রাজনীতি
স্বৈরাচার পতন দিবসের সমকালীন তাৎপর্য
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৪:৩৩
৬ ডিসেম্বরকে বলা হয় স্বৈরাচার পতন দিবস। ১৯৯০ সালের এ-দিনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করেছিলেন। এরশাদ ১৯৮২ সালে সেনাবাহিনীর প্রধান থাকাকালে গায়ের জোরে বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের কাছ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলেন। প্রায় ৯ বছরের শাসনকালে কয়েক দফা নির্বাচনের মাধ্যমে তার সে ক্ষমতা দখলকে জায়েজ করার চেষ্টা করলেও জনগণের বৃহত্তর অংশের চোখে তিনি কোনোদিনই বৈধ শাসক বলে বিবেচিত হননি। স্বৈরাচার বলেই তিনি বরাবর পরিচিত ছিলেন। অতএব, তার ওই পদত্যাগের দিনটি পরিচিতি পায় স্বৈরাচার পতন দিবস হিসেবে।
প্রতিবারের মতো এবারও নিশ্চয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দিবসটি পালন করছে শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং আলোচনা সভার মাধ্যমে। তবে, অন্তত গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় বলা যায়, সব রাজনৈতিক দল সমান গুরুত্বের সঙ্গে দিবসটি পালন করছে না। যেমন আওয়ামী লীগের কাছে দিবসটি পালন অনেকাংশেই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আবার বিএনপির কাছে অন্তত এ সময়ে তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা দিবস।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি নেতাকর্মী হারিয়েছে আওয়ামী লীগ। সে সময় জেল-জুলুম মোকাবিলার প্রশ্নেও দলটির ধারেকাছে কেউ নেই। তারপরও দলটির কাছে দিবসটি ইদানীং তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। এর কারণও গোপন কিছু নয়। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এরশাদেরই প্রতিষ্ঠিত দলটি, জাতীয় পার্টি যার নাম, তার ঘনিষ্ঠ মিত্র। ২০০৮ সাল থেকে তারা বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনগুলো পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমেই করে আসছে। ২০১৪ সালের পর থেকে এখনও জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল যে জাতীয় পার্টি- তা মূলত আওয়ামী লীগেরই অবদান। এবং এটা তারা করেছে নিজেদেরই স্বার্থে- প্রধানত ক্ষমতার রাজনীতির খেলায় তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে কোণঠাসা করার লক্ষ্যে। আওয়ামী লীগের সমালোচকরা অবশ্য বলবেন, অন্তত সুশাসন প্রশ্নে আওয়ামী লীগ গত এক যুগ ধরে ক্ষমতায় থেকে জনগণকে এরশাদের চেয়ে খুব একটা ভিন্ন কিছু দিতে পারছে না; তাই স্বৈরাচার পতন দিবস পালন তার জন্য বরং আত্মপ্রবঞ্চনারই নামান্তর। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর তিন দফা শাসনকালে বিএনপি কি খুব গণতান্ত্রিক শাসন উপহার দিয়েছিল? মোটেও না। আর এরশাদ ক্ষমতা নেওয়ার আগ পর্যন্ত আরেক সামরিক স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত দলটির ট্র্যাক রেকর্ড যদি আনা হয় তাহলে তো এর নেতারা মুখ লুকানোরও জায়গা পাবেন না। এতকিছু সত্ত্বেও বিএনপি বেশ জোরালোভাবেই স্বৈরাচার পতন দিবস পালন করে; এটাই বাস্তবতা। আসলে এরশাদের দল যদি ২০০১ সালের আগে যেভাবে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের শরিক হয়েছিল, আজও সেভাবেই থাকত তাহলে বিএনপির কাছেও দিবসটি এক রকম পানসে হতো।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি বামপন্থি দলগুলোও বেশ জোরদার ভূমিকা রেখেছিল। তারাও নিশ্চয় দিবসটি গুরুত্ব দিয়ে পালন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এটা মানতেই হবে, গত তিন দশকে বুড়িগঙ্গায় যেমন অনেক জল গড়িয়ে গেছে, তেমনি বাম দলগুলোও নানা কারণে দফায় দফায় ভাঙনের শিকার হয়েছে। আর সে ভাঙনের পাশাপাশি তাদের ভুল রাজনৈতিক কৌশলের কারণে ইতোমধ্যে বাম দলগুলো রাজনীতির খেলায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। ফলে স্বৈরাচার পতন দিবস নিয়ে বাম নেতারা যত গুরুত্বপূর্ণ কথাই বলুন, সেগুলো শোনার মানুষ এখন নেই বললেই চলে। স্বৈরাচার পতন দিবসটি শুধু যে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অনুষ্ঠানসর্বস্বতায় পর্যবসিত হয়েছে, তা নয়। জনগণের দিক থেকেও যে এ দিবসটির প্রতি খুব আগ্রহ আছে, তা বলা যায় না। এর একটা কারণ হতে পারে, এরশাদ-পরবর্তী শাসকরাও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে খুব বেশি সাফল্য দেখাতে পারেনি। সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র এরশাদের সময়ের মতো এখনও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পলিসি নির্ধারণে আধিপত্য চালাচ্ছে। ব্যবসার ক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ এখনও কমবেশি দুর্বৃত্তদেরই হাতে।
কিন্তু এ কথাটাও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না- এ দেশে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন জনগণের জন্য অনেকটা রুটিন কাজের মতো। এখানকার মানুষ ১৯৬০-এর দশকে স্বাধীনতার আগে আইয়ুবের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তার পতন ঘটিয়েছিল। কিন্তু তার জায়গায় এসেছিল ইয়াহিয়ার মতো আরেক সামরিক শাসক। স্বাধীনতার পরও মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় প্রথমে খন্দকার মোশতাক, পরে জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে এখানে সামরিক শাসন চেপে বসেছিল। এক দিক থেকে এরশাদ ছিলেন তাদেরই ধারাবাহিকতা মাত্র। এসব প্রসঙ্গ এখানে তোলার উদ্দেশ্য এটা বোঝানো যে, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন এ দেশের জনগণের কাছে যেমন নতুন কিছু নয়; তেমনি সামরিক শাসকের পতনও তাদের কাছে বিশেষ কিছু নয়।
তবে এটা স্বীকার করতে হবে- এরশাদবিরোধী আন্দোলন এ দেশে সামরিক শাসনের পুনরাবৃত্তির পথকে কঠিন করে দিয়েছে; যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনকাল। তখন সুযোগ পেয়েও সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় লোকরা সরাসরি ক্ষমতা দখলের সাহস দেখাননি। এমনকি তাদের পক্ষ থেকে রাজনীতিকে 'পরিশুদ্ধ' করার অনেক প্ল্যান-প্রোগ্রামের কথা শোনা গেলেও শেষমেশ সবকিছু প্রায় আগের অবস্থায়ই রেখে তারা পাততাড়ি গুটিয়েছেন। যে যেভাবেই বিশ্নেষণ করুন, এর পেছনে যে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ রুদ্র রূপ দেখা গেছে, সেটাই ভূমিকা রেখেছে- তা মানতে হবে। রাজনীতিতে অনেক সংকট বিরাজমান সত্ত্বেও এখনও যে গণতন্ত্রমনা মানুষ জোর গলায় বলতে পারে, এ দেশে সামরিক শাসন সুদূর পরাহত হয়ে পড়া এই স্বৈরাচার পতন দিবসেরই ফল।
সাইফুর রহমান তপন: সাংবাদিক ও সাবেক ছাত্রনেতা
- বিষয় :
- রাজনীতি
- সাইফুর রহমান তপন