অন্যদৃষ্টি
কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙুক
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০
রাক্ষুসে মাছ সাকার নিয়ে বিশেষত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বেশ উদ্বেগ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ উদ্বেগ অবশ্য অস্বাভাবিক নয়। কারণ এ মাছ যে পুকুর বা বদ্ধ জলাশয়ে থাকে, সেখানে অন্য মাছের বসবাস দুরূহ হয়ে পড়ে। খাদ্য হিসেবে আগ্রাসী এ মাছ ময়লা-আবর্জনা থেকে পোকামাকড় এমনকি অন্য মাছের ডিম ও লার্ভা গোগ্রাসে গেলে।
কিন্তু সমস্যা হলো, বিশেষজ্ঞদের এ উদ্বেগ আমাদের নীতিনির্ধারকদের যথাসময়ে টনক নড়াতে পারেনি। সোমবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় যখন এ মাছের বংশবিস্তার ঠেকানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, ততদিনে মাছটি দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানীর বুড়িগঙ্গায় যথেষ্ট অক্সিজেন নেই বলে অন্য মাছ সেখানে দুর্বল হয়ে গেছে। কিন্তু অসম্ভব জীবনীশক্তিধারী সাকার নাকি সেখানে কিলবিল করছে। শুধু বুড়িগঙ্গা নয়; শীতলক্ষ্যাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বদ্ধ জলাশয়, পুকুর, ডোবা, খাল, বিল, নদী এবং নর্দমায় নাকি তার প্রবল দর্শন মিলছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায় কার্প জাতীয় মাছের অন্যতম প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীতেও নাকি সে জায়গা করে নিয়েছে।
গত বছরের এপ্রিলে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএফআরআই) নানা উদ্ভাবন দেখতে যান ঢাকার কৃষি সাংবাদিকরা। ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বেশ আগ্রহ নিয়ে সবাইকে নতুন উদ্ভাবিত উন্নত জাতের সুবর্ণ রুইয়ের পুকুরে নিয়ে যান। পুকুরে বড় জাল ফেলা হলে সুবর্ণ রুইয়ের সঙ্গে আসে চার-পাঁচটি সাকার। অর্থাৎ সাকার নিয়ে যে বিশেষজ্ঞদের কপালে ভাঁজ পড়েছে, তাদেরই অন্দরমহলে মাছটি জায়গা করে নিয়েছে।
জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়ংকর এ মাছের সর্বগ্রাসী বিচরণে উদ্বিগ্ন হয়েই সম্ভবত গত ১১ জানুয়ারি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন জারি করে বলে, কেউ সাকার মাছ আমদানি, প্রজনন, চাষ, পরিবহন, বিক্রি, গ্রহণ বা প্রদান, বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও মালিক হতে পারবেন না। তবে পুরাকথার কুম্ভকর্ণ ছয় মাস ঘুমিয়ে ছয় মাস জাগলেও, সরকারি কর্মকর্তারূপী এ যুগের কুম্ভকুর্ণরা সম্ভবত বছরে মাত্র এক মাস জেগে বাকি সময় ঘুমিয়ে কাটান। ফলে নিষিদ্ধ করেই দায় শেষ করেছে মৎস্য বিভাগ। প্রতিবেদনমতে, এ মাছের আগ্রাসন বন্ধে মাঠ পর্যায়ে নেই কোনো তৎপরতা। আর এদিকে অগ্নিমূল্যের মাছের বাজারে কোনো বিকল্প না পেয়ে নিম্ন আয়ের মানুষ দেদার খাচ্ছেন দেখতে দারুণ এবং তাদের ভাষায় খেতেও নাকি দারুণ এই ‘চগবগে’ মাছ। যদিও এ মাছের জীবনযাত্রা ও পুষ্টিগুণ নিয়ে গবেষণা করেন এমন বিজ্ঞানীরা বলছেন, গবেষণায় মাছটির দেহে উচ্চমাত্রার বিষাক্ত রাসায়নিক ধাতু ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি মেলে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এমনকি এ মাছ এতটাই বিষাক্ত, এটিকে অন্য মাছের খাদ্য কিংবা পোলট্রি ফিড তৈরিতেও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, সচ্ছল ব্যক্তিরা সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে এ মাছ ভক্ষণের বিপদ সম্পর্কে সচেতন হলেও অ্যাকুয়ারিয়াম সাজাতে ঠিকই তা লালন করছেন। মাছটি নাকি অ্যাকুয়ারিয়ামের কাচের গায়ের ময়লা নিমিষেই খেয়ে ফেলে। তাই অ্যাকুয়ারিয়ামটি মালিককে কষ্ট করে পরিষ্কার করতে হয় না। তবে দেরিতে হলেও আমাদের সব ধরনের জলাশয় সাকারমুক্ত করতে মৎস্য বিভাগ জেগে উঠবে– এ আমাদের প্রত্যাশা।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- সাইফুর রহমান তপন