ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

না শ ক তা

হলি আর্টিসানে হামলার রাত ও তারপর

হলি আর্টিসানে হামলার রাত ও তারপর
×

২০১৬ সালে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিসান হামলা-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতা ফাইল ফটো

এ কে এম শহীদুল হক

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০

আমি ৩২ বছর পুলিশে চাকরি করেছি। পুলিশপ্রধানের পদ অলংকৃত করে ২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করি। আমার দায়িত্ব পালনকালে দেশে অনেক ঘটনাই ঘটেছে। তার মধ্যে গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ছিল এক রোমহর্ষক ঘটনা। ওই ঘটনা ঘটিয়েছিল আইএস নামধারী কতিপয় দেশি জঙ্গি। পরবর্তী সময়ে তদন্তে প্রকাশ পায় তামিম চৌধুরী নামে এক শীর্ষ জঙ্গির নেতৃত্বে হলি আর্টিসানের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটানো হয়। তদন্তে তামিম চৌধুরী সম্পর্কে অনেক তথ্য বেরিয়ে আসে। তামিম চৌধুরীর জন্ম বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে। শৈশবে তিনি পরিবারের সঙ্গে কানাডা পাড়ি জমান। সেখানেই বেড়ে ওঠেন। যে কোনোভাবেই হোক তিনি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। আইএসের পক্ষে সিরিয়াতে যুদ্ধ করেছিলেন বলে জানা যায়। শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের ফাঁসি হওয়ার পর জঙ্গি সংগঠন জেএমবির কর্মী-সমর্থকরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ২০১৩ সালে তামিম চৌধুরী আইএসের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশে আসেন। তিনি জেএমবির নিষ্ক্রিয় সদস্যদের সংগঠিত করে তাদের চাঙ্গা করে তোলেন। প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধ করে তাদের তথাকথিত জিহাদের সৈনিক হিসেবে তৈরি করেন। এরাই নিউ জেএমবি হিসেবে পরিচিতি পায়।

দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় নিউ জেএমবির গোপন সংগঠন গড়ে ওঠে। তারা কয়েকটি আত্মঘাতী দলও গঠন করেছিল। তামিম চৌধুরী চেয়েছিলেন দেশে বড় একটি ঘটনা ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক মহল এবং সিরিয়া-ইরাকের আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের কাছে এমন বার্তা পৌঁছে দিতে যে বাংলাদেশে আইএসের শক্ত ঘাঁটি আছে। হলি আর্টিসানের ঘটনা ঘটিয়ে তাঁর প্রাথমিক ইচ্ছার বাস্তবায়ন হয়েছিল। জঙ্গিরা আইএসের কালো পতাকা ও রেস্টুরেন্টের ভেতরের অপারেশনের ছবি তুলে আইএসের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিল। হলি আর্টিসান হামলায় জঙ্গিরা দেশি-বিদেশি ২২ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাঁদের মধ্যে দু’জন নারীও ছিলেন। ৯ জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয় এবং তিনজন বাংলাদেশি ছিলেন। বাংলাদেশির মধ্যে দু’জন পুলিশ অফিসার– ডিবির সিনিয়র সহকারী কমিশনার রবিউল এবং বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাউদ্দিন।

প্রথমে ইউনাইটেড হাসপাতালে যাই। হাসপাতালে গিয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখতে পাই। ওসি সালাউদ্দিনের লাশ হাসপাতালের বারান্দায় স্ট্রেচারে দেখতে পাই। রবিউল মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিল। চিকিৎসকরা তার অবস্থা স্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। আমি তাকে সিএমএইচে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স রেডি রাখি এবং রাস্তা পরিষ্কার রাখার জন্য ডিসি ট্রাফিককে নির্দেশ দিই। কিন্তু তাকে বাঁচিয়ে রাখা গেল না। আমার চোখের সামনেই সে না ফেরার দেশে চলে গেল। একে একে আরও আহত পুলিশ অফিসারকে হাসপাতালে আনা হচ্ছে। এডিশনাল কমিশনার মারুফ, এডিসি আহাদ, এসআই ফারুকসহ অনেকে। হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ও স্টাফরা হিমশিম খাচ্ছিলেন। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে হাসপাতালের পরিস্থিতি অবহিত করলাম। তিনি কয়েকজনকে সিএমএইচে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে বললেন। হাসপাতালে আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা মোটামুটি ঠিক করে আমি ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দিলাম। পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া ঘটনাস্থলে আছেন। তিনি আমাকে সেখানে না গিয়ে ঘটনাস্থল থেকে একটু দূরে জনৈক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার বাড়িতে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। আমি সেখানে গিয়ে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা, র‍্যাবের ডিজি, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সব গোয়েন্দা সংস্থার অফিসারদের দেখতে পাই। মিডিয়ার অনেক কর্মী সংবাদ সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন।

