ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইউক্রেনে পশ্চিমা শক্তির বিপর্যয়ের কারণ

আন্তর্জাতিক

ইউক্রেনে পশ্চিমা শক্তির বিপর্যয়ের কারণ
×

মঞ্জুরে খোদা

মঞ্জুরে খোদা

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৪ | ০০:০০

ইউক্রেন অভিযান শুরুর এক পর্যায়ে রাশিয়া কিছুটা বেকায়দায় থাকলেও, এখন তারা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে ইউক্রেনের আরও ভেতরে অগ্রসর হচ্ছে। ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর আভদিভকা দখলের পর পুতিনের ঘনিষ্ঠজন ও রুশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মেদভেদেভ বলেছেন, তারা কিয়েভ দখলের লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন।  

যুদ্ধে ইউক্রেনের ক্রমাগত পিছু হটার প্রেক্ষাপটে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ইউরোপের ২৬টি দেশের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় প্যারিসে। সেখানে ইউক্রেনের পরাজয় ঠেকাতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এই সৈন্য পাঠানোর প্রস্তাব উত্থাপন করলেও অন্যান্য দেশ তা নাকচ করে দেয়। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাখোঁ বলেন, সৈন্য পাঠানোর সম্ভাবনা তিনি পুরোপুরি নাকচ করে দেননি। তিনি বলেছেন, ‘রাশিয়াকে কোনোভাবেই ইউক্রেন যুদ্ধে জিততে দেওয়া যাবে না।’ বৈঠকে এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২৯ ফেব্রুয়ারি বলেন, ন্যাটো বা ইউরোপের কোনো দেশ যদি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ইউক্রেনে সৈন্য পাঠানোর স্পর্ধা দেখায়, তাদের চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে। মার্চে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে তিনি আরও বলেন, ‘মস্কোর কাছে থাকা পরমাণু অস্ত্রগুলো যে কোনো সময় পশ্চিমা দেশগুলোয় আঘাত হানতে সক্ষম।’ তাঁর এ ভাষণের পর বিশ্ব নড়েচড়ে বসে। 
এই যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু নিজেদের সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছিল। জার্মান সেনা কর্মকর্তাদের ৩৮ মিনিটের অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে উত্থাপিত রাশিয়ার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়। এতে পশ্চিমা শক্তি বেকায়দায় পড়ে যায়। কেননা, রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সংযোগ কার্চ সেতু আক্রমণে ব্রিটিশ সৈন্যরা সরাসরি ইউক্রেনকে সাহায্য করেছিল। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো জোটবদ্ধ হয়ে রাশিয়াকে পরাস্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 

এই যুদ্ধে ইউক্রেনের পাশাপাশি রাশিয়ারও লক্ষাধিক সৈন্য হতাহত হয়েছে। উপরন্তু রাশিয়াকে একঘরে করা, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা, পুতিনকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যায় এমন কোনো চেষ্টা নেই, যা পশ্চিমা শক্তি করেনি। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। রাশিয়ার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বাণিজ্যিক অবরোধের ফলও হয়েছে বিপরীত। যুদ্ধের সময় ২০২৩ সালে মধ্য এশিয়ার জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। তাদের এই ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি হয়েছে রাশিয়ার মধ্য এশিয়া নীতির কারণে। পশ্চিমা দেশগুলোও সেখানে তাদের তৎপরতা চালিয়েছে। কিন্তু রাশিয়া যেভাবে তাদের বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, নিরাপত্তা সুবিধা দিয়ে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় উন্নয়নের অংশীদার হয়েছে, পশ্চিমারা সেটা করতে পারেনি। ইউরোপের বাজার বন্ধ হলেও রাশিয়া রাতারাতি ছাড়কৃত মূল্যে চীন, ভারত, ব্রাজিলের কাছে তাদের পণ্য বিক্রি করে সংকট পুষিয়ে নিয়েছে। 

