ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাক্ষাৎকার: রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

উন্নয়নের মডেল মিরাকল থেকে মরীচিকায় পরিণত হয়েছে

উন্নয়নের মডেল মিরাকল থেকে মরীচিকায় পরিণত হয়েছে
×

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: ফারুক ওয়াসিফ

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৩ | ১৮:০০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক শেষে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নয়ন ও আর্থিক অর্থনীতিতে এমএসসি এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বাণিজ্যনীতি ও ব্যবসায়িক কূটনীতিতে কার্লটন ও অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদপ্রাপ্ত। শিক্ষকতা করেছেন রয়্যাল হলওয়ে, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই– যুদ্ধোত্তর থেকে করোনাকাল (২০২২), ফিসকাল অ্যান্ড মানিটারি পলিসি’জ ইন ডেভেলপিং কান্ট্রিজ (২০২১), নাম্বারস অ্যান্ড ন্যারেটিভস ইন বাংলাদেশ’স ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট (২০২২), স্টেইট বিল্ডিং অ্যান্ড সোশ্যাল পলিসি’জ ইন ডেভেলপিং কান্ট্রিজ (২০২২), হোয়াই ইকোনমিক প্রডাক্টিভিটি ফেইলস (২০২৩) ইত্যাদি।

ফারুক ওয়াসিফ: পরিকল্পনামন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, আমাদের অর্থনীতি চকচকে কিন্তু গভীরতা কম;  সামান্য বাতাসেই কেঁপে ওঠে। মূল্যস্ফীতিতে মানুষ ভুগছে; ডলার সংকট; বিদ্যুৎ ঘাটতি। এত আয়োজন সত্ত্বেও কীভাবে বাংলাদেশ এই অবস্থায় এসে পড়ল?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: গত ১২ বছরের মধ্যে গত মে মাসে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হয়েছে। মূল্যস্ফীতির যুক্তি ছিল দুটি: কভিডকাল ও ইউক্রেন যুদ্ধ। এই দুটি কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম স্বাভাবিক হয়ে এলে এখানেও স্বাভাবিক হবে। অনেক দিন ধরে তেলের দাম স্বাভাবিক হয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭০-৮০ ডলারে নেমে এসেছে, কিন্তু দাম কমেনি। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত যে আটটা পণ্যের দাম ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল, সেখানেও দাম কমেনি। এবারে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামও বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতি থেকে যেসব দেশের উত্তরণ ঘটেছে, যেমন ইউরোপে বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; সেখানে রাষ্ট্র বড় ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেই ভূমিকাটা রাখতে পারছে না। তার সেই সক্ষমতা নেই। কারণ এই রাষ্ট্রের যে কর কঠামা, অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ কর সংগ্রহের যে ক্ষমতা, তা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নিচে; আফগানিস্তানেরও পরে। একদম তলানিতে। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই তার দেনা পরিশোধ করতে পারছে না। যেমন পারছে না জ্বালানির ক্ষেত্রে। এখানে তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় অবস্থা, যেখানে রাষ্ট্র আরও ঋণ নিচ্ছে। ঋণ নিতে চেয়েছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে। কিন্তু দেখা গেল, ব্যাংকগুলো অক্ষম। তখন ঋণ নিতে গিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তখন টাকা ছাপাতে হচ্ছে। পত্রিকান্তরে জানা যাচ্ছে, যে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা নতুন করে ছাপানো হয়েছে; এখানে অর্থের গুণপ্রবাহ ৫ গুণ বলে, আসলে তা দাঁড়াচ্ছে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার মতো। এটা মূল্যস্ফীতি আরও উস্কে দিচ্ছে। তার মানে, রাষ্ট্রের সক্ষমতার অভাবের কারণেও আরেকবার মূল্যস্ফীতি ঘটছে। এর ফলে, জীবনযাত্রায় বড় রকমের হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হচ্ছে।

ফারুক ওয়াসিফ: তার মানে, সমাধান ভেবে যা করা হয়েছে, তা সংকট আরও বাড়াচ্ছে?

