ফারদিনের মৃত্যু
কেন মরিবার হ'ল তার সাধ?
×
এহ্সান মাহমুদ
প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০
বুয়েটের শিক্ষার্থী ফারদিন 'খুন হননি, আত্মহত্যা করেছেন'- এই সংবাদ পাঠের পরে জীবনানন্দ দাশের 'আট বছর আগের একদিন' কবিতার কথাই মনে পড়ল; যেখানে আছে- 'কাল রাতে- ফাল্কগ্দুনের রাতের আঁধারে/ যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ/ মরিবার হ'ল তার সাধ।' ফারদিন খুন হয়েছেন, নাকি আত্মহত্যা করেছেন, তা নিয়ে অনেকে কৌতূহলী এমনকি 'আসল খবর' জানতে 'উৎসাহী' হলেও ঘটনাটি হত্যা, দুর্ঘটনা না আত্মহত্যা- এই সুরাহা এখনও হয়নি। দিনটি ছিল ৪ নভেম্বর, ২০২২। রাজধানীর রামপুরা থেকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় যান বুয়েটছাত্র ফারদিন নুর পরশ। নিখোঁজের তিন দিন পর ৭ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এ ঘটনায় ফারদিনের বান্ধবী বুশরাসহ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে 'হত্যা করে লাশ গুম' করার অভিযোগে রামপুরা থানায় মামলা করেছিলেন ফারদিনের বাবা নুর উদ্দিন রানা। ওই মামলার ভিত্তিতে গত ১০ নভেম্বর রামপুরা এলাকার একটি বাসা থেকে বুশরাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বুশরা এখনও কারাগারে।
বুয়েটের একজন শিক্ষার্থী, তাঁর কী এমন ঘটতে পারে, যার জন্য তিনি স্বেচ্ছামৃত্যুকে বেছে নিলেন? ডিবি যুক্তি হিসেবে পারিবারিক চাপ, দুই ভাইয়ের পড়াশোনার টাকা জোগানো, ধারাবাহিকভাবে পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়া এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে স্পেনে যাওয়ার টাকা সংগ্রহ করতে না পারাকে আত্মহত্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফারদিন অন্তর্মুখী ছিলেন। সবাইকে সবকিছু বলতেন না। তাঁর পরীক্ষার ফলও ধারাবাহিকভাবে খারাপ হচ্ছিল। ফারদিন চার জায়গায় ছাত্র পড়াতেন। সেই টাকা দিয়ে নিজের ও ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতেন। এত ছাত্র পড়াতে গিয়ে তাঁর বাসায় ফিরতে দেরি হতো। কিন্তু তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরার জন্য তাঁকে পরিবার শাসন করত। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা নিয়েও পরিবার থেকে বাধা ছিল। ঘটনার দিন তিনি যেভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন, তাতে মনে হয়, ফারদিনের মানসিক অবস্থা ভালো ছিল না। আত্মহত্যার জন্যই তিনি কেরানীগঞ্জের বাবুবাজার ব্রিজে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সময় ব্রিজ এলাকায় অনেক লোক থাকায় সম্ভবত তিনি সেখান থেকে চলে আসেন।
মনোবিশ্নেষকরা 'বাইপোলার ডিজঅর্ডার' বলে একটি বিষয়ের কথা বলে থাকেন। এমনটা হলে বিষণ্ণতা ও মনোবৈকল্যের চাপ অনেককেই আত্মহত্যাপ্রবণ করে তোলে। শেষাবধি কারও কারও ক্ষেত্রে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া পথ খোলা থাকে না। ফারদিনের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেছে বলে পুলিশের বক্তব্য শুনে ধারণা জন্মাতে পারে। কিন্তু যখনই আমরা ফারদিনের বাবার মুখে শুনি:'ফারদিন ছিল সংগ্রামী, অদম্য মেধাবী; যে কোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে চলতে পারত। ও নিজে নিজেকে প্রস্তুত করেছে। সে আত্মহত্যা করতে পারে না'- তখন পুলিশের একই ঘটনার বহুমাত্রিক বিশ্নেষণ আমাদের কোনো মীমাংসা দিতে পারে না। সমকালে প্রকাশিত সংবাদে ফারদিনের আত্মহত্যা করার কারণ কী- এমন প্রশ্নের আরও চমকপ্রদ বক্তব্য পাওয়া গেছে র্যাব কর্মকর্তার কাছে। তিনি বলেছেন :'আমি আত্মহত্যার কথা বলিনি। বলছি, সুলতানা কামাল সেতুর রেলিং থেকে স্বেচ্ছায় ফারদিন পানিতে ঝাঁপ দিয়েছেন। এটি অ্যাডভেঞ্চার, নাকি অন্য কোনো কারণে তা তদন্ত কর্মকর্তাদের তদন্তে উঠে আসবে।'
