ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতি

আওয়ামী লীগের গাজর এবং জামায়াতের দাঁত

আওয়ামী লীগের গাজর এবং জামায়াতের দাঁত
×

শেখ রোকন

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৩ | ১৮:০০

ইংরেজি ভাষায় ‘স্টিক অ্যান্ড ক্যারোট পলিসি’ বলে একটি ধারণা চালু আছে। বাংলায় বলা যায় ‘লাঠি ও গাজর নীতি’। প্রয়োজনমাফিক লাঠি কিংবা গাজর ব্যবহার করা; পরিস্থিতিমতো তিরস্কার করা কিংবা পুরস্কার দেওয়া। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কি বিরোধী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে সেই নীতি গ্রহণ করেছে? পাক্কা এক দশক পর জামায়াত ‘প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে’ রাজধানীতে সমাবেশ করতে পারার পর এই প্রশ্ন উঠেছে।

একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের কয়েকজন আটক হওয়ার পর, ২০১০ সালের জুন মাস থেকেই দলটি সভা-সমাবেশ করার অনুমতি পাচ্ছিল না। যদিও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝেমধ্যে ‘ঝটিকা মিছিল’ চালিয়ে যাচ্ছিল। গত ১০ বছর যখনই জামায়াতে ইসলামী কোনো সভা-সমাবেশ বা কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করেছে, তখনই আক্ষরিক অর্থে লাঠি হাতে দাঁড়িয়েছে পুলিশ। কখনও কখনও সঙ্গে থেকেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মী। এখন কি তাহলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে জামায়াতের জন্য আক্ষরিক লাঠির পরিবর্তে প্রতীকী গাজর পর্ব?  

শনিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সমাবেশের অনুমতিপ্রাপ্তি কোনো সমঝোতার অংশ কিনা– সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এটাও অস্পষ্ট নয়– ক্ষমতাসীন দলের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল জামায়াতের এই সমাবেশ নিয়ে। দেখা যাচ্ছে, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মিলনায়তন একই দিনে জাতীয় পার্টির যুব সংগঠন জাতীয় যুব সংহতি ভাড়া নিয়েছিল সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সম্মেলন আয়োজনের জন্য। ব্যানার-ফেস্টুন দিয়ে সে অনুযায়ী মিলনায়তনটি সাজানোও হয়েছিল। কিন্তু শুক্রবার মধ্যরাতে পুলিশের পক্ষে জাতীয় পার্টির দায়িত্বশীল নেতাদের ডেকে সম্মেলনস্থল পরিবর্তনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। জাতীয় যুব সংহতি বাধ্য হয়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সম্মেলনটি সম্পন্ন করে।

জামায়াতের সমাবেশ নিয়ে সরকারের পক্ষে এই ‘মরিয়া সহযোগিতা’ করার কী তাৎপর্য থাকতে পারে? যেখানে আওয়ামী লীগের ‘পলিটিক্যাল ন্যারেটিভ’ তথা রাজনৈতিক ভাষ্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি; সেখানে জামায়াতে ইসলামীর মতো চিহ্নিত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দলকে সুবিধা দিয়ে ক্ষমতাসীনরা রাজনীতির ক্ষেত্রে কী সুবিধা পাবে? বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে দলটির যে ভোটব্যাংক রয়েছে, সেখানে দেখা দিতে পারে আস্থার সংকট। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ইতোমধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছে– ‘এটা ৩০ লাখ শহীদের সঙ্গে বেইমানি’। (সমকাল, ১১ জুন ২০২৩)।

‘সন্দেহের সুবিধা’ দিয়ে বলা যেতে পারে, জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের অবস্থান বদলের নেপথ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি। মে মাসের চতুর্থ সপ্তাহে ঘোষিত ওই নীতিতে বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশে যারা বাধা দেবে, তাদের ক্ষেত্রেও নীতিটি প্রযোজ্য হবে। গত ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার সমাবেশের অনুমতি চেয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু পায়নি। এখন হঠাৎ সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের আর কী কারণ থাকতে পারে? শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশে বাধাদানকারী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কারণ এড়ানো ছাড়া?

জামায়াতের হঠাৎ মাঠে নামার সুযোগপ্রাপ্তি নিয়ে কিছু ষড়যন্ত্রতত্ত্ব অবশ্য দাঁড় করানো যায়। যেমন ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচন সামনে রেখে ‘আগুন সন্ত্রাসের প্রস্তুতি’ নিতে বিএনপিই জামায়াতকে মাঠে নামিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি যদিও ‘সব রাজনৈতিক দলেরই সভা-সমাবেশ করার অধিকার রয়েছে’ বলে বিতর্ক এড়িয়ে যেতে চাইছে; এটা স্পষ্ট যে, সাম্প্রতিক সময়ে দুই ‘সাবেক’ জোটসঙ্গীর মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে।

