ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতি

মাছের তেল দিয়ে মাছ ভাজার 'আন্দোলন'

মাছের তেল দিয়ে মাছ ভাজার 'আন্দোলন'
×

মো. রবিউল ইসলাম

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০

বাংলা প্রবাদে বলা হয়- ঝিকে মেরে বউকে শেখানো। যদিও তাতে আদৌ বউ শেখে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, বলাই বাহুল্য। তবে এমন সব লৌকিক প্রবাদ একুশ শতকের বাঙালির চরিত্রেও পরিলক্ষিত হয়; বিশেষ করে কোনো জনরোষ থেকে তাদের সৃষ্ট আন্দোলন সংগঠন ও পরিচালনায়।
সম্প্রতি, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়াতে যানবাহনের ভাড়া বেড়েছে। তার চেয়ে অধিক মাত্রায় বেড়েছে পণ্যমূল্য। পণ্যমূল্য ও ভাড়া উভয় বৃদ্ধিতেই সরকার ও ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে তেলের দাম বৃদ্ধিকে দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু পণ্যমূল্য বাড়াতে কোনো আন্দোলন বা প্রতিবাদ নেই। আন্দোলন হচ্ছে যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোকে কেন্দ্র করে। এতে, লোকাল বাসের ভাড়া কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও, দূরপাল্লার বাস, লঞ্চ বা বিমানের ভাড়ার ইস্যু সামনে আসছে না। এমন আন্দোলনগুলোর চরিত্র, পলিটিক্স আর ব্যাকগ্রাউন্ড সূক্ষ্ণভাবে পর্যালোচনা করলে বাঙালির আন্দোলনের রকমফের খানিকটা পরিস্কার হবে।
বাঙালি হিসেবে আমরা আসলে 'শক্তের ভক্ত আর নরমের যম'। তাই চোখের সামনে দিয়ে আমরা পিঁপড়াও যেতে দিতে চাই না। অথচ পেছন দিক দিয়ে হাতি চলে গেলেও আমাদের যেন কিছু যায় আসে না। যানবাহনের ভাড়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কিন্তু নিশ্চয় জীবন বাঁচানো পণ্যমূল্যের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয়। তেলের ঊর্ধ্বমূল্য লোকাল মার্কেটে চালু হওয়ার আগে, সেই যে পণ্যমূল্য বেড়েছে, তা আর কমার নাম-গন্ধ নেই; যদিও বিশ্ববাজারে তেলের দাম সম্প্রতি কিছুটা কমেছে। কিন্তু এদেশ এমন যে, এখানে একবার কোনো কিছুর দাম বাড়লে আর কমতে চায় না। যদিও এর আগে বিভিন্ন ছুতোয় বিশেষ বিশেষ জিনিস যেমন পেঁয়াজ, রসুন, তেল ও চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। নিরীহ মানুষ তা মেনে নিয়েছে কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই। অথচ এমন ঊর্ধ্বমুখী পণ্যমূল্যের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে গরিব ও মধ্যবিত্তদের জীবনে আজ ত্রাহি দশা। পরিবহনের ভাড়ার আন্দোলনের মধ্যে পণ্যমূল্যের প্রতিবাদ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। অথবা এই মহা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি এক প্রকার হারিয়ে গেছে। অথচ পাশের দেশ ভারতে আলুর দাম কেজিতে দুই রুপি বেড়ে যাওয়ায় হয়েছে তীব্র আন্দোলন। করা হয়েছে জনস্বার্থে মামলা। কিন্তু আমরা বেখেয়ালি জাতি খুশি আছি বাসে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া, আর সঙ্গে মেতে আছি কাঁচাবাদাম গানের উন্মাদনা নিয়ে।
