ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক

চীন-মার্কিন বিরোধের তাইওয়ান পারদ

চীন-মার্কিন বিরোধের তাইওয়ান পারদ
×

মঞ্জুরে খোদা

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৩ | ০৪:৪১

চীনের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও গত সপ্তাহে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার কেভিন ম্যাকার্থির সঙ্গে বৈঠক করেছেন তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েন। ১৯৭৯ সালের পর প্রথম কোনো শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তার তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক হলো। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টকে ‘আমেরিকার অন্যতম বন্ধু’ বলে আখ্যা দিয়ে ম্যাকার্থি বলেন, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করবে। তাইওয়ানকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তাও দেওয়া হবে।

 তাইওয়ান বিশ্ব রাজনীতির দীর্ঘদিনের আলোচনার বিষয়। সে আলোচনার গুরুত্ব নতুন করে বাড়ার কারণ বিশ্ব রাজনীতির নানা নতুন সমীকরণ। বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামরিক শক্তিতে চীন যত শক্তিশালী হচ্ছে তাইওয়ানকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে তত সামনে আনা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের সন্ধিক্ষণে চীন-রাশিয়ার বন্ধুত্ব ইস্যুটি আরও উস্কে দিয়েছে।

চীনের দাবি, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত তাইওয়ান তাদের ভূখণ্ডের অংশ। ‘এক চীন’ নীতির অধীনে একদিন এই অঞ্চল একীভূত হবে। এই নীতির অধীনে কোনো দেশ একসঙ্গে বেইজিং ও তাইপের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে না।

গত বছরও মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের তৎকালীন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি চীনের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও তাইওয়ান সফর করেছিলেন। শুধু তাই নয়, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাইওয়ান দ্বীপে সেনা মোতায়েন করেছে এবং তাদের কাছে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে। আমেরিকা কেন চীনের আপত্তি সত্ত্বেও তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে?

তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষাকারী দেশের সংখ্যা কমতে কমতে ১৩টিতে এসে পৌঁছেছিল। এদের মধ্যে প্রধান দেশ হন্ডুরাস অতি সম্প্রতি তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। তার মানে এখন ক্ষুদ্র ১২টি দেশ ও অঞ্চল তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজার রেখেছে।

সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক ডাটা অনুসারে, যে দেশগুলো এখনও চীনের বদলে তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে, সেগুলো হচ্ছে– গুয়েতেমালা, হাইতি, প্যারাগুয়ে, এস্বাতিনি, বেলিজ, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট এবং গ্রেনাডাইনস, মার্শেল দ্বীপপুঞ্জ, সাভাল দ্বীপপুঞ্জ, পালাউ এবং মারভাল নাউরু (জাতিসংঘের সদস্য নয়) ভ্যাটিকান সিটি। তারা বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ০.৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্বে ৯৯.৫১ শতাংশ মানুষ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে তাইওয়ান হচ্ছে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একটি প্রদেশ।

যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান নিয়ে এত সোচ্চার ও সক্রিয়, তারাও কাগজে-কলমে তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে স্বীকার করে। ১৯৭৯ সালে চীনের সঙ্গে আমেরিকার যে চুক্তি স্বাক্ষর হয় সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয় যে, তাইওয়ান প্রণালির উভয় দিক চীনের অংশ তারা স্বীকার করে। এই আইনি প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও আমেরিকা ক্রমশ তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্নতাবাদে সমর্থন ও উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষুব্ধ হওয়ার আরও একটি বড় কারণ তাদের প্রভাব বলয়ে থাকা মধ্য আমেরিকার দেশগুলোও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এই দেশগুলো মার্কিন বলয় থেকে বের হয়ে এসে তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর করছে।

যেমন ২০২১ সালে নিকারাগুয়া চীনকে স্বীকৃতি দিয়ে তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এরপর থেকে মানাগুয়া ও বেইজিং ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে মুক্তবাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলে। চীন নিকারাগুয়ার পাবলিক হাউজিং প্রোগ্রাম প্রসারিত করতে সাহায্য করছে, দরিদ্র ও কর্মজীবী পরিবারের জন্য হাজার হাজার বাড়ি তৈরি করছে, অবকাঠামো, হাসপাতাল এবং নবায়নযোগ্য শক্তির উন্নয়নে কাজ করেছে।

এমনকি নিকারাগুয়ায় একটি আন্তঃমহাসাগরীয় খাল খননের পরিকল্পনা করেছে চীন, যা পানামা খালের একচেটিয়া অধিকার চ্যালেঞ্জ করবে এবং মধ্য আমেরিকার দেশটির জন্য বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করবে।

সম্প্রতি চীন ও হন্ডুরাস সরকারের মধ্যেও ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প নিয়ে আলোচনা ও কাজ চলছে। হন্ডুরাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, আইএমএফসহ মার্কিন নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের কাছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ঋণের জালে আটকা পড়েছে তাঁর দেশ এবং চীনই কেবল সম্ভাব্য এই বোঝা কমাতে পারে। হন্ডুরাস বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। এক কোটি জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ৭৪ ভাগ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে।

২০০৯ সালে মার্কিন সরকারের ইন্ধনে হন্ডুরাসে এক সামরিক অভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বামপন্থি প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল জেলায়া উৎখাত এবং নিষ্ঠুর ডানপন্থি শাসন প্রতিষ্ঠা হয়। দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের মাধ্যমে সেখানে মাদক ব্যবস্যা, লুটপাট ও সন্ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করা হয়। সীমাহীন দারিদ্র্য এবং বিশ্বে সর্বাধিক অপরাধপ্রবণ দেশে পরিণত হয়।

২০২১ সালেও হন্ডুরাস ও নিকারাগুয়ার নির্বাচনেও মার্কিন প্রশাসন হস্তক্ষেপ করেছিল কিন্তু সে দেশের জনগণ সেগুলোকে রুখে দিয়েছে। সে সময় সামাজিক মাধ্যমে তাদের সেই তৎপরতার ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা ১২টি দেশের মধ্যে গুয়েতেমালার দৃশ্যপটও যে কোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। রাজনৈতিক চাপে তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

চীন শুধু অর্থনৈতিকভাবেই এগিয়েছে তাই নয়, সামরিক এবং তথ্যপ্রযুক্তির দিক থেকেও অভাবনীয় উন্নতি করেছে। বিশ্ব রাজনীতিতেও তাদের প্রভাব প্রবল হয়ে উঠছে। চীনও তার অখণ্ডতার নীতি থেকে সরে আসবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিও চায় না বিশ্বে অন্য কোনো শক্তি তাদের অতিক্রম করুক, তাদের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করুক। চীন-মার্কিনের দ্বন্দ্ব-বিরোধ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তাইওয়ান হবে সেই সম্পর্কের পারদ।

ড. মঞ্জুরে খোদ: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×