সংস্কৃতি
হাতের কলম জনম দুখী তাকে বেচো না
মামুনুর রশীদ
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
‘আলু বেচো, ছোলা বেচো, বেচো বাখরখানি/ বেচো না বেচো না বন্ধু তোমার চোখের মণি… ঘরদোর বেচো ইচ্ছে হলে, করবো নাকো মানা/ হাতের কলম জনম দুখী, তাকে বেচো না।’
ঠিক কী অর্থে বন্ধুবর প্রতুল মুখোপাধ্যায় সমীর রায়ের এই লাইনগুলোয় সুর ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন, তা অনুমান করা মোটেই কঠিন নয়। সহজিয়া ভঙ্গির প্রায় খালি গলায় গানটি গেয়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। লেখকের কলম যখন মানুষের বিরুদ্ধে যায়, তখন দুখী কলমের কিছু করার থাকে না। বাজেটে সব সময় বঞ্চিত হয় সংস্কৃতি, যদিও এই খাতে বরাদ্দ করা অর্থের ব্যয় কতটা সঠিকভাবে হয়, তাও আমরা জানি না।
দুর্ভাগ্যবশত, এবার বাজেটে কলমের ওপরেই কর বসানো হয়েছিল। যদিও পরে কলমের উপকরণ থেকে বাড়তি ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু চিন্তাটা কেন এসেছিল– সেটাই বড় প্রশ্ন। কলম থেকে কত টাকাই বা রাজস্ব আদায় হতো, তা অবশ্য আমরা জানি না। কিন্তু কলম তো শিক্ষা উপকরণ। কাগজের ওপর হঠাৎ দাম বাড়ায় গত একুশে বইমেলার আগে প্রকাশকদের ত্রাহি রব আমরা শুনেছি। এবার বোধ হয় চিন্তা করা হয়েছিল, বড় লোকের ছেলেরা কলম দিয়ে লিখবে না; ল্যাপটপ বা কম্পিটারে লিখবে। কলম হাতের সঙ্গে মস্তিষ্কের একটা যোগাযোগ রয়েছে বটে, বড় লোকের ছেলেরা যে দামেরই হোক, তা কিনে নিতে অসুবিধা কোথায়? দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্তরা ‘দামি’ কলম কিনবে কীভাবে, সেটা বোধ হয় অর্থমন্ত্রী ভাবেননি। ধনবিজ্ঞানে পটু আমলাদেরও কলমের মতো কোমল বিষয়ে স্পর্শকাতরতা আছে বলে মনে হয় না।
কলম একটি রূপক। এর দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে সংবেদনহীনতার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি, শিক্ষার প্রতি মন্ত্রী ও আমলাদের অসংবেদনশীলতা স্পষ্ট হয়। আমাদের সভ্যতা দেখিয়েছে– নিরক্ষর থেকে সাক্ষর হওয়ার মুহূর্তে হাতেখড়ি দেয় একটি কলম বা পেন্সিল। সংখ্যা গণনার অতীত প্রত্যুষে যেদিন মানুষ আঁক কষে ভূমিতে, প্রস্তরগাত্রে বা প্যাপিরাসে এবং অবশেষে কাগজের গায়ে; সেসব সভ্যতার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তার পরও কাগজের আবিষ্কার এক বিপ্লব। অনেক পরে অক্ষর বা বাক্য। কাব্য, উপন্যাস, চিত্রকলা– সবকিছুর মূলেও কলম। সেই কাগজের দাম হুহু করে বাড়ে। কলমে ট্যাক্স বসানোর পাঁয়তারা চলে এই দেশে!
বাজেট অর্থ মন্ত্রণালয় করে থাকে। সেই মন্ত্রণালয়ে এখন আর অর্থনীতিবিদরা নেই। স্বাধীনতার পর দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদরা পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে ছিলেন; যাঁদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বখ্যাত। তাঁরা অর্থ মন্ত্রণালয়কে একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী করে দূরদৃষ্টি দিতে চেয়েছিলেন। আমলাদের কাছে তাঁরা বিরাগভাজন হয়েছেন। সামরিক শাসনের ফলে তাঁরা আর থাকতে পারেননি। এর পর ধনবিজ্ঞানে পটু কিছু আমলা রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করেন। আমলারা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদটিও নিয়ে নিয়েছেন। আমলা প্রণীত বাজেটেই কলমের দাম বাড়ানোর মতো অবিমৃষ্যকারিতা থাকতে পারে।
অবশ্য রাষ্ট্রটাই চলে গেছে উচ্চবিত্তের হাতে। এখন শুধু ঢাকা শহর নয়; প্রতিটি জেলা শহরে যে পরিমাণ কোটি টাকার ওপরে গাড়ি চলতে দেখা যায়, তখনই দেশের অর্থনীতিটা কার সেবায় নিয়োজিত, তা বোঝা যায়। উপজেলা এবং জেলা প্রশাসনেও অতিরিক্ত দামি গাড়ির ছড়াছড়ি। এই দামি গাড়ি চালানোও ব্যয়বহুল। ভারতে সুদীর্ঘ দিন তাদের নির্মিত অ্যাম্বাসাডর গাড়ি চলেছে। উপজেলা প্রশাসনে এত মূল্যবান গাড়ি কেন প্রয়োজন হয়? এর পর জেলা প্রশাসক সাহেব তো একা নন; তাঁরও একটা গাড়ির বহর আছে। কে যেন উদ্যোগ নিল– সংসদ সদস্যদের বিনা শুল্কে গাড়ি দিতে হবে। এসব করে সরকারি ব্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপুল। এই বিপুল ব্যয়ের বোঝা জনগণের ওপর।