আগে যে কোনো জনস্বার্থের ইস্যুতে রাজপথ কাঁপানো বা প্রতিবাদ করার মূল দায়িত্ব থাকত মূলধারা ও বিকল্প ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর। কিন্তু সে অবস্থার আজ যবনিকাপাত ঘটেছে। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বিএনপি তাদের দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার ব্যাপারে অথবা ক্ষমতার পালাবদলের নিমিত্তে সুষ্ঠু নির্বাচনের ইস্যুতে যতটা সোচ্চার, তার সিকিভাগ প্রতিবাদও কোনো সাক্ষাৎ জনস্বার্থমূলক ইস্যুতে, যেমন পণ্যমূল্যের ক্ষেত্রে দেখায়নি। জাতীয় পার্টি আর জামায়াতে ইসলামীও রাজনৈতিক হিসাবের বলয় থেকে বেরিয়ে এসে কোনো প্রতিবাদী ভূমিকা রাখেনি। বাম দলগুলো যদিও কিছুটা আওয়াজ তোলার চেষ্টা করেছে, তবে তা জাতীয় প্রেক্ষাপটে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। ইসলামভিত্তিক দলগুলো তো ইসলামিক ইস্যুর বাইরে সামগ্রিক জনস্বার্থমূলক ইস্যুতে তেমন একটা সোচ্চার কখনোই ছিল না। এভাবেই রাজনৈতিক দলগুলো জনস্বার্থের ইস্যুগুলোকে তাদের প্রায়োরিটি লিস্ট থেকে বাদ দিতে দিতে নিজেরাই অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তবে লাভ-ক্ষতির হিসাব কষে রাজনৈতিক দলগুলো যদিও আন্দোলনের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে ও যথারীতি জনস্বার্থের ইস্যুগুলোকে তলানিতে রাখে; তবে, মাছের তেল দিয়ে মাছ ভাজতে আবার তাদের আগ্রহে কমতি থাকে না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জনগণের আন্দোলনকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের নামে চালাতে চায়। নিজেরা নিরাপদ দূরত্বে থেকে, সাধারণ জনগণ আর ছাত্রদের দিয়ে যেন সব করিয়ে নিতে চায়!
পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের যুগে দেশে দেশে সরকারগুলোর ভেতর মূলধারার রাজনীতিকরাও বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ভিড়ে অনেক ক্ষেত্রে অসহায় বোধ করেন। যে জনগণের জন্য নিবেদিত হয়ে তাদের রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল, সেই আদর্শিক রাজনীতি আজ কোণঠাসা। ইচ্ছা থাকলেও ক্ষমতা আর স্বার্থের কাছে জনবান্ধব রাজনীতি আর রাজনীতিকরা আজ পরাজিত। তাই সরকারি দলের, দেশপ্রেমিক আর ত্যাগী নেতারাও জনস্বার্থের ইস্যুতে কথা বলতে দ্বিধাগ্রস্ত হন অনেক সময়।
এদেশের আবেগি বাঙালি ১৯৭১-এ ঝাঁপিয়ে পড়ে; সামান্য অস্ত্রশস্ত্র আর অফুরন্ত মনোবল দিয়ে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিল। তখন তাদের পথ দেখানোর জন্য যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ছিল না। বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতাসহ অসংখ্য মুক্তিকামী, সুচিন্তিত নেতৃত্ব আর ময়দানের জীবন-বাজি ধরা মানুষ সেদিন তাদের মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করতে ভুল করেননি। তখন জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে রাজনীতিকরাও আপস করেননি। ভাগ্য ভালো যে, এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামটা ১৯৪৮ থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মধ্যে সংগঠিত ও সংঘটিত হয়েছিল। একুশ শতকের পুঁজিবাদী আর ষড়যন্ত্রী রাজনীতির ছোঁয়া লাগলে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামও ছিনতাই হয়ে যেত নির্ঘাত!
আজও এদেশে সঠিকভাবে নির্ধারিত হলো না আন্দোলন বা প্রতিবাদের বিষয়বস্তু। পাল্টে গেছে আন্দোলনকারীদের চরিত্রও। যাদের প্রতিবাদ করার কথা, তারা প্রতিবাদ না করে, প্রতিবাদ করতে বাধ্য হচ্ছে অন্যদের! সর্বোপরি, যে মূল রাঘববোয়াল কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের বিরুদ্ধে আন্দোলন হওয়ার কথা; তা না হয়ে আন্দোলন হয় শুধু লোকাল বাস মালিক আর শ্রমিকদের বিরুদ্ধে। মূল জনস্বার্থবিরোধীরা তাই থেকে যায় অধরা।
মো. রবিউল ইসলাম :সহযোগী অধ্যাপক, আইন ও বিচার বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×