ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সদাচরণ রোজার সওয়াবকে পূর্ণ করে

সদাচরণ রোজার সওয়াবকে পূর্ণ করে
×

মুফতি আতিকুর রহমান

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৩ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৩ | ০৮:১৪

আদব আরবি শব্দ। বাংলাতেও এ শব্দের ব্যবহার বহুল। আদব শব্দের অর্থ হলো— বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, সভ্যতা, নৈতিকতা, মানবিকতা, শোভনতা ও শিষ্টাচার। আর আদব-কায়দা মানে ভদ্র সমাজের রীতি-পদ্ধতি ও ভদ্র ব্যবহার। অন্যভাবে বলা যায়, আদব-কায়দা মানে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা, সভ্যতা ও মার্জিত সংস্কৃতির দ্বারা আত্মগঠনের অনুশীলন করা। আর রমজান মাস হলো এমন অনুশীলনের সর্বোত্তম সময়।

রোজা রেখে সকলের সঙ্গে আদব রক্ষা করা অর্থাৎ বিনয়, নম্র ও ভদ্র আচরণ করা অপরিহার্য। অন্যথায় রোজার হক আদায় হবে না। রোজা হবে সওয়াবহীন। রোজা রেখে নৈতিকতার চর্চা করতে হবে। নৈতিক অবক্ষয় রোধ করার জন্যই রোজার বিধান দেয়া হয়েছে। রোজার সওয়াব পুরোপুরি লাভ করার জন্য সকলের ভিতর মানবিক বোধ জাগ্রত থাকতে হবে। ছোট বড় সকলের সঙ্গেই করতে হবে সদাচরণ।

সদাচরণ হলো, সকলের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলা, বড়দেরকে শ্রদ্ধা করা, ছোটদেরকে স্নেহ করা, হাসিমুখে কুশলাদি বিনিময় করা, কর্কশ ভাষায় কথা না বলা, ঝগড়া-ফাসাদে লিপ্ত না হওয়া, ধমক বা রাগের সুরে কথা না বলা, পরনিন্দা না করা, অপমান-অপদস্ত না করা।

যারা সদাচরণের অধিকারী, স্বভাবে নম্র-ভদ্র এবং কোমলতায় নিজেদের সৌন্দর্য মণ্ডিত করেছে তাদের জন্য জহান্নামের আগুনকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে সে লোকের কথা বলে দেব না? যার উপর জাহান্নামের আগুন হারাম হবে, যাকে জাহান্নামের আগুন পরিত্যাগ করবে। সে ঐ লোক, যার মেজাজ নরম, স্বভাব কোমল এবং আচরণ নম্র। মিশকাত ৫০৮৪

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কোন আমলের কারণে মানুষ বেশি জান্নাতে যাবে? তিনি বললেন, আল্লাহভীতি ও সুন্দর আচরণ। তিরমিজি ২০০৩

গৃহকর্মীদের নির্যাতন করা শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজ। এটি খুবই জঘন্য একটি স্বভাব। সংবাদ মাধ্যমে প্রায়শ গৃহকর্মীদের নির্যাতনের খবর সম্পর্কে জানা যায়। কেউ যদি রোজা রেখে রাগান্বিত হয়ে গৃহকর্মীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করে, গৃহকর্মীকে নির্যাতন করে, মন্দ কথা বলে, গালি দেয় তাহলে তার রোজা অযথা হয়ে যাবে। রোজার কোন সওয়াবই হবে না। কেননা হাদিসে এমন কাজকে জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই অধীনস্ত কর্মচারী ও গৃহকর্মীদের সঙ্গে মার্জিত ও কোমল আচরণ করা বাঞ্ছনীয়।