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাখোঁ কেন ইউক্রেনে সৈন্য পাঠাতে এত তৎপর? ফ্রান্স হচ্ছে এক ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। বিশ্বের অত্যতম সম্পদশালী অঞ্চল আফ্রিকার দেশগুলোয় তাদের যে নিয়ন্ত্রণ ছিল, তা গত কয়েক বছরে একেক করে হাতছাড়া হয়েছে। আফ্রিকার দেশে দেশে ফ্রান্স, মার্কিন ও পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। সেখান থেকে তাদের হাত গুটিয়ে আসতে হয়েছে। দীর্ঘ নিষ্পেষণে থাকা আফ্রিকার দেশগুলোয় চীন, রাশিয়া ব্যবস্যা, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা নিয়ে ঢুকে পড়ছে। ফ্রান্সের সাম্রাজ্য চীন-রাশিয়া হানা দিয়ে তছনছ করে দিয়েছে। এর পর ইউক্রেনের বাজিতে হেরে গেলে তা হবে তাদের জন্য বড় আঘাত। 

পশ্চিমা নেতারা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া বিজয়ী হলে ইউরোপের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। রাশিয়ার ইউক্রেন-আধিপত্য যদি গোটা ইউরোপের জন্য হুমকি হয়, তাহলে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে টেনে নেওয়ার মাধ্যমে কি রাশিয়ার জন্য হুমকি তৈরি করা হচ্ছে না? রাশিয়ার উঠানে অস্ত্র-গোলাবারুদ বিছিয়ে রাখলে তারা কেন তাদের ঘর নিরাপদ করতে কামান দাগবে না? পুতিন একাধিকবার বলেছেন, ইউরোপের বিষয়ে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। তাহলে পশ্চিমা শক্তি কেন ভয় ছড়াচ্ছে? রাশিয়াকে যারা ইউরোপের অংশ বলে স্বীকার করে না; মনে করে না, রাশিয়াও সাদা চামড়ার দেশ। তারা এশিয়ান বা ইউরোশিয়ান। ভেতরে শ্বেতাঙ্গবাদের ধারণা পোষণ করলেও তারা প্রকাশ করছে উদারতা ও মানবতার চেহারা। তাদের পক্ষে রাশিয়ার উত্থান, প্রভাব মেনে নেওয়া কঠিন। বাদামি চামড়ার রাশিয়ার চেয়ে বরং মার্কিনিদের প্রভুত্ব মেনে নেওয়াই শ্রেয়! মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন পুতিনের পরমাণু হুমকির কথা উল্লেখ করে তাঁকে ‘কুকুরের বাচ্চা’ বলে গালি দিয়েছেন। এতে বুঝতে অসুবিধা হয় না পুতিনের প্রতি তাদের ক্রোধ-আক্রোশের পরিধি।  

সাত দশক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকির ওপর পারমাণবিক বোমা বর্ষণ করে তাদের দুটি শহর ধ্বংস করে দিয়েছে। বোমার আঘাতে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। তারাই বিশ্বের প্রথম পরাশক্তি যারা, এই অস্ত্র ব্যবহার করেছে। নিজেরা অন্যের বিরুদ্ধে এই মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়াকে অভিযোগ করছে কোন অধিকার ও নৈতিকতায়?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার হয়েছিল, এখন তার চেয়ে বহুগুণ ক্ষতিকর পরমাণু বোমা তৈরি হয়ে আছে। হিরোশিমা-নাগাসাকির ভয়াবহ পরিণতির কথা সবার জানা। এই অস্ত্র এখন আগের চেয়ে আরও নিখুঁত আক্রমণে সক্ষম। এর ভয়াবহতাও আগের চেয়ে বহুগুণ। পারমাণবিক বোমার চেয়ে আরও মারাত্মক হচ্ছে হাইড্রোজেন বোমা, যা পরমাণু বোমার চেয়ে হাজার গুণ শক্তিশালী। 
রাশিয়ার কাছে বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোকে হার মানতে হবে– সেটা হজম করা কঠিন। কিন্তু নানা মাধ্যমে প্রকাশিত দলিল ও তথ্য থেকে পরিষ্কার– ইউক্রেনের এই যুদ্ধ মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তির স্পন্সর ও প্রযোজনাতেই সংঘটিত হচ্ছে। তারা রাশিয়াকে একঘরে করার চেষ্টা করেও পারেনি। বরং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। পুতিন নিজ দেশেও তাঁর ক্ষমতাকে অধিক সংহত করেছেন। এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেন যুদ্ধের পরিণতি ও ফলাফলই বলে দেয় ভবিষ্যৎ বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ ও ক্ষমতার প্রভাব বলয়। 

ড. মঞ্জুরে খোদা: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×