ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরান

হিজাববিরোধী বিক্ষোভের 'সাফল্য' পরিবর্তন আনবে?

হিজাববিরোধী বিক্ষোভের 'সাফল্য' পরিবর্তন আনবে?
×

মঞ্জুরে খোদা

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০

২০১০-এর আরব বসন্তের কথা নিশ্চয় মনে আছে। যে বসন্তের হাওয়ায় আরব রাষ্ট্রগুলোর বুকে দীর্ঘদিন চেপে থাকা শাসকরা একেক করে পড়ে গিয়েছিলেন। এই বিপ্লবের সূত্রপাত হয়েছিল তিউনিসিয়ার রাস্তার এক হকারের প্রতিবাদ দিয়ে। মোহাম্মদ বোয়াজিজি নামে পথে ফল বিক্রি করা সেই হকার পুলিশি নির্যাতন, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের প্রতিবাদে শরীরে আগুন জ্বেলে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। ব্যস,শুরু হয়ে গেল মহাবিদ্রোহ। যেন সবার বুকে বারুদ উশখুশ করছিলই। নিজের শরীর জ্বেলে দিয়াশলাই হয়ে বোয়াজিজি তাতে আগুন দিয়েছিলেন। আগুন জ্বলে উঠল চারদিকে। সে আগুনে শুধু তিউনিসিয়াই জ্বলেনি; আলজেরিয়া, জর্ডান, মিসর ও ইয়েমেন, সিরিয়া, লিবিয়া হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল আফ্রিকার দেশে দেশে। সে ঘটনায় অর্ধডজন শাসকের পতন হয়েছিল।
ইরানে ইতোমধ্যে কয়েকশ মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছে। তারা তাদের বোন মাহসা আমিনির জন্য জীবন দিচ্ছে।
মাহসা কুর্দি সম্প্রদায়ের মেয়ে। তাঁকে ইরানি পুলিশ পিটিয়ে হত্যা করেছে। তাঁর অপরাধ- তিনি হিজাব ঠিকমতো পরেননি; মাথার চুল ঠিকমতো ঢাকেননি। এ ঘটনায় ইরানজুড়ে শুরু হলো তরুণ-তরুণীর প্রতিবাদ। মেয়েরা হিজাব ছুড়ে দিল। চুল কেটে ফেলল। নেমে এলো পথে। হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ঘোষণা করল- তারা পর্দা মানে না। তারা মুক্তি ও স্বাধীনতা চায়। তারা মানবাধিকার চায়। তাদের পোশাক রাষ্ট্র ও মোল্লাতন্ত্র ঠিক করে দেবে- এটি তারা মানে না।
মাহসার ঘটনায় তিউনিসিয়ার বোয়াজিজির কথা মনে পড়ে যায়। মাহসা ইরানের কট্টর মোল্লাতন্ত্রের দুঃশাসনের শিকার। শুধু মাহসা কেন; প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা 'ইসলামী' বিপ্লবের নেতা খোমেনির বাড়িতে আগুন দিয়েছে। প্রায় ১৯ হাজার তরুণ-তরুণীকে জেলে পোরা হয়েছে। কিন্তু আন্দোলন থেমে নেই। আরও ছড়িয়ে পড়ছে।
শাসকদের হত্যা-নিপীড়নের প্রতিবাদে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ইরানের খেলোয়াড়রা মাঠে 'ইসলামী খেলাফতের প্রশংসা করা' তাঁদের জাতীয় সংগীত গাননি। বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। এর চেয়ে বড় প্রতিবাদ আর কী হতে পারে!
পুলিশি হেফাজতে মাহসা আমিনির হত্যার এই ঘটনা যারা প্রকাশ করেছে, ইরান সরকার তাদের আমেরিকার চর বলে অভিহিত করেছে। সে দেশের লাখো মানুষের প্রতিবাদ কি তবে তা-ই? সবাই কি মার্কিন স্বার্থপুষ্ট? তাহলে বলতেই হয়, মার্কিনিরা ইরানের অনেক ভেতরে প্রবেশ করেছে!
আমেরিকা সারাবিশ্বেই তাদের পছন্দের শাসক বসাতে চায়। সেখানেও তাদের ষড়যন্ত্র-সংযোগ থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সেই সুযোগ করে দিচ্ছে কারা? ইরানের শাসকরা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে যে দমন-পীড়ন চালাচ্ছেন; অধিকার লঙ্ঘন করছেন- পশ্চিমাদের এ অভিযোগ কি মিথ্যা? আরব বসন্তে তারাই ঘি ঢেলেছে। বিদ্রোহীদের অস্ত্র-অর্থ দিয়ে শাসকদের পতন ঘটিয়েছে।