তিতুমীর: তার মানে, অর্থনীতির ওপর আরেকবার চাপ তৈরি হলো। আগের মূল্যস্ফীতির চাপ; ঋণের কারণে আরেক দফা মূল্যস্ফীতির চাপ। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপ। আরেকটা চাপ হলো বৈদেশিক ঋণ। গত সাড়ে সাত বছরে সবচেয়ে বেশি ঋণ করতে হয়েছে। ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত ৪২ বিলিয়ন ডলার নিয়েছি। এখন তা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ বিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে বড় চাপ হচ্ছে, বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য থাকছে না। ঋণ পরিশোধ ও সুদ টানতে গিয়ে বাংলাদেশ থেকে দিন দিন টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের কারণে বৈদেশিক রিজার্ভ যেখানে আছে, এটা আর কমানোর উপায় নেই। ঋণের মধ্যে বিরাট অংশই বেসরকারি ঋণ; প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। এগুলোতে আবার সভরেইন গ্যারান্টি দেওয়া আছে। শেষ বিচারে এগুলো রাষ্ট্রেরই দায়। সে কারণেই মাথাপিছু ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে কোনো দেশ যখন আইএমএফের অধীনে যায়, তখন ধরে নেওয়া হয়; সেখানে একটা অব্যবস্থাপনা ছিল। মুডি’স রেটিংয়ে ব্যাংকিংয়ের মানের অবনমন হলো, যা সাধারণত হয় না। আমার ঋণ দরকার। কিন্তু ঋণমান কমে যাওয়ায় ঋণ সংগ্রহের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ব্যক্তি খাতে সাতটা ব্যাংকের ঋণমান অবনমন করা হয়েছে। পাশের দেশের একটা ব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেনে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের একটা ব্যাংক বলেছে, ঋণমান অবনমনের কারণে বাংলাদেশে ঝুঁকির পরিমাণ অনেক বেশি। মুডি’স তিনটা কারণ বলেছে: একটা হচ্ছে হাইটেন্ড এক্সটার্নাল ভালনারেবিলিটি, দ্বিতীয়ত তারল্য সংকট। বিশেষ করে অনেক জ্বালানি কোম্পানির কাছে আমাদের মাত্রাছাড়া দেনার পরিমাণ। এবং ঋণ যেহেতু নেওয়া হয়েছে বেশি পরিমাণে, তার সুদ টানতে গিয়ে ডলার সংকট।

সমকাল: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা এখানে কী?

তিতুমীর: আমাদের বৈদেশিক লেনদেনের তিনটি অ্যাকাউন্ট। চলতি অ্যাকাউন্টের মধ্যে আছে আমদানি-রপ্তানি ও রেমিট্যান্স। আমদানি-রপ্তানিতে যে ঘাটতি থাকে তা পুষিয়ে নেওয়া হয় রেমিট্যান্স দিয়ে। আগের বছরে আমদানি-রপ্তানি বড় আকারে বাড়া থেকে অনেকে মনে করেন, বিরাট আকারে পুঁজি পাচার হয়েছে। তার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক পুশ করেছে। পুশ করার ফলে আমদানি কমে গেছে। তাতে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানি কমেছে। এভাবে কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ওপর থেকে চাপ কমানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমেছে। ওদিকে ঋণও তো বেড়ে যাচ্ছে। ২০১৪ সালে ঋণ-জিডিপির অনুপাত ছিল ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৩ সালে সেটা হয়েছে ৪২ শতাংশ। তার মানে, বিরাট একটা অংশের ঋণ জিডিপি অনুপাত বেড়ে গেছে। মাথাপিছু ঋণ আগে ২৫৭ দশমিক ৪৭ ডলার ছিল। এখন তা ৫৫৭ দশমিক ৫৯ ডলার। স্বল্পমেয়াদি ঋণ আগে ছিল ২৩ শতাংশ; সেটা এখন ৩০ শতাংশ। অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে ঋণ নেওয়া। এ কারণে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়েছে। একটা দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। প্রথমত, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর জন্য রাষ্ট্রের ভূমিকা অর্থাৎ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা দরকার ছিল। বিপরীতে সেটা কাটছাঁট করা হচ্ছে। কারণ তহবিলে অর্থ নেই। আবার অর্থ যেখানে ছিল সেখান থেকে ঋণ করতে হচ্ছে। তা আবার মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনীতির আকার ছোট করায় কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না। এই চারটি বিষয় নিয়ে দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। তার ফলে সমাজের ভাঙন শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ বলেছে, শহরাঞ্চলের দরিদ্রদের ৫১ শতাংশই নতুন করে গরিব হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র তার ভূমিকা পালন করতে পারছে না।

সমকাল: দেশ-বিদেশে যে উন্নয়নের মডেলটা প্রশংসিত হলো; মেগা প্রজেক্ট, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, সেতু-সড়ক হলো। সেটা কি কাজ করছে না?

