অন্যদৃষ্টি
কেঁচো খুঁড়তে সাপ
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
কেঁচোর গর্তে সাপ থাকতে পারে– দুটি জীব সম্পর্কে ধারণা রাখেন এমন কেউ বিশ্বাস করবেন না। তারপরও বাংলা ভাষার একটা বহুল ব্যবহৃত প্রবাদে আছে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসার কথা। কিন্তু প্রবাদের সেই কথাই আজ সত্য প্রমাণিত হলো– অন্তত ফরিদপুরের দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেলের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার পুনর্তদন্তের কারণে।
শুক্রবার সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, এ সহোদরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তারা দেশ থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত ২ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। গত বছরের মার্চে অভিযোগটির তদন্ত করে দুই ভাইসহ মোট ১০ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে সেই চার্জশিট আদালত গ্রহণ না করে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। এ দ্বিতীয় দফা তদন্তেই বেরিয়ে আসে কেঁচোর জায়গায় বহুসংখ্যক বিষধর সাপ।
প্রতিবেদন মতে, এতে আসামির সংখ্যা হয়েছে চার গুণ। কে নেই দ্বিতীয় দফার চার্জশিটে– ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের বড় সব নেতার সঙ্গে আছেন দলটির সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম বলে পরিচিত অনেক নেতা। একই সঙ্গে এদের অবৈধভাবে অর্জিত হাজার হাজার একর জমির তথ্যও বেরিয়ে এসেছে। এ এক এলাহি ব্যাপার– যেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দে গো মা লুটেপুটে খাই।
মামলার এজাহারেই লেখা আছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতার আসার পর ২০১০ সাল থেকে এ রথী-মহারথীরা ফরিদপুরের এলজিইডি, বিআরটিএ, সড়ক বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি বিভাগের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এ ছাড়া মাদক কারবার, ভূমি দখল করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তাঁরা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এ মামলায় ওই দুই ভাইয়ের নাম বেশি প্রচার পায়; যেহেতু তাঁরা ছিলেন একই সঙ্গে কেন্দ্র ও জেলার তৎকালীন দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী এক নেতার ছায়াসঙ্গী। কিন্তু কিছুটা প্রকৃতির প্রতিশোধ হিসেবে ওই নেতার তবিয়ত উল্টে গেলে তাঁর সঙ্গীদেরও কপাল ভেঙে যায়; তাঁদের যেতে হয় শ্রীঘরে।
ওই বাঘ ও মহিষকে এক ঘাটে জল খাওয়ানো নেতা কিন্তু আরও বহু এলাকায়ই আছে, এর অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে রুবেল-বরকতদেরও অভাব নেই সেসব এলাকায়। একটা কথা এখন ক্ষমতাসীন দলেরও নেতাকর্মীর মুখেও শোনা যায়, দেশে অনেক সংসদ সদস্য আছেন তাঁদের অধিকাংশই নিজ নিজ এলাকার জমিদার বনে গেছেন; তাঁদের কথার বাইরে এলাকায় গাছের একটি পাতাও নাকি নড়ে না। ফলে এলাকার সব উন্নয়নকাজ যেমন তাদের কাঙ্ক্ষিত কমিশন দিয়ে বাস্তবায়িত করতে হয়, তেমনি দখলদারিত্ব ও প্রতিপক্ষকে ঠেঙ্গানো– এমনকি তারা নিজ দলের সদস্য হলেও দীর্ঘদিন ধরেই তাদের রুটিন কাজ হয়ে পড়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রুবেল-বরকতদের গডফাদার যেমন হঠাৎ বনে যাওয়া রাজনীতিবিদ, তেমনি ওই জমিদার বনে যাওয়া সংসদ সদস্যদেরও অধিকাংশ ২০০৮ সালের আগে তো বটেই, এমনকি তাদের কেউ কেউ দশম সংসদ নির্বাচনের আগেও রাজনীতিতে ছিলেন না। ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নই যে এ সুযোগসন্ধানীদের পথ করে দিয়েছে তা ব্যাখ্যা করে বলার দরকার নেই।
প্রশ্ন হলো, দেশের অন্যত্র যে রুবেল-বরকতরা তাদের গডফাদারদের ছত্রছায়ায় জনগণের সম্পদ লুটেপুটে খাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও কি একই পদক্ষেপ দেখা যাবে?
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- সাইফুর রহমান তপন