রাজনীতি
২৭ দফা এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান
মইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ২২:১৫
সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি তাদের ভাষায় 'রাষ্ট্র মেরামত' করার জন্য ২৭ দফা রূপরেখা প্রকাশ করেছে। দেখতে চেয়েছিলাম, সেখানে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে দলটি কীভাবে আলোকপাত করেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনসূত্রে যা দেখলাম- দুটি দফায় মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এসেছে। যেমন ১৫ নম্বর দফায় বলা হয়েছে- অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও গবেষক, অভিজ্ঞ ব্যাংকার, করপোরেট নেতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি সমন্বয়ে একটি 'অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন' গঠন করা হবে। মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নিরিখে প্রবৃদ্ধির সুফল সুষম বণ্টনের মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করা হবে। ২২ নম্বর দফায় বলা হয়ছে- রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিবিড় জরিপের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের একটি তালিকা প্রণয়ন করা হবে এবং তাদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এই তালিকার ভিত্তিতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কল্যাণে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে একটি সঠিক তালিকা প্রস্তুত করা হবে। (সমকাল, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২২)।
ভাগ্যিস, বিএনপির ২৭ দফায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস 'মেরামত' নিয়ে আর কোনো কথা বলা হয়নি। সম্ভবত এই কারণে যে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের যা বিকৃতি করার; দলটি ইতোমধ্যে করে ফেলেছে। যেমন নব্বই দশকের পর থেকে বিএনপি দাবি করে আসছে- ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। নব্বই দশকের আগে দলটি কখনও এমন দাবি করেনি। এর নেপথ্যে কারা, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। ওই জ্ঞানপাপীদেরকে প্রশ্ন- আর কতদিন এমন মিথ্যাচার চালিয়ে যাবেন? অথচ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকালে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার নজীর আহমদ চৌধুরী রোডে আমি নিজে সাইক্লোস্টাইল করা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা সংক্রান্ত লিফলেট পেয়েছি। ঐ লিফলেটটি অকাট্য প্রমাণ দিচ্ছে- ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত শেষ রাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ওয়্যারলেস মেসেজ আকারে চট্টগ্রাম পৌঁছেছিল। ২৬ মার্চ দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ হান্নান প্রথমবার এবং সন্ধ্যায় আবুল কাশেম সন্দ্বীপ দুই-দুইবার বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি চট্টগ্রাম বেতার থেকে পাঠ করেছিলেন। ২৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখের সন্ধ্যায় মেজর জিয়ার ঘোষণাও নিজ কানে শুনেছি। তাই, বিএনপির ২৬ মার্চ সংক্রান্ত নির্জলা মিথ্যা আজীবন ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে যাব।
এখন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত- ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শেষরাতে চট্টগ্রাম শহরতলির সিলিমপুরে অবস্থিত ওয়্যারলেস স্টেশনের জনৈক অপারেটর টেলিফোনে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি জহুর আহমদ চৌধুরীকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত মেসেজটি দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি বাসায় নেই জানতে পেরে ডা. নুরুন্নাহার জহুরকে ওই মেসেজটি ডিকটেট করেন। ওই মেসেজটি ডা. নুরুন্নাহার জহুর আওয়ামী লীগ অফিসে পৌঁছে দেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী মেসেজটি সাইক্লোস্টাইল করে প্রচারের সিদ্ধান্ত নেন। ২৬ মার্চ ভোর থেকেই চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের কর্মীরা ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা ও বেবিট্যাক্সিতে মাইক লাগিয়ে ঘোষণাটি শহরে প্রচারের পাশাপাশি সড়কের পথচারীদের মধ্যে ঐ লিফলেট বিলি করেছেন, যা আমিও পেয়েছি। এখন গবেষণায় প্রমাণিত হচ্ছে- আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে অগোচরে কয়েকটি ওয়্যারলেস মেসেজ নানা সূত্র থেকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু সাবধানতা অবলম্বন করেছিলেন- তাঁর নিজের কণ্ঠে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রমাণ যেন পাকিস্তান সরকার না পায়। কারণ তিনি জানতেন, দেশদ্রোহের এত অকাট্য প্রমাণ পেলে তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলাতে মোটেও বিলম্ব করত না সামরিক জান্তা!