তিতুমীর: আমাদের এই মডেলটা মিরাকল না হয়ে মরীচিকায় পরিণত হয়েছে। মডেলটার বড় সমস্যা হলো, বাইরের ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা এর নেই। সাম্প্রতিক কোনো আলোচনায় আমরা কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত উচ্ছ্বাস আর দেখছি না। সেসব আর বলার মতো জায়গায় নেই। কারণ এই তথাকথিত উন্নয়ন মডেলটা মৌলিক ভিতের ওপর দাঁড়ানো ছিল না। যেমন কর্মসংস্থানের বড় অংশ হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক খাতে। এটা তো উন্নয়ন নয়। মৌলিক ভিত মূলত ৩টা। প্রথমত আমাদের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে তা বিনিয়োগ থেকে হয়নি। হয়েছে ভোগ ব্যয় থেকে। জিডিপির সিংহভাগই আসছে ভোগ থেকে। মূল্যস্ফীতিতে সেটা আটকে যাচ্ছে। গত সাত বছরে জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগ স্থবির। মোট দেশজ উৎপাদনে বিনিয়োগের ভূমিকা কমেছে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান হতো। ওদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে কিন্তু মজুরি বাড়ছে না। বিনিয়োগ কমার কারণ আস্থার অভাব। বিরাট আকারে পুঁজি পাচার হচ্ছে। কেন হচ্ছে? এখান থেকে জোরজবরদস্তি করে আদিম সঞ্চয়নের মাধ্যমে টাকা বানিয়ে সেটা দেশে রাখা নিরাপদ মনে হচ্ছে না বলে বিদেশে পাঠাচ্ছেন। যিনি বিনিয়োগ করবেন, তাঁর আস্থা লাগবে। তাঁর উৎপাদন খরচ কমতে হবে। কিন্তু রড-সিমেন্ট-বালুর খরচ ৪০ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদন চালানোর ইউটিলিটি তথা গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ লাগবে। এসবের খরচ গত বছরের আগস্ট মাসে ৪২ শতাংশ থেকে ৫১ শতাংশ হয়েছে। আর কমেনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমাদের অবস্থা বড় সংকটপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমকাল: অথচ এই খাতেই সবচেয়ে বেশি অর্থ গেছে, ডলার গেছে, ভর্তুকি গেছে। দায়মুক্তি আইন করা হয়েছে।

তিতুমীর: এবারের বাজেটে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি রাখা হয়েছে। কিন্তু সেটা কোথায় যাবে, তা বলা হয়নি। এটা বিরাট আকারে যাবে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে। মূল জ্বালানির উৎস যে গ্যাস, সেখানে বিনিয়োগ করা হয়নি। আমাদের যে গ্যাস আছে, তা দিয়ে ভবিষ্যতে চালাতে পারব না। জ্বালানি নিরাপত্তা না থাকলে বিনিয়োগ আসবে না। বলা হচ্ছে, এই খাতে সক্ষমতা নিশ্চিত করতে ৫ বিলিয়ন ডলার দরকার। কিন্তু ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগ ও অর্থনীতি ঠিক রাখতে হলে ২০ বিলিয়ন ডলার লাগবে। সেই টাকা কই?

সমকাল: টেকসই উন্নয়নের জন্য কী ধরনের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত থাকা দরকার ছিল?