পৃথিবীর কোনো শাসকই গণমানুষের ভাষা বুঝতে পারেন না তাঁদের চূড়ান্ত পতন অবধি। যেমন বুঝতে পারেননি আজ থেকে ৪০ বছর আগে ইরানেরই আরেক শাসক রেজা শাহ। তখন শাহের বিরুদ্ধে এভাবেই বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল, আজ যা ইরানে চলছে। মানুষের জন্য যদি রাষ্ট্র হয়, তাহলে মানুষের চাওয়াই হবে শেষ কথা। কিন্তু মোল্লারা কেতাবের বাইরে যাবেন না। মানুষ মরলেও কেতাবের কালো অক্ষরের শাসন অক্ষত থাকবে। কিন্তু সভ্য ও মুক্ত মানবতার দুনিয়ায় এই জুলুম-নির্যাতন-নিয়ন্ত্রণ আর কত দিন?
সেপ্টেম্বরে মাহসা আমিনিকে হত্যার পর তিন মাস ধরে চলা এ আন্দোলনে ইরানের কট্টর মৌলবাদী শাসক কিছুটা নমনীয়। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া লাগাতার বিক্ষোভ আন্দোলনকে লাগাম পরাতে সম্প্রতি সরকার বাধ্যতামূলক হিজাব পরা সংক্রান্ত আইন পর্যালোচনা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ জাফর মন্টাজেরি বলেছেন, ইরানের পার্লামেন্ট ও বিচার বিভাগ বাধ্যতামূলক হিজাব পরা সংক্রান্ত আইন খতিয়ে দেখবে এবং এ বিষয়ে তারা এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত জানাবে। যদিও কী সংশোধনী আনা হবে বা কোনো সংশোধনী আনা হবে কিনা, সে বিষয়ে পরিস্কার কিছু বলা হয়নি। তবে তিনি বলেছেন, ইরান সরকার 'মোরাল পুলিশিং' বিলুপ্ত করবে। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা অস্বীকার করেছে। এটি বিক্ষোভকারীদের একটি প্রধান দাবি ছিল।
সরকারি কর্মকর্তার এমন ঘোষণায় আন্দোলনের গতির কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং তা চলছেই। আন্দোলনকারীরা সরকারবিরোধী স্লোগানে মুখর। প্রতিবাদকারী নারীরা প্রকাশ্যে রাজপথে আগুন দিয়ে তাঁদের হিজাব জ্বালিয়ে দিচ্ছেন। তাঁরা মুক্তি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এ আন্দোলনে শামিল হয়েছেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ভাগনি ফরিদা মোরাদখানিও। তিনি এক ভিডিওবার্তায় সরকারের দুঃশাসনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সরকারের বল প্রয়োগের বিরোধিতা করেছেন এবং শিশু-নারী হত্যা বন্ধ করতে বলেছেন। কোনো স্বাধীনচেতা মানুষ সরকারের এমন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করতে পারেন না। এই জুলুমের শাসন ব্যবস্থা কোনো ধর্মীয় নীতির অনুশাসন নয়। সরকারবিরোধী বক্তব্য ও চলমান আন্দোলনে উস্কানি দেওয়ার অপরাধে তাঁকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি প্রথম তিন মাস ধরে চলা আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করেছে ইরানের সরকার। তাদের বক্তব্য, এই আন্দোলনে ২০০ জন নিহত হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, তিন শতাধিক। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, নিহতের সংখ্যা সাড়ে চারশর বেশি। সংখ্যা যা-ই হোক, ইরানের পরিস্থিতি যে ভয়াবহ, তাদের এই স্বীকারোক্তির মাধ্যমে তা প্রকাশ পেয়েছে। সরকার শত শত মানুষকে হত্যা, হাজার হাজার নাগরিককে জেলে পুরেও এ আন্দোলন দমন করতে পারেনি। আন্দোলনের তীব্রতা ও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে এখন তাদের কিছুটা নমনীয় হতে দেখা যাচ্ছে। কট্টরপন্থি শাসক বিক্ষোভকারীদের দাবির আর কতটা পূরণ করতে পারবেন, তার ওপরেই নির্ভর করবে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি ও ইরানের শাসন পদ্ধতি।
ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক

আরও পড়ুন

×