আমরা স্মরণ করতে পারি, ফারদিনের মৃত্যুর পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বরাত দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য গণমাধ্যমে আসে। প্রথমে বলা হলো, চনপাড়াকেন্দ্রিক মাদক গ্যাং তাকে খুন করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে একবার দাবি করা হয়, ঢাকার ভেতরে খুন হয়ে থাকতে পারেন ফারদিন। র্যাবের ভাষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্নেষণ করে তারা পেয়েছে- ফারদিন ওই দিন রাত ২টা ১ মিনিটে যাত্রাবাড়ীর বিবিরবাগিচা থেকে লেগুনায় ওঠেন। রাত আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটে সুলতানা কামাল ব্রিজের অন্যপাশে তারাব বিশ্বরোডের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় লেগুনা থেকে নামেন। রাত ২টা ২৬ মিনিটে সুলতানা কামাল ব্রিজের তারাব প্রান্তে তাঁর অবস্থান ছিল। রাত ২টা ৩৪ মিনিটে ওই ব্রিজের প্রায় মাঝখানে আসেন ফারদিন। রাত ২টা ৩৪ মিনিট ৯ সেকেন্ডে সুলতানা কামাল ব্রিজের রেলিং ক্রস করেন তিনি। রাত ২টা ৩৪ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে সুলতানা কামাল ব্রিজের ওপর থেকে নদীতে ঝাঁপ দেন। ঝাঁপ দেওয়ার পর রাত ২টা ৩৪ মিনিট ২১ সেকেন্ডে শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে পড়েন ফারদিন। রাত ২টা ৩৫ মিনিট ৯ সেকেন্ডে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া রাত ২টা ৫১ মিনিটে ফারদিনের হাতের ঘড়িতে পানি ঢুকে অকার্যকর হয়ে পড়ে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পুলিশের এই বিস্তারিত তথ্য হাজির করা যেমন ঘটনার বিশদ বুঝতে সাহায্য করবে, পাশাপাশি একই ঘটনার বহুমাত্রিক ভাষ্য মানুষকে বিভ্রান্ত করবে। ফারদিনের ঘটনায় আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও অতিকথন বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ফারদিনের নিখোঁজ হওয়া, শীতলক্ষ্যা থেকে মরদেহ উদ্ধার, ফারদিনের বান্ধবীকে গ্রেপ্তার, চনপাড়া বস্তিতে র্যাবের অভিযান, সিসিটিভি ফুটেজ, পুলিশ ও র্যাবের পক্ষ থেকে আত্মহত্যা দাবি এবং ফারদিনের বাবার আর্তনাদ- এ সবকিছু যেন আমাদের তথ্য অধিকারকে অদ্ভুত আঁধারে ছেয়ে ফেলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত কার্যক্রমের নামে চমকপ্রদ তথ্য আমাদের ক্লান্ত করছে এবং জাগিয়ে তুলছে বিপন্ন বিস্ময়।
এহ্সান মাহমুদ: সহসম্পাদক, সমকাল
বুয়েটের একজন শিক্ষার্থী, তাঁর কী এমন ঘটতে পারে, যার জন্য তিনি স্বেচ্ছামৃত্যুকে বেছে নিলেন? ডিবি যুক্তি হিসেবে পারিবারিক চাপ, দুই ভাইয়ের পড়াশোনার টাকা জোগানো, ধারাবাহিকভাবে পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়া এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে স্পেনে যাওয়ার টাকা সংগ্রহ করতে না পারাকে আত্মহত্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফারদিন অন্তর্মুখী ছিলেন। সবাইকে সবকিছু বলতেন না। তাঁর পরীক্ষার ফলও ধারাবাহিকভাবে খারাপ হচ্ছিল। ফারদিন চার জায়গায় ছাত্র পড়াতেন। সেই টাকা দিয়ে নিজের ও ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতেন। এত ছাত্র পড়াতে গিয়ে তাঁর বাসায় ফিরতে দেরি হতো। কিন্তু তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরার জন্য তাঁকে পরিবার শাসন করত। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা নিয়েও পরিবার থেকে বাধা ছিল। ঘটনার দিন তিনি যেভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন, তাতে মনে হয়, ফারদিনের মানসিক অবস্থা ভালো ছিল না। আত্মহত্যার জন্যই তিনি কেরানীগঞ্জের বাবুবাজার ব্রিজে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সময় ব্রিজ এলাকায় অনেক লোক থাকায় সম্ভবত তিনি সেখান থেকে চলে আসেন।
