অপ্রতিম হত্যা
আইফোন কি জীবনের চেয়ে বড়?
অপ্রতিমের মৃত্যু যেন আরেকটি সংবাদ হয়ে হারিয়ে না যায়
হুমায়ুন আহমেদ বিলাস
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:১৯
শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১৩ বছরের অপ্রতিম। পরিবারের কেউ হয়তো ভাবেনি, এই বের হওয়াটাই তার জীবনের শেষ বের হওয়া হবে। পরদিন তার মরদেহ পাওয়া গেল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের সানন্দা এলাকায়।
অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে ছিল তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। নিখোঁজ হওয়ার পর তার বাবা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পুলিশ রাতভর আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে। পরে তার মরদেহ উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় ১৮ বছর বয়সী এক তরুণকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে।
পুলিশ এখনও হত্যার কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক ধারণায় মায়ের আইফোনটি হত্যার সম্ভাব্য মোটিভ হতে পারে বলে আলোচনা এসেছে। একটি ফোনের জন্য কি একটি শিশুর জীবন চলে যেতে পারে?
অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের নাড়া দিয়েছে তার বয়সের কারণে। কিন্তু এই ঘটনা শুধু একজন শিশুর মৃত্যুর গল্প নয়। এটি আমাদের সামনে শিশু নিখোঁজ হওয়ার আরেকটি বড় বাস্তবতাও তুলে ধরেছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করে পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে দুই হাজার ৩৮ জন এখনও নিখোঁজ। অর্থাৎ প্রায় ১৩ শতাংশ শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
১৫ হাজার ৭১৭ সংখ্যাটি দেখলে হয়তো এর মানবিক দিকটি পুরোপুরি বোঝা যায় না। একে ১৫ হাজারের বেশি পরিবার হিসেবে ভাবুন। কতজন মা-বাবা সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন, কতজন রাত জেগেছেন, কতজন থানায় ছুটেছেন, কতজন পরিচিতদের ফোন করেছেন। যে দুই হাজার ৩৮টি পরিবার এখনও সন্তানের অপেক্ষায়, তাদের প্রতিটি দিনের উদ্বেগের কোনো পরিসংখ্যান হয় না।
অবশ্য প্রতিটি নিখোঁজের পেছনে অপরাধ থাকে না। শিশুদের বয়স, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং নিখোঁজ হওয়ার কারণও ভিন্ন। কেউ পথ হারায়, কেউ পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি থেকে বের হয়, কেউ বন্ধু বা অন্য কারও প্রভাবে বাড়ি ছাড়ে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপহরণ বা অন্য অপরাধের ঘটনাও থাকতে পারে।
তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুকে অপরাধের শিকার ধরে নেওয়ার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি কোনো ঘটনাকে হালকাভাবে নেওয়াও ঠিক হবে না।
শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার অনেক সময় মনে করে, সন্তান হয়তো একটু পরেই ফিরে আসবে। সেই অপেক্ষায় কিছু সময় চলে যায়। কিন্তু এই সময়টিই অনেক ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশকে দ্রুত আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, শিশুটির মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান শনাক্ত, সম্ভাব্য যাতায়াতের পথ যাচাই এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ করা ব্যক্তিদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজন হলে একাধিক থানা ও জেলার পুলিশের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।
অপ্রতিমের ঘটনায় পুলিশ রাতভর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করেছে। এ ঘটনা দেখিয়ে দেয়, প্রযুক্তি এখন শুধু অপরাধ তদন্তের হাতিয়ার নয়, নিখোঁজ শিশু উদ্ধারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম।
একই সঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে শিশুদের দৈনন্দিন নিরাপত্তা নিয়েও। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কখন ফিরবে– এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা দরকার। মোবাইল ফোন ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বয়স অনুযায়ী সতর্কতা প্রয়োজন।
তবে শিশুর নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। শিশু বাড়ির বাইরে যাওয়ার পর তার নিরাপত্তা সমাজ ও রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। স্কুল, খেলার মাঠ, বাজার, গণপরিবহন, বিনোদন কেন্দ্র এবং জনসমাগমের জায়গাগুলোকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করতে হবে।
নিখোঁজ শিশুর ছবি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে আমরা অনেক সময় মনে করি দায়িত্ব শেষ। কিন্তু এখানেই শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটির পরিবার কিন্তু অপেক্ষা করা বন্ধ করে না।
তাই দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ শিশুদের তথ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা দরকার। কোন এলাকায় বেশি শিশু নিখোঁজ হচ্ছে, কোন বয়সের শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে, কতজনকে দ্রুত উদ্ধার করা যাচ্ছে, কতজন দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকছে– এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে সমস্যার ধরন বোঝা সহজ হবে।
অপরাধ ঘটার পর দ্রুত বিচার অবশ্যই প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু হত্যা ও ধর্ষণের কয়েকটি মামলায় দ্রুত বিচারও হয়েছে। যেমন– পল্লবীর শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ২০২৬ সালের ৭ জুন দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ৩১ আগস্ট হাইকোর্ট হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। এসব বিচার গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধটি যাতে ঘটতেই না পারে, সেই ব্যবস্থাও জরুরি।
অপ্রতিমের মৃত্যু তাই আমাদের সামনে নির্মম প্রশ্ন রেখে গেছে। তদন্তে যদি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয় যে একটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যই তাকে হত্যা করা হয়েছিল, তাহলে সেটি শুধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা হবে না। আমাদের সমাজে মানুষের জীবনের মূল্যবোধ নিয়েও প্রশ্ন তুলবে।
অপ্রতিমের পরিবার এখন যে শূন্যতার মধ্যে পড়েছে, কোনো বিচার সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু রাষ্ট্র যদি একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে শুরু থেকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে, প্রযুক্তিকে কাজে লাগায়, দ্রুত অনুসন্ধান করে এবং পরিবারকে কার্যকর সহায়তা দেয়, তাহলে হয়তো অন্য কোনো পরিবারকে এমন শূন্যতার মুখোমুখি হতে হবে না।
আমাদের সন্তানরা স্কুলে যাবে, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাবে, বিকেলে খেলতে বের হবে। প্রতিবার তাদের বের হওয়ার সময় মা-বাবার মনে এই ভয় থাকা উচিত নয় যে সন্তানটি নিরাপদে ফিরে আসবে তো?
এই নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়। এটি সমাজের দায়িত্ব, রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
অপ্রতিমের মৃত্যু যেন আরেকটি সংবাদ হয়ে হারিয়ে না যায়। বরং এটি আমাদের মনে করিয়ে দিক, একটি শিশুকে নিরাপদে বাড়ি ফিরিয়ে আনা কোনো পরিবারের ব্যক্তিগত সৌভাগ্য নয়, এটি একটি নিরাপদ সমাজের স্বাভাবিক অধিকার।
হুমায়ুন আহমেদ বিলাস: যোগাযোগ পেশায় কর্মরত
- বিষয় :
- শিশু হত্যা