তিতুমীর: প্রথম হলো আস্থা; দ্বিতীয়ত উপকরণের সহজলভ্যতা এবং দামের সঙ্গে সাযুজ্য বিধান এবং তৃতীয়ত বিনিয়োগের জন্য নীতি-সহায়তা। এগুলোর কোনোটাই ঠিক জায়গায় নেই। আমরা এখনও এককেন্দ্রিক অর্থাৎ পোশাক খাতকেন্দ্রিক। উৎপাদনের বহুমুখীকরণ না হওয়ায় প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় টিকব কীভাবে? এর পর হলো উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। আমরা এসব জায়গায় মনোযোগ না দিয়ে যে কর রেয়াত দিই, এসআরওর মাধ্যমে যাদের তা দিই তা গোষ্ঠীতান্ত্রিক সহায়তা। যেমন ক্যাপাসিটি চার্জ ইত্যাদি। এটা আমার বিনিয়োগ বাড়াবে না। চতুর্থ কারণটা আরও মৌলিক। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে, পপুলেশন ডিভিডেন্ডের সুবিধা কাজে লাগাতে গেলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যে বিনিয়োগ করা দরকার ছিল, তা করিনি। এখন আমাদের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম। কিন্তু তাদের দক্ষ করতে পারছি না। তাই বাইরে থেকে ম্যানেজারিয়াল ক্লাসকে আমদানি করতে হচ্ছে। যদিও ইকোনমিক জোনের কথা বলা হচ্ছে; বিগ বি ইনিশিয়েটিভের কথা বলা হচ্ছে; সেগুলো আমরা বাস্তবতায় অনুবাদ করছি না। জাপান বিগ বি ইনিশিয়েটিভের কথা বললেও বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ আন্তর্জাতিক গড়ের চেয়েও নিচে।

সমকাল: আস্থার অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণ কি রাজনৈতিক?

তিতুমীর: আমাদের সংকটটা নিজস্ব কারণে সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঋণ খেলাপের পরিমাণ সংকটে নিপতিত শ্রীলঙ্কার পরেই আমরা। রাষ্ট্রীয় আয়ের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের কাছাকাছি। মূল বিষয়টা হলো, প্রতিষ্ঠান কাজ করছে না। প্রতিষ্ঠান তখনই কাজ করে যখন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে। খেয়াল করে দেখুন, আইএমএফের ঋণদানের শর্তগুলো কাঠামোগত তথা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। মানে কর বাড়াতে হবে; ব্যাংক ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। শ্রমিকের অধিকার দিতে হবে, যে জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা বন্ধ হচ্ছে। আমরা যখন আর স্বল্প আয়ের দেশ থাকব না, তখন প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দরকারি প্রস্তুতিও নিচ্ছি না।

সমকাল: এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির মূল চ্যালেঞ্জগুলো মোটাদাগে কী?

তিতুমীর: জীবনযাত্রার সংকট, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতাই হলো বড় তিন চ্যালেঞ্জ। এসবের কারণে উন্নয়নের মডেল মরীচিকায় পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন আর বাংলাদেশ মডেল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। আলোচনাটা যেদিকে মোড় নিচ্ছে, তা হলো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। যেমন বাংলাদেশে ব্যবসা করতে হলে ঋণপ্রবাহ লাগবে। তার জন্য ব্যাংককে ক্রমাগত ঋণ দিতে পারতে হবে। অথচ অনেক ব্যাংকে আমানতের সংকট। রাজনৈতিক বিবেচনায় এত বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে যে, তারা এখন অক্ষম। দায়বদ্ধতার সংস্কৃতির অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করতে পারছে না।

সমকাল: এবারের বাজেট অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কতটা সহায়ক?

তিতুমীর: আমাদের তিনটা মূল প্রশ্নই তো অনালোচিত আছে বাজেটে। প্রথমত হলো নতুন দারিদ্র্য তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি মোকাবিলার উদ্যোগ দরকার। দ্বিতীয়ত বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হবে না; কর্মসংস্থান না হলে টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণ সম্ভব হবে না। তৃতীয়ত, যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক ঋণপ্রবাহের থেকে সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা। এই তিনটা প্রশ্নের জবাব না পেলে তো সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। 

সমকাল: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো কেন মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না? কেন রাজস্ব আয় বাড়ে না? সমাধান কী হতে পারে?

