ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাউল ক্রয়

কৃষক ও ভোক্তাবৈরী পদক্ষেপ

কৃষক ও ভোক্তাবৈরী পদক্ষেপ
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৪৮

সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাউল মজুত থাকিবার পরও নূতন করিয়া চাউল ক্রয়ের সরকারি সিদ্ধান্তটি বিস্ময়কর বটে। শনিবার সমকালের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি গুদামে মোট খাদ্যশস্যের মজুত ছিল প্রায় সাড়ে ২৩ লক্ষ টন; যদিও কার্যকর সংরক্ষণ ক্ষমতা উহার কম। তদুপরি চাউলকল মালিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরও প্রায় দুই লক্ষ টন চাউল ক্রয়ের আয়োজন চূড়ান্ত।

এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবে একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়াছে। প্রথমত, গত বোরো মৌসুমে চাউলকল মালিকরা ছোট ও মাঝারি কৃষকের নিকট হইতে স্বল্প মূল্যে ধান ক্রয় করিয়া অধিক মূল্যে সরকারি গুদামে চাউলরূপে বিক্রয় করিয়াছে। ফলে শেষোক্তরা ক্ষতিগ্রস্ত হইলেও প্রথমোক্তরা লাভবান। উপরন্তু চাউলকলগুলি পরিমাণে এত অধিক ধান ক্রয় করিয়াছেন; প্রাপ্ত চাউল বাজারের পাশাপাশি সরকারি গুদামে সরবরাহের পরও উদ্বৃত্ত রহিয়াছে।

সরকার ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাউল ক্রয় না করিলে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পাইত এবং ভোক্তা পর্যায়ে প্রধান খাদ্যপণ্যের মূল্য অপেক্ষাকৃত সহনীয় হইত। অতিরিক্ত চাউল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থ চাউলকল মালিকের পকেটে যাইতেছে, অন্যদিকে কৃষকের পর ভোক্তাও ক্ষতির মুখে পড়িতেছে। দ্বিতীয়ত, সরকার যখন বোরো ধানের চাউল ক্রয় করিতেছে, ততক্ষণে আউশ ধান কৃষকের ঘরে উঠিয়াছে, যাহার মূল্য প্রতিযোগিতাহীন বোরোর ন্যায় নিম্নগামী। চাউলকল মালিকরা স্বল্প মূল্যে আউশ ধান ক্রয় করিতেছেন। অদূর ভবিষ্যতে আমন ধান উঠিবে। হলফ করিয়া বলা যায়, তখনও চাউলকল মালিকরা মুনাফা লুটিবেন।

প্রসঙ্গত, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এই বৎসর আউশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪০ লক্ষ টন। উপরন্তু নওগাঁর মহাদেবপুরে এখন আউশ ধান প্রতি মণ ৬৫০ হইতে ৭৫০ টাকা দরে বিক্রয় হইতেছে, গত বৎসর একই সময়ে যাহা ছিল এক সহস্র হইতে ১২ শত টাকা। অন্যদিকে, সরকারের ধান-চাউল সংগ্রহের নীতিটি এমন যে, উহা কৃষক অপেক্ষা চাউলকল মালিককেই অধিক সুবিধা দেয়। আর্দ্রতাসহ নানা অজুহাত তুলিয়া সরকারি গুদামে কৃষকের ধান লওয়া হয় না। নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব ইত্যাদি শর্ত পূরণও সাধারণ কৃষকের পক্ষে সম্ভবপর নহে।

ফলস্বরূপ কৃষক স্বল্প মূল্যে চাউলকল মালিকদের নিকট ধান বিক্রয় করিতে বাধ্য হন। ধানের তুলনায় চাউল অনেক বেশি ক্রয়ের কারণেও কৃষক উক্ত কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হইতে পারেন না। ফলে সম্পূর্ণ ফায়দা লুটিয়া থাকেন মধ্যস্বত্বভোগীরূপে চাউলকল মালিকরা।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানাইয়াছে, অতিরিক্ত চাউল বিক্রয়ের জন্য ইতোমধ্যে প্রায় ৮৫০ চাউলকল মালিক আবেদন করিয়াছেন, তন্মধ্যে দেড় শতাধিক আবেদনে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আধাসরকারি পত্র যুক্ত করা হইয়াছে। ইহাও প্রমাণ করে, সরকারের ধান-চাউল সংগ্রহের নীতিমালার ঘোষিত লক্ষ্য উৎপাদকদের সহায়তা করা হইলেও বাস্তবে তাহা প্রণীত হইয়াছে চাউলকল মালিকদের স্বার্থে। 

মজুত সক্ষমতার অতিরিক্ত চাউল সংগ্রহের যুক্তি হিসাবে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী বলিয়াছেন, স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করিবার ফলে চাউল আমদানি কম করিতে হয়, যাহাতে বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় হয়। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থাটি যে সম্পূর্ণ উৎপাদক ও ভোক্তাবিরোধী হইয়া যায়, তাহাও হিসাবে রাখিতে হইবে। অতএব অপযুক্তির ভিত্তিতে অতিরিক্ত চাউল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত বাতিল করিয়া তৈলাক্ত মস্তকে তৈল সিঞ্চনের নীতিমালাকে অবিলম্বে কৃষকবান্ধব করিবার দিকে মনোযোগ দিতে হইবে।

আরও পড়ুন

×