মনোবিশ্নেষকরা 'বাইপোলার ডিজঅর্ডার' বলে একটি বিষয়ের কথা বলে থাকেন। এমনটা হলে বিষণ্ণতা ও মনোবৈকল্যের চাপ অনেককেই আত্মহত্যাপ্রবণ করে তোলে। শেষাবধি কারও কারও ক্ষেত্রে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া পথ খোলা থাকে না। ফারদিনের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেছে বলে পুলিশের বক্তব্য শুনে ধারণা জন্মাতে পারে। কিন্তু যখনই আমরা ফারদিনের বাবার মুখে শুনি:'ফারদিন ছিল সংগ্রামী, অদম্য মেধাবী; যে কোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে চলতে পারত। ও নিজে নিজেকে প্রস্তুত করেছে। সে আত্মহত্যা করতে পারে না'- তখন পুলিশের একই ঘটনার বহুমাত্রিক বিশ্নেষণ আমাদের কোনো মীমাংসা দিতে পারে না। সমকালে প্রকাশিত সংবাদে ফারদিনের আত্মহত্যা করার কারণ কী- এমন প্রশ্নের আরও চমকপ্রদ বক্তব্য পাওয়া গেছে র্যাব কর্মকর্তার কাছে। তিনি বলেছেন :'আমি আত্মহত্যার কথা বলিনি। বলছি, সুলতানা কামাল সেতুর রেলিং থেকে স্বেচ্ছায় ফারদিন পানিতে ঝাঁপ দিয়েছেন। এটি অ্যাডভেঞ্চার, নাকি অন্য কোনো কারণে তা তদন্ত কর্মকর্তাদের তদন্তে উঠে আসবে।'
আমরা স্মরণ করতে পারি, ফারদিনের মৃত্যুর পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বরাত দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য গণমাধ্যমে আসে। প্রথমে বলা হলো, চনপাড়াকেন্দ্রিক মাদক গ্যাং তাকে খুন করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে একবার দাবি করা হয়, ঢাকার ভেতরে খুন হয়ে থাকতে পারেন ফারদিন। র্যাবের ভাষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্নেষণ করে তারা পেয়েছে- ফারদিন ওই দিন রাত ২টা ১ মিনিটে যাত্রাবাড়ীর বিবিরবাগিচা থেকে লেগুনায় ওঠেন। রাত আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটে সুলতানা কামাল ব্রিজের অন্যপাশে তারাব বিশ্বরোডের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় লেগুনা থেকে নামেন। রাত ২টা ২৬ মিনিটে সুলতানা কামাল ব্রিজের তারাব প্রান্তে তাঁর অবস্থান ছিল। রাত ২টা ৩৪ মিনিটে ওই ব্রিজের প্রায় মাঝখানে আসেন ফারদিন। রাত ২টা ৩৪ মিনিট ৯ সেকেন্ডে সুলতানা কামাল ব্রিজের রেলিং ক্রস করেন তিনি। রাত ২টা ৩৪ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে সুলতানা কামাল ব্রিজের ওপর থেকে নদীতে ঝাঁপ দেন। ঝাঁপ দেওয়ার পর রাত ২টা ৩৪ মিনিট ২১ সেকেন্ডে শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে পড়েন ফারদিন। রাত ২টা ৩৫ মিনিট ৯ সেকেন্ডে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া রাত ২টা ৫১ মিনিটে ফারদিনের হাতের ঘড়িতে পানি ঢুকে অকার্যকর হয়ে পড়ে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পুলিশের এই বিস্তারিত তথ্য হাজির করা যেমন ঘটনার বিশদ বুঝতে সাহায্য করবে, পাশাপাশি একই ঘটনার বহুমাত্রিক ভাষ্য মানুষকে বিভ্রান্ত করবে। ফারদিনের ঘটনায় আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও অতিকথন বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ফারদিনের নিখোঁজ হওয়া, শীতলক্ষ্যা থেকে মরদেহ উদ্ধার, ফারদিনের বান্ধবীকে গ্রেপ্তার, চনপাড়া বস্তিতে র্যাবের অভিযান, সিসিটিভি ফুটেজ, পুলিশ ও র্যাবের পক্ষ থেকে আত্মহত্যা দাবি এবং ফারদিনের বাবার আর্তনাদ- এ সবকিছু যেন আমাদের তথ্য অধিকারকে অদ্ভুত আঁধারে ছেয়ে ফেলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত কার্যক্রমের নামে চমকপ্রদ তথ্য আমাদের ক্লান্ত করছে এবং জাগিয়ে তুলছে বিপন্ন বিস্ময়।
এহ্সান মাহমুদ: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- ফারদিনের মৃত্যু
- এহ্সান মাহমুদ