তিতুমীর: এত টাকা আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছি সামাজিক নিরাপত্তা জালে। কভিডের সময় থেকে আমরা বলছি, আমরা কেন সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে গেলাম না। কেন এতদিনেও তালিকা করলাম না। আমরা তো এনআইডি মোটাদাগে করেছি। যারা করেছে তখন তাদেরই এই দায়িত্ব দিতে পারতাম। তালিকা করার খাত অর্থাৎ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বাজেট বেড়েছে। কিন্তু যাদের সাহায্য দরকার তাদের তালিকা হয়নি। আমরা টাকা দিচ্ছি কিন্তু সেটা ঠিক লোক পাচ্ছে না। আমরা জানি– কে কর ফাঁকি দিচ্ছে, কে কর পরিহার করছে অথবা কে কর এড়াচ্ছে। কিন্তু এখানে কোনো সংস্কার করা হয়নি। আমাদের ভূমিকর আর কতটুকু? আয়ের বিরাট অংশই আসে রাজস্ব বোর্ড থেকে। ভূমির ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পর্যায়ে ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা আছেন। কিন্তু করের বেলায় কি সেখানে কেউ আছেন? এটা করার জন্য কি যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়নি? বাস্তবানুগ এবং দেশোপযোগী সংস্কারের অনেক উপায় ছিল। যেমন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে এনআইডির সঙ্গে মিলিয়ে দিলে দুর্নীতি অনেক কম হতো। দ্বিতীয়ত আয় বাড়ানোর জন্য গ্রোথ সেন্টার পর্যন্ত আয়কর নিয়ে যেতে হতো। তাতে করের জাল বাড়ত। বিরাট একটা অংশ কর ফাঁকি দিচ্ছে, সেখানেও কোনো রিফর্ম করিনি। আমরা তো প্রতিবছর একই কথা বলছি; প্রতি বছর বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি বলে আহাজারি করছি। সরকার সহজ উপায়ে যাচ্ছে– টিন থাকলেই ২০০০ টাকা কিংবা ভ্যাট বসানো। যে কোনো দেশে টেকসই কর ব্যবস্থাপনার নির্দেশক একটাই। সেটা হলো সেই দেশে আয়কর থেকে বেশি রাজস্ব আদায় হয় কিনা। সেটা কোথায়? এখানে বিরাট রকম উদ্ভাবনার দরকার নেই। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে এক জায়গায় আনা। করের বেলায় গ্রোথ সেন্টার বা ইউনিয়ন পর্যন্ত যাওয়া। সমস্যাকে রাজনীতি-বিমুক্ত পরিবেশে মোকাবিলা করা। আমরা বলছি, পুঁজি পাচার হয়েছে। কিন্তু কোথায় তদন্ত? আমরা ধনীদের ওপর কর না দিয়ে সাধারণ মানুষ, যে নাকি মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন-মধ্যবিত্তে যাচ্ছে, যে নিম্ন থেকে দরিদ্র হচ্ছে, আমরা সেসব অসংগঠিত মানুষকে আরও চিপে ধরছি। এই উন্নয়ন মডেল টেকসই না। উন্নয়ন যদি বিনিয়োগ দিয়ে হতো, যদি আয়কর দিয়ে হতো, যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সর্বজনীন হতো এবং সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যবস্থা হতো, তাহলে উন্নয়ন শক্ত ভিত পেত।

সমকাল: অর্থনীতিবিদরা কেন এই পরিস্থিতির হুঁশিয়ার করেননি?

তিতুমীর: কেউ কেউ করেছেন। অনেকেই চুপ ছিলেন। আসলে আমরা একটা ভুল ন্যারেটিভে বিশ্বাস রেখেছিলাম। সত্যকে অস্বীকার করে চলেছিলাম। নিজেদের দায়বদ্ধতার মধ্যে রাখিনি। এই তিনটা সমস্যাই রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সমস্যা। তবে আমি কোনোভাবেই স্বীকার করব না যে, এসবের সমাধান করা যাবে না। তবে দুঃখজনক হলো, এই সমস্যাগুলো এড়ানো যেত; জনগণকে ভুক্তভোগী না করলেও চলত।

সমকাল: আপনাকে ধন্যবাদ।

তিতুমীর: সমকাল এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন

×