২৬ মার্চ দুপুরের ঘোষণাটি আমি নিজে শুনিনি, রেডিও চালু হওয়ার খবর জানতাম না বলে। ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় রেডিও থেকে আবুল কাশেম সন্দ্বীপ আরও দুইবার স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন। নিজের কানেই শুনেছি প্রতিবার। ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় যখন মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন, সেটাও নিজের কানে শুনেছি। ওই রাতেই ৯টার দিকে যখন তিনি নিজেকে প্রভিশনাল সরকারের প্রধান হিসেবে ঘোষণা দিলেন- সেটাও শুনেছি। প্রথমবার তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা না দেওয়ায় প্রবল প্রতিবাদের মুখে ঘোষণাটি পরিবর্তন করে 'আওয়ার সুপ্রিম লিডার' বঙ্গবন্ধুর নামে সংশোধিত ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। সেটাও শুনেছি। এটাই তো সঠিক ইতিহাস। এটাও অস্বীকার করা যাবে না- ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় একজন 'আর্মি মেজর'-এর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শোনায় আমরা উদ্দীপ্ত হয়েছিলাম। কিন্তু মেজর জিয়ার ২৭ মার্চের সেই ঘোষণাকে ২৬ মার্চে নিয়ে আসার জবরদস্তি কেন? বড় কথা, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ভারতের একটি রেডিও স্টেশন থেকে তাজউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে প্রচারিত 'বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র'তে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ওই ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। (তখন ঘোষণা নিয়ে বিতর্কের জন্মও হয়নি)। যেহেতু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি, তাই ওটাকে অস্বীকার করলে বিএনপি বাংলাদেশে কীভাবে রাজনীতি করার অধিকার পাচ্ছে?
একটি ইতিহাস-বিকৃতি একেবারেই অক্ষম্য। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে বলা হয়েছিল- 'জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের' মাধ্যমে জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৯ সালে জিয়ার আমলে গৃহীত সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে এই গুরুত্বপূর্ণ বাক্যাংশটি পরিবর্তন করে বলা হয়- 'জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি'। এটা ভয়ংকর ইতিহাস-বিকৃতি। 'স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ' বললে শুধু একাত্তর সালের ৯ মাসের যুদ্ধ বোঝায়। কিন্তু 'জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম' বললে একাত্তরের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধসহ জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে অতীতের সব ঐতিহাসিক সংগ্রাম- গণঅভ্যুত্থান, নির্বাচন, অসহযোগ আন্দোলন অন্তর্ভুক্ত হয়।
এই সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে সাতটি প্রধান স্তম্ভকে ইতিহাসে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে- ১৯৫২ সালের ভাষা সংগ্রাম; ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয়; ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন; ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন; ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান; ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়; এবং ১৯৭১ সালের মার্চের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের ক্রমাগতভাবে বর্ধিত উচ্চতায় স্থাপিত সাতটি স্তম্ভ ঐতিহাসিক সংগ্রামের বিজয়-পর্বকে ধারণ করছে।
বিএনপির ভাষ্যমতে, মুক্তিযুদ্ধ নাকি শুরু হয়েছিল জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার কারণে। বিএনপির দাবি- বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা না দেওয়ায় নাকি জাতি বিভ্রান্তিতে পড়েছিল; যা থেকে জিয়ার ঘোষণা জনগণকে পথপ্রদর্শন করেছে। এই ইতিহাস-বিকৃতি এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে অস্বীকারের অপপ্রয়াস স্বাধীনতাবিরোধী ছাড়া দেশ-বিদেশে কেউ গ্রহণযোগ্য মনে করেনি।
ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে না চাইলে এই মিথ্যাচার থেকে বিএনপিকে সরে আসতেই হবে। রাষ্ট্র মেরামতের প্রস্তাবের আগে বিএনপিকে নিজেদের সৃষ্ট ইতিহাস বিকৃতি মেরামত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে স্বাধীনতার ইতিহাস এবং স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর প্রতি যথাযোগ্য শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে।
অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ; সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি
- বিষয় :
- রাজনীতি
- মইনুল ইসলাম