আমি সার্বিক পরিস্থিতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানালাম। তিনি অন্যদের কাছ থেকেও তথ্য জানতে পেরেছিলেন। তিনি আমাকে গণভবনে যেতে নির্দেশ দিলেন। সেনাপ্রধানকেও আসতে বলেছেন বলে জানালেন। আমি সিটিটিসির অফিসারদের নিয়ে গণভবনের উদ্দেশে রওনা হলাম। অন্যান্য অফিসারও গণভবনে গেলেন। সেনাপ্রধানও গণভবনে এলেন।
গণভবনে ঢুকলাম। রাত তখন সম্ভবত ৩টা। সেনাপ্রধান জেনারেল বেলালও ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী এলেন। সবার কথা শুনলেন। সবার মতামত শুনে সিদ্ধান্ত দিলেন– আর্মির কমান্ডো দল অপারেশন করবে। পুলিশ ও র‍্যাব সহায়তা করবে। সে অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম চলল। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে প্রথম ছিল। জঙ্গিদের দখলে দেশি-বিদেশি জিম্মি ছিল বলে জানা যায়। আগে পুলিশের এ ধরনের অভিযান করার অভিজ্ঞতা নেই। তাই আমি আগ বাড়িয়ে এককভাবে অভিযানের দায়িত্ব নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করিনি। তবে পুলিশকে দায়িত্ব দিলে অবশ্যই সাহসের সঙ্গে তারা সফল অভিযান করতে পারত। এ বিশ্বাস আমার ছিল। অভিযানের প্রস্তুতি দেখে জঙ্গিরা জিম্মিদের ছেড়ে দেয়। ভোরের দিকে সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করে।
হলি আর্টিসানের জঙ্গি হামলার পর দেশে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাতে শুরু করেন। গার্মেন্ট সেক্টর স্থবির হয়ে পড়ে। বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশে আসা এমনকি অর্ডার দেওয়া স্থগিত রাখেন। বাংলাদেশ থেকে বিদেশি কূটনৈতিকদের পরিবার-পরিজন স্বদেশে ফেরত পাঠানো শুরু করে। আমেরিকাসহ কোনো কোনো দেশ ও দূতাবাস তাদের দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশে ভ্রমণ করতে নিষেধ করে। বাংলাদেশের মধ্যে তাদের চলাচলে বিধি-নিষেধ আরোপ করে। কোনো কোনো অভিভাবক পুলিশের কাছে জানতে চান– তাঁদের সন্তানদের স্কুল-কলেজে পাঠাবেন কিনা। সভা-সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।


এমন পরিস্থিতিতে পুলিশপ্রধান হিসেবে আমার দায়িত্বই মুখ্য। পুলিশকেই জঙ্গি দমন করতে হবে। জঙ্গি দমন করতে না পারলে বাংলাদেশ একটি অকার্যকর দেশ হয়ে যাবে। সামর্থ্যবানরা দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র যাত্রা শুরু করবে। আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করে দৃঢ় সংকল্প করলাম– যে কোনোভাবেই জঙ্গি-সন্ত্রাসী দমন করতে হবে। আমি অফিসারদের সঙ্গে মত বিনিময় করলাম। তাদেরকে সাহসের সঙ্গে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরুর জন্য উদ্বুদ্ধ করলাম। মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দিলাম এবং তদারকির ব্যবস্থা করলাম। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সেও ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে শক্তিশালী করলাম। ডিএমপির সিটিটিসির কর্মকর্তা, সোয়াত ও বম্ব ডিসপোজাল টিমের অফিসারদের উদ্বুদ্ধ করলাম। সিটিটিসির প্রধান মনিরুল একজন চৌকস অফিসার। তাকে সব ধরনের সহায়তা দিলাম। বগুড়ার তৎকালীন পুলিশ সুপার আসাদ জঙ্গি দমনে একটি বিশেষ টিম গঠন করেছিল। তাদেরকেও সব ধরনের সহায়তা করলাম। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, সিটিটিসি ও বগুড়ার টিমের মধ্যে সুসমন্বয় করে জঙ্গি দমনে সবাই নিয়োজিত হলো। আমরা প্রথমে জঙ্গিদের সম্পর্কে তথ্য বা ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহের ওপর জোর দিলাম। আস্তে আস্তে জঙ্গিদের অনেক তথ্য আমাদের কাছে আসতে শুরু করে। জঙ্গিরা যেখানেই কোনো নাশকতার উদ্দেশ্যে আস্তানা গাড়ে, আমাদের গোয়েন্দারা আগে থেকেই তা জানতে পারে। তাদের আস্তানা শনাক্ত করার পর সিটিটিসির সোয়াত ও বম্ব ডিসপোজাল টিম অপারেশনে জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করে। আত্মঘাতী জঙ্গিরা পুলিশের অভিযানকালে নিজেরাই নিজেদের বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের প্রায় সব জেলায় জঙ্গি আস্তানা ছিল। পুলিশ সেগুলো শনাক্ত করে অভিযান পরিচালনা করে। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় অপারেশন হয়। বড় বড় অপারেশন হয় ঢাকা মহানগরের কল্যাণপুর, পলাশী, আশুলিয়া ও রূপনগরে। ঢাকা মহানগরের বাইরে গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা জেলা, কুমিল্লা, সিলেট, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, গাইবান্ধা, কিশোরগঞ্জ ইত্যাদি জেলায় অপারেশন চালানো হয়। সোয়াত টিমের একটির পর একটি সফল অভিযানে জনমনে স্বস্তি ফিরে আসে।

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত সৃষ্টির কারণে যুবকদের মধ্যে জঙ্গি সংগঠনে যোগদান করার প্রবণতা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। জুলাই ২০১৬ থেকে জানুয়ারি ২০১৮ সময়ের মধ্যে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান ও গণসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে সব শ্রেণি-পেশার লোক তথা জনগণকে সম্পৃক্ত করার কারণেই বাংলাদেশে জঙ্গিদের দমন করা সম্ভব হয়েছিল। দেশ নাশকতা থেকে রক্ষা পেয়েছিল। বাংলাদেশের জঙ্গি দমন অন্যরা একটি রোল মডেল হিসেবে গণ্য করে।  

এ কে এম শহীদুল হক: সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ

আরও পড়ুন

×