অর্থনীতি
টাকা ও ডলারের খোঁজে দিশেহারা
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
বাংলাদেশে অর্থনীতির চলমান প্রধান সমস্যা অতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি। দ্বিতীয় প্রধান সমস্যা ডলারের সংকট। জ্বালানি আমদানির বকেয়াসহ সব ধরনের আমদানির নতুন-পুরোনো ব্যয় ও বকেয়া, বিদেশি ঋণের সুদ প্রদানের জন্য ডলারের জোগান জরুরি। অর্থনীতির তৃতীয় সংকট টাকার সংকট, এবং চরম বাজেট ঘাটতি। রয়েছে আমদানি নিয়ন্ত্রণে স্ব-আরোপিত অর্থনৈতিক সংকোচন। বিদ্যুতের জ্বালানির সংকট এবং কাঁচামালস্বল্পতায় বিপর্যস্ত শিল্প উৎপাদন। আছে বিশাল মন্ত্রিসভার খরচসহ মাথাভারী প্রশাসনের উচ্চ পরিচালনা ব্যয়, বাজেটের অতি স্ফীত অনুন্নয়ন ব্যয় এবং টাকা ছাপানোর সংকট। আরও বড় সমস্যা মানুষের ভেঙে পড়া সঞ্চয়; ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং বর্ধিত বেকারত্ব।
ডলার সংকট মোকাবিলায় সরকার এলসি খোলায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেও সংকট থামেনি, বরং অর্থনীতিতে মন্দা শুরু হয়েছে। নতুন সমস্যা বিদেশি ঋণের সুদ, বকেয়া দায়-দেনা মিলে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স ডেফিসিট দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। নতুন করে আমদানি নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি অর্থনীতিতে ভীতি সঞ্চার করেছে। ডলার সংকটে দেশের বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি ও পরিষেবা খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের বোধগম্য ও কার্যকর কোনো নীতিকৌশল নেই। বিগত এক বছরে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছিল ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ। ১৪ বছরে পাইকারি পর্যায়ে ১১ বার ও ভোক্তা পর্যায়ে ১৩ বার বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। সরকারের হিসাবে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে, এক বছরে বাংলাদেশের খাদ্যমূল্য বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। সরকারি সংস্থার ‘দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা-সংক্রান্ত টাস্কফোর্স’ প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে, বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমছে না।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ইউক্রেন যুদ্ধপূর্ব স্তরে ফিরে এসেছে। অথচ সরকারের তরফে সার, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম কমিয়ে মূল্য পরিস্থিতি সহনীয় করার কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারি হিসাবেই যেখানে তিন থেকে চার কোটি মানুষ দরিদ্র, সেখানে সরকার জনকল্যাণকর ভর্তুকি বন্ধের পক্ষে সাফাই গাচ্ছে। দরকারি ভর্তুকি বন্ধ করে একদিকে সরকার ডিজেলের মতো কৌশলগত অর্থনৈতিক পণ্যে উচ্চ শুল্ক এবং লভ্যাংশ ওঠাচ্ছে, অন্যদিকে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পর্যালোচনা না করে বেদরকারি ভর্তুকি চালাচ্ছে। অসহনীয় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের বাজেট ঘাটতি এবং শুল্কনীতি একেবারেই বেমানান। আর্থিক খাতের সংস্কার ও ব্যাংকিং সুশাসনের জন্য আইএমএফের সুস্পষ্ট শর্তগুলোতে শুধু মৌখিক কিছু আশ্বাস দিয়ে, বাদবাকি রাজস্ব আয় ও শুল্ক ছাড়ের শর্তগুলো বাস্তবায়নে ব্যাপক তৎপরতা দেখিয়ে সরকার নিজেই মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের মতো দ্বিচারিতা একদিকে শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়াবে, অন্যদিকে বাড়াবে নিত্যপণ্যের দামও।
সরকারি কৌশলের সবচেয়ে আত্মঘাতী নীতি হচ্ছে, প্রশাসন পরিচালনা ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়ানো এবং টাকা ছাপিয়ে এই অতি সম্প্রসারণশীল ঘাটতি বাজেটের বরাদ্দ ও দায় মেটানোর মূল্যস্ফীতিবান্ধব পদক্ষেপ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে ৯২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এটি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তবে আগের ঋণের সুদসহ গ্রস হিসাব করলে সংখ্যা অনেক বড়। সর্বোচ্চ ব্যয় হবে সুদ পরিশোধে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার কোটি টাকার বেশি। ঋণের প্রায় পুরো অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ছাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারের যেসব বন্ড বাণিজ্যিক ব্যাংকের কেনার কথা, সেগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দিয়ে কিনিয়ে তথাকথিত ডিভল্ভ্মেন্টের নামে টাকা ছাপিয়ে সরকার নিজেই দেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বড় সংকট তৈরি করেছে।
বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিধিবহির্ভূত মোটা অঙ্কের ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে জেনেও নতুন বাজেটে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঘাটতি রেখেছে। যেখানে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রাজস্ব আয় এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৩৪ হাজার (২০২১-২২ অর্থবছর), সেখানে নতুন বছরে রাজস্ব লক্ষ্য ধরা হয়েছে চার লাখ ৩০ হাজার, এনবিআর-বহির্ভূত আয়সহ পাঁচ লাখ কোটি টাকা। অথচ চার অর্থবছর আগের (২০১৯-২০) ৩ লাখ ৭৭ হাজার কোটির রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাটি আজও অর্জিত হয়নি। বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা দেখানো, কিন্তু বাস্তবে ঘাটতি হবে পৌনে চার লাখ কোটির আশপাশে। এভাবে বছরের পর বছর আয়-ব্যয় ও ঘাটতির এমন অবাস্তব হিসাবঅলা বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বলার সুযোগ নেই। বরং এসব অসত্যের বেসাতি মাত্র।
ব্যয় বাড়িয়ে অনুৎপাদনশীল আমলাতন্ত্র তোষণের দ্বিচারিতার জবাব কী? রাজস্ব সক্ষমতা বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার তার পরিচালনা ব্যয়-সংক্রান্ত বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। অথচ গুরুতর এই সংকটের উপলব্ধি দেখা যাচ্ছে না।
এ বছরের জুন থেকে আগামী বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে ডলারের সম্ভাব্য চাহিদা প্রাক্কলনে দেখা যায়, আট মাসে মোট পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি লাগবে! বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি বসে রয়েছে। যেটুকু চলছে তার বিলও নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। রেন্টাল, আইপিপির (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) ও সরকারি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল বকেয়া মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত বকেয়া পড়েছে ৩৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। দৃশ্যত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানির ব্যয়ে বিপর্যস্ত সরকার। আইএমএফের খেলাপি ঋণ কমানোর শর্ত পালনেও ফাঁকি চলছে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের আকার ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। ঋণ ও সুদের মাত্রাছাড়া মওকুফের পরও সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। তারপরও পুনঃতপশিল, রাইট-অফসহ ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়া চলছেই। ফ্ল্যাট ও জমিতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ আবারও দেওয়া হচ্ছে। ২০২২ সালে ৮ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করেছে ৯টি ব্যাংক।
সরকারি নীতিকৌশলের পরতে পরতে এমন গোঁজামিল নিয়ে কি সমাধানের পথে যাওয়া সম্ভব?
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব : টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক
faiz.taiyeb@gmail.com