জন্মদিন
স্মরণ ও বিস্মরণে তাজউদ্দীন আহমদ
তাজউদ্দীন আহমদ
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঘটে যায় এক নৃশংস, পৈশাচিক ঘটনা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সামান্য কয়েকজন সশস্ত্র সেনাসদস্য প্রকাশ্যে ঢুকে আদালতের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে কারাগারের অভ্যন্তরে ঢুকে গুলি করে হত্যা করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, তাজউদ্দীন
জনরবে এই কুখ্যাত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে খুব বেশি প্রশ্ন ওঠেনি। বহু বছর এই পৈশাচিক, বর্বর হত্যাযজ্ঞের মামলা আলোর মুখও দেখেনি। তাই কেন, কীভাবে, কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটাল সেটি নিয়ে খুব বেশি আলোচনাও হয়নি। এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রাজনৈতিক পরিকল্পক কারা, সে তথ্যও উন্মোচিত হয়নি। ৪৮ বছর আগে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কী চিহ্ন বহন করে, তারও পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি। তবে এই হত্যাকাণ্ডের মামলায়, হাইকোর্টের রায়, আপিল বিভাগের রায়ে আদালত কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। কিছু বিষয়কেও নজরে এনেছেন।
জেলহত্যা মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় (ফৌজদারি আপিল নম্বর ২৩/২০১১) দিতে গিয়ে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা উল্লেখ করেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর পুরো জাতি এই সংবাদ শুনে অবাক হয়েছিল– সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদ এবং কামারুজ্জামান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাদের নিজেদের সেলে নিহত হয়েছেন। কারা কর্তৃপক্ষ ছিল নির্বিকার এবং উদাসীন।’
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যে বলছেন, ‘কারা কর্তৃপক্ষ ছিল নির্বিকার এবং উদাসীন।’ কিন্তু নির্বিকারত্ব কেমন ছিল? উদাসীনতার পরিমাণও বা কেমন ছিল? কেন এই নির্বিকারত্ব ও উদাসীনত্ব ঘটতে পারল? জেলখানায় যে চারজন নেতাকে হত্যা করা হয়, তার মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদই একমাত্র ব্যক্তি যিনি তৎকালীন সময়ের সরকারে ও দলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন না। এমনকি ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি মন্ত্রিসভার পদ থেকে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে।
তাহলে জেলখানার মধ্যে তাঁকে খুন করা হলো কেন– এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫-১৯৭৫) সম্পর্কে আমাদের নীরবতা ও সরবতা বিষয়ে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। তাজউদ্দীন আহমদ জাতির এক সংকটের সময়ে, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে, তাঁর নামে পরিচালিত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হলে তার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশীয়, আন্তর্জাতিক তো বটেই এমনকি দলের অভ্যন্তরীণ সকল ক্রাইসিস কাটিয়ে এই সশস্ত্র যুদ্ধকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে আসেন। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবেও তাজউদ্দীন আহমদ দায়িত্ব পালন করেন।
দেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে, দেশের সংবিধানে– যেখানেই সুযোগ এসেছে তাজউদ্দীন আহমদ এক গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও বৈষম্য বিলোপকারী সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের কল্যাণমুখী অর্থনীতির প্রবর্তনে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা রেখেছেন। তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল নৈতিকতা এবং নৈতিকতার কেন্দ্রে ছিল ‘মানুষ’। এক মানবতাবাদী কল্যাণময় রাষ্ট্রচিন্তা তার অর্থনীতি চিন্তাকেও প্রভাবিত করেছে দারুণভাবে। রাজনীতিতে তিনি ছিলেন প্রকৃতই গণতান্ত্রিক এবং নিয়মতান্ত্রিক চর্চার অনুরাগী। নিজের জীবনে তো বটেই, রাষ্ট্রের জীবনেও এই নীতিবাদী মানুষমুখীন কল্যাণধারা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। সারাজীবন কুটিল-জটিল-ষড়যন্ত্রমুখীন-গোয়েন্দা সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা রাজনীতির বদলে গণমুখীন প্রকাশ্য নীতিনির্ভর রাজনীতিই করেছেন। রাষ্ট্রকেও সেভাবে বেড়ে উঠতে দিতে চাইতেন।
তাজউদ্দীন আহমদের সেই আদর্শিক অবস্থান নিজ দলের মধ্যে খুব একটা সমাদর পায়নি কখনোই। ফলে যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ার প্রশ্ন আসে, তখন তাজউদ্দীন আহমদের নৈতিকতাকেন্দ্রিক, মানুষমুখীন, উদার গণতান্ত্রিক চিন্তা বহুজনের কপালে ভাঁজ ফেলে। এই ভাবনা ও কর্মযোগ তাজউদ্দীন আহমদকে দেশে, দেশের বাইরে বহুজনের, বহুপক্ষের শত্রু হিসেবে আরও সামনে নিয়ে আসে।
বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেই দলে, সরকারে ব্রাত্য হয়ে পড়েন তাজউদ্দীন আহমদ। আওয়ামী লীগের সুদিনেই তাঁর দুর্দিন শুরু হতে থাকে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে নৈতিকভাবে যত বড় হবে, তাজউদ্দীন আহমদের চিন্তা ও কর্ম ততই সমুজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
শুভ কিবরিয়া: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক
- বিষয় :
- জন্মদিন
- শুভ কিবরিয়া