ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রসবপূর্ব লিঙ্গ শনাক্তকরণ

অন্যদৃষ্টি

প্রসবপূর্ব লিঙ্গ শনাক্তকরণ
×

ছবি-সংগৃহীত

রাইসুল সৌরভ

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৪ | ২৩:৪০ | আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৪ | ০৭:২৭

সম্প্রতি হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ মাতৃগর্ভে লিঙ্গ শনাক্তকরণ প্রতিরোধ এবং অনাগত শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীর সুরক্ষায় বাংলাদেশে প্রসবপূর্ব লিঙ্গ শনাক্তকরণের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছেন। এ বছরের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ঠিক আগে আসা রায়টি ইতোমধ্যে চিকিৎসকসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। যদিও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাসহ দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম প্রচার করেছে, হাইকোর্ট মাতৃগর্ভে ভ্রূণের লিঙ্গ শনাক্তকরণ নিষিদ্ধ করেছে; খুব স্বল্প সংখ্যক গণমাধ্যম বলছে, হাইকোর্ট ভ্রূণের লিঙ্গ শনাক্তকরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেননি বরং ‘নিরুৎসাহিত’ করেছেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রণীত এ সংক্রান্ত নির্দেশাবলি মেনে চলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। এই গাইডলাইন চিকিৎসা ছাড়া বা সামাজিক কারণে ভ্রূণের লিঙ্গ শনাক্তকরণ পরীক্ষা ও প্রকাশ নিরুৎসাহিত করেছে, তবে মাতৃগর্ভে থাকা ভ্রূণের চিকিৎসার নিমিত্তে লিঙ্গ শনাক্ত এবং প্রকাশ করা যাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইনজীবীর বক্তব্য থেকে ধরে নেওয়া যায়, আদালত ভ্রুণের লিঙ্গ শনাক্তকরণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেননি; চিকিৎসা ব্যতীত অথবা সামাজিক উদ্দেশ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন। 

তবে এখনও অজানা, অধিদপ্তরের নির্দেশিকা না মানার পরিণতি কী? কেননা, বিশুদ্ধ আইন শাস্ত্রানুসারে, কোনো গাইডলাইন কিন্তু আইন নয়। আর এই রায়ের আগে বাংলাদেশে গর্ভের সন্তান ছেলে হবে, নাকি মেয়ে– তা জানা বেআইনি ছিল না।

দাবি করা হয়, আমাদের সমাজে জন্মের আগে অনাগত সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশে বহুমাত্রিক ঝুঁকি বিদ্যমান– ভ্রূণ হত্যা, গর্ভাবস্থার সমাপ্তি, জোরপূর্বক লিঙ্গ নির্বাচনী গর্ভপাত, অন্তঃসত্ত্বার স্বাস্থ্য ঝুঁকি, তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা, স্বামী কর্তৃক অন্তঃসত্ত্বাকে পরিত্যাগ, বিয়ে বিচ্ছেদ, নারীর প্রতি বৈষম্য, নারীকে অসহায় করে তোলা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হত্যা। সাধারণত মনে করা হয়, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান প্রভৃতি এশিয়ার দেশ বিভিন্ন অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় কারণে মেয়ের চেয়ে ছেলে সন্তান বেশি প্রত্যাশা করে। ফলস্বরূপ আমাদের দেশে গর্ভপাত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও জন্মের আগে প্রযুক্তির মাধ্যমে লিঙ্গ প্রকাশ পেলে প্রসবপূর্ব গর্ভাবসানের সমূহ আশঙ্কা রয়েছে বলে অনুমান করা হয়। তদুপরি যুক্তি রয়েছে, যদি অন্তঃসত্ত্বা তাঁর পরিবার এবং সমাজ দ্বারা ছেলে সন্তানের জন্য গর্ভকালে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে অনাগত সন্তানের বিকাশ এবং সুস্থতা ভীষণ বাধাগ্রস্ত হবে। এটি স্পষ্টতই দেশের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক মানবাধিকার যেমন জীবন ধারণের অধিকার, স্বাস্থ্য ও মর্যাদার অধিকার প্রভৃতি লঙ্ঘন করে।

এখন প্রশ্ন হলো, চিকিৎসাজনিত প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনো কারণে গর্ভে থাকা ভ্রুণের লিঙ্গ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা বা ‘নিরুৎসাহ’ কি দেশে বিরাজমান লিঙ্গ বৈষম্য এবং ভারসাম্যহীনতা, নারীমুক্তি, লিঙ্গ অসমতা ও বৈষম্য, নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন, জীবন ধারণের অধিকার, স্বাস্থ্য ও মর্যাদার অধিকারসহ উপরোক্ত সব উদ্বেগের টেকসই সমাধান করতে পারবে? প্রসবপূর্ব লিঙ্গ শনাক্তকরণ বিষয়ে আমাদের প্রজ্ঞা আইনি পদক্ষেপের বাইরে প্রসারিত করা উচিত। নানাবিধ উপায়ে প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ও বাধা উতরে উঠতে অপরাপর সফল উদ্যোগের দিকে তাকানো দরকার, যাতে সমাজে সহনশীলতা, সমন্বিত বোঝাপড়া, সমতা এবং ক্ষমতায়নকে উৎসাহিত করা যায়। এর মাধ্যমে সবার জন্য আরও ন্যায়সংগত এবং সহানুভূতিশীল সমাজ গড়ে তোলা সহজ হতে পারে।

রাইসুল সৌরভ: আয়ারল্যান্ডের গলওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পিএইচডিরত
MdRaisul.Sourav@universityofgalway.ie
 

আরও পড়ুন

×