সরকারের হাতে আবাসনের প্লটগুলো কারা পায়? বর্তমান এবং সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলার– সবাই তো গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি এবং বর্তমানে পূর্বাচল বা ঝিলমিলের প্লট পেয়ে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে বড় বড় প্লটের মালিক হচ্ছেন বড় ব্যবসায়ীরা। বহু বছর আগে থেকেই কলকাতায় সরকারি প্লটগুলো সমবায়ের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। তাতে তিন কাঠার একটি প্লটে ১৬ জনের আবাসন সম্ভব হচ্ছে। আমাদের দেশে একবার প্লট পেয়ে গেলে আর কলমের প্রয়োজন হয় না। সরকারি টাকায় ভূমি তৈরি হবে। ডেভেলপার কোম্পানি ফ্ল্যাট ভাগাভাগি করবে; নগদ টাকাও দেবে। প্লট মালিক এই কাঁচা টাকা দিয়ে গাড়ি কিনবে; বিদেশে অর্থ পাচার করবে; সমাজকে ভোগ্যপণ্যের বাজারে পরিণত করবে।
শিক্ষাব্যবস্থাও এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, সেখানেও টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি। ছাত্রদের বেতন, ভর্তি ফি; সবই চড়া। সেই সঙ্গে প্রাইভেট টিউটর কোচিং পাস করার পর নিয়োগ বণিকদের দিতে হয় টাকা। চাকরি পাওয়ার পর আর পায় কে! যত্রতত্র টাকা। কলম তখন জনম দুখী; এর কোনো কাজ নেই।
কলমের আবার দুটো চরিত্র; বশ্যতার কলম আর বিদ্রোহের কলম। ভাগ্যিস, ব্রিটিশদের এত সূক্ষ্ম বুদ্ধি ছিল না। থাকলে কাগজ-কলম-কালির ওপর এমন ট্যাক্স বসানো হতো যে, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল আর লেখার উপকরণ কিনতে পারতেন না। নজরুল বিদ্রোহী কবিতা লিখতেন কীভাবে? মন্ত্রীরা প্রায়ই অবশ্য বলেন, অসির চাইতে মসি শক্তিশালী। এ কথাও বলেন, সংস্কৃতি বাংলাদেশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। অথচ কালি-কলম এবং কাগজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জনম দুখীই থেকে যায়। দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ধস নামল; নিয়োগ বাণিজ্যে সয়লাব হয়ে গেল; কোচিং সেন্টারের ব্যবসা হুহু করে বেড়ে শিক্ষার মূল আদর্শকেই শেষ করে দিল। তাতেও কেউ কথা বলছেন না।
কলম একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতির আঙ্গিক। ডিজিটালকে জনপ্রিয় করতে গিয়ে কলমকে ভোঁতা করে দিতে হবে? প্যাপিরাসের ওপর কলমের দাগ পড়েছে, সেও আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে। বাঁশের তৈরি কলম আমরাও বাল্যকালে ব্যবহার করেছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে দেখেছি, কোনো সভায়, আলোচনায় তিনি কলম দিয়ে নোট নিতে থাকেন। কলমের প্রয়োজন এবং মর্যাদা তিনি অনেকের চেয়ে ভালো বোঝেন। এটা বোধ হয় গ্রিসের কোনো দার্শনিকেরই মন্তব্য– যে দেশ সে দেশের শিল্পীদের অবজ্ঞা করে, সে দেশ একটা দুর্ভাগ্যের মধ্যে পড়বেই। সেই সঙ্গে এও বলতে চাই, কলমকে অবজ্ঞা করলে তার পরিণতি যে ভালো হয় না– তা আমরা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারি।
দেশে এমনিতেই জ্ঞানের চর্চা কমে যাচ্ছে। বই এখন আর আনন্দের বিষয় নয়। শেখার চাইতে নম্বর পাওয়া বড় হয়ে যাচ্ছে। মানবিক এবং বিজ্ঞানচর্চা কমে গিয়ে এখন শুধু চাকরির চর্চা এবং তা সরকারি চাকরি। দেশের সেবা করার জন্য চাকরি নয়; নিজের সেবা করার জন্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সম্পদ গড়ার জন্য চাকরি চাই। আমাদের বাল্যকালে এমনকি কৈশোরেও হাতের লেখা সুন্দর করার একটা ক্রমাগত চাপ আসত শিক্ষকদের কাছ থেকে। প্রথমে বাঁশের কলম, পরে নিবের কলম এবং ক্লাস এইট-নাইনে পড়ার সময় দেওয়া হতো একটা ফাউন্টেন পেন। বলপয়েন্ট কলম তখনও আসেনি। বলপয়েন্ট দিয়ে পরীক্ষা দেওয়াও তখন নিষিদ্ধ। ওই বয়সে কলম ছিল সবচেয়ে বড় উপহার। এখনও কেউ একটা কলম উপহার দিলে আমরা খুব খুশি হই।
এই লেখা যখন লিখছি, ততক্ষণে বাজেট পাস হয়ে গেছে। কলমের উপকরণের ওপর বাড়তি কর প্রত্যাহারও হয়েছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে দেশের কর্তাব্যক্তিদের যে মানসিকতার পরিচয় মিলল– সেই দাগ সহজে মুছবে না কাগজ-কলমের হৃদয় থেকে।
মামুনুর রশীদ: নাট্যব্যক্তিত্ব
- বিষয় :
- সংস্কৃতি
- মামুনুর রশীদ