই, যার জন্য বিএনপিকে দায়ী করা হয় না। কিন্তু আবু সাঈদ আল মাহমুদের কথামতো আওয়ামী লীগই যদি বিএনপিকে চালায়, তাহলে এসব অপকর্মের দায়ভারের কিছুটা হলেও তো আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। আওয়ামী লীগ কি এর জন্য প্রস্তুত? আর প্রস্তুত না হলে তাদের নেতার বক্তব্যের ব্যাখ্যা জনগণের কাছে প্রকাশ করা জরুরি।
মোশতাক আহমেদ: কলাম লেখক ও জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা
- বিষয় :
- রাজনীতি
- মোশতাক আহমেদ