গত বছর আগস্টে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওতে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানকে বলতে শোনা গিয়েছিল– তাঁর দল বিএনপির জোটে নেই; বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করেই জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তৎকালীন পরিস্থিতিতে বিএনপিও স্পষ্টত চেয়েছিল জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নতুন হিসাবনিকাশে দুই দলই এখন পুনর্মিলন চাইতে পারে বৈকি। বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে সেটা অস্বাভাবিকও নয়।

এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বও ধর্তব্য যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে ধরে নিয়ে আওয়ামী লীগ চাইছে বিরোধী দলের মধ্যে যথাসম্ভব বিভাজন সৃষ্টি করতে, যাতে আওয়ামীবিরোধী ভোট ভাগাভাগি হয়। জামায়াতে ইসলামীকে এভাবে নির্বিঘ্নে সমাবেশ করতে দেওয়ার মধ্য দিয়ে দলটিকে নিয়ে বিএনপির মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে চায়। যদিও সেই সম্ভাবনা কিংবা আশঙ্কা আপাত সুদূর পরাহত। আদর্শিকভাবেই জামায়াতের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের স্বাভাবিক মিত্র হচ্ছে বিএনপি। এর ওপর গত দেড় দশকে দলটিকে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে, তারপর আওয়ামী লীগকে সুবিধা দেওয়ার মতো রাজনৈতিক অবস্থান প্রায় অসম্ভব।

প্রশ্ন হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামী কি আওয়ামী লীগ বা বিএনপির হিসাবমতো চলবে? এ ধরনের ক্যাডারভিত্তিক দল পরের মুখে ঝাল খাচ্ছে– এমন নজির বিশ্বজুড়েই নেই। সাময়িক কৌশলগত কারণে জোট বা আন্দোলনের ঐক্য হতে পারে; কিন্তু চূড়ান্ত অর্থে নিজেদের নীতি ও কর্মসূচিই অনুসরণ করে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে অতীতে অনেকবারই সেটা দেখা গেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে যেমন আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে; তেমনই পরে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী ও সরকার গঠনের জোটও করেছে।

আগামী নির্বাচন নিয়েও জামায়াতে ইসলামী যে নিজেদের মতো প্রস্তুতি নিচ্ছে ও কৌশল সাজাচ্ছে– সেটা ইতোমধ্যে স্পষ্ট। যেমন গত বছর অক্টোবরে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ নামে যে রাজনৈতিক দলটি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল, সেটা জামায়াতে ইসলামীরই ছদ্মবেশ বলে শোনা যায়। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন রয়েছে এমন দুটি ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দলেরও ৯০ ভাগ নেতাকর্মী নাকি প্রকৃতপক্ষে জামায়াতের। প্রয়োজনে যাতে ওই দুই দলের ব্যানারে নির্বাচনে যেতে অসুবিধা না হয়।    

‘স্টিক অ্যান্ড ক্যারোট’ ধারণাটি এসেছিল গাধা খাটানোর ইউরোপীয় উপকথা থেকে। লাঠির মাথায় গাজর ঝুলিয়ে সামনে ধরলে ভারবাহী জন্তুটি সেটা খাওয়ার জন্য সামনে এগোতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই গাধা যত এগোয়, গাজর তত দূরে সরতে থাকে। মাঝখান থেকে আরোহীর উদ্দেশ্য সাধন হয়। কিন্তু গাধার জায়গায় যদি হাতি থাকে, তাহলে আরোহীর উদ্দেশ্য সফল নাও হতে পারে। সময়মতো ঠিকই গা-ঝাড়া দিয়ে পিঠ থেকে ফেলে দেবে।

কথায় আছে– হাতির দাঁত দুই ধরনের । একটি দেখানোর; আরেকটি খাওয়ার জন্য।  দেখানোর ‘গজদন্ত’ থাকে মুখের বাইরে, আর খাওয়ার দাঁত থাকে মুখের ভেতরে। অতীতে বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর দেখানোর দাঁত ও খাওয়ার দাঁত আলাদা। এখন যে জামায়াতে ইসলামীকে দেখা যাচ্ছে– নেতৃত্বের বড় অংশ ফাঁসিপ্রাপ্ত বা কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বা নিষ্ক্রিয়– সেটা খাওয়ার দাঁত, নাকি দেখানোর? খাওয়ার দাঁত কি লুকিয়ে রেখেছে অন্য নামে নিবন্ধন চাওয়া দল বা নিবন্ধন পাওয়া অন্য দলের আড়ালে?

আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যে জোট বা ভোটের হিসাবনিকাশ করছে, সেটা আসলে জামায়াতে ইসলামীর কোন দাঁত? বড় আশা নিয়ে কোন দাঁতের সামনে গাজর তুলে ধরা হচ্ছে?

শেখ রোকন: সহযোগী সম্পাদক, সমকাল
skrokon@gmail.com

আরও পড়ুন

×