গৃহকর্তা যেমন আচরণ আশা করে গৃহকর্মী থেকে ঠিক তেমন আচরণ গৃহকর্মীর সঙ্গেও গৃহকর্তার করা চাই। এটাই নবীর শিক্ষা। রমজান মাসে অধীনস্তদের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারলেই রোজা হবে যথাযথ সওয়বসম্মত।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, এরা (অধীনস্ত কর্মচারীরা) তোমাদের ভাই, এদেরকে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তির এরূপ ভাই (কাজের লোক) তার অধীনে আছে, সে যেন তার খাদ্য হতে তাকে খেতে দেয় এবং তার পোশাক-পরিচ্ছদ হতে তাকে পরতে দেয়। সে এরূপ কাজের বোঝা যেন তার উপর না চাপায় যা করতে সে সামর্থ রাখে না। তার উপর সাধ্যাতীত কোন কাজের বোঝা চাপিয়ে দিলে মালিক যেন তাকে সহযোগিতা করে। তিরমিজি ১৯৪৫

রাসুল (সা.) আরো বলেন, অধীনস্তদের সাথে দুর্ব্যবহারকারী জান্নাতে যেতে পারবে না। তিরমিজি ১৯৪৬

রোজা সংযমের মাস। রোজার চাহিদা হলো পার্থিব সবকিছুতে সংযমী হওয়া। বিশেষকরে কথাবার্তায় সংযমী ও পরিমিতশীল হওয়া। শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণ করা। দাম্ভিকতা প্রকাশ না করা। বেশি কথা বলা, বাচালতা, প্রগলভতা ও দাম্ভিকতা রোজার আদবকে নষ্ট করে। রোজাকে করে সওয়াবহীন। কেননা অধিক কথায় অনিষ্টের সম্ভাবনা বেশি থাকে। আর দাম্ভিকতা রোজার শক্তিকে করে স্তিমিত। রাসুল (সা.) এর কাছে এসব লোক ঘৃণিত হিসেবে সাব্যস্ত এবং কিয়ামতের দিন তারা রাসুল (সা.) থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে থাকবে।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং কেয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে কাছে থাকবে সে ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে অধিকতর সুন্দর চরিত্রের অধিকারী। আর আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত এবং কিয়ামতের দিন আমার কাছ থেকে সবচেয়ে দূরে থাকবে বাচাল ও অহংকারী। তিরমিজি ২১০৮

অনেক সময় দেখা যায়, সারাদিন রোজা রাখার পর শেষ বিকালে মেজাজে একটু কঠিনত্ব চলে আসে। ফলে অনেকেই অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে কঠিন মেজাজে কথা বলে, পথচারীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে এবং রিকশাওয়ালাদের সঙ্গে রুক্ষ ভাষায় কথা বলে।

সারাদিনের মধ্যে রোজাদারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হলো শেষ বিকালের সময়টুকু। রমজানের এই সময়ে মেজাজ খারাপ হওয়ার মতো বিষয় সামনে আসতেই পারে। রোজাকে পূর্ণতায় নিয়ে যেতে চাইলে কঠোরতা প্রকাশ করা যাবে না। নিজেকে সংযত করতে হবে। এটাই রোজার শিক্ষা। রোজা যেমন ইবাদত তেমনি মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। এক ইবাদত করা অবস্থায় আরেক ইবাদতে ত্রুটি হলে উভয় ইবাদতই ত্রুটি বলে গণ্য হবে।

পবিত্র কোরআনে মানুষ আদিষ্ট হয়েছে সদাচরণ করতে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা তোমাদের পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, এতিম, দরিদ্র, প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথিক এবং যারা তোমাদের অধিকারে এসেছে, সবার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করো। সুরা নিসা ৩৬

সৎ ও মার্জিত আচরণ মানুষকে মুগ্ধ করে। আর মানুষের এমন মুগ্ধতায় মহান আল্লাহ খুশি হোন। আল্লাহ তায়ালা খুশি হোন বলেই রোজাদারের সৎ ও মার্জিত আচরণ রোজার সওয়াবকে পূর্ণ করে। আর রোজাদার পায় রোজার পরিপূর্ণ প্রতিদান। তাই রোজার পরিপূর্ণ সওয়াব পেতে এবং পরকালে রোজা দ্বারা উপকৃত হতে চাইলে সকলের সঙ্গে সদাচরণের বিকল্প নেই।


লেখক: ধর্মীয় নিবন্ধকার

আরও পড়ুন

×