সমাজ
সুযোগ্য পিতার সুপুত্রের ছাগলকাণ্ড ও পাবলিকের সুখ
নূরুননবী শান্ত
নূরুননবী শান্ত
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৪ | ০০:১৫
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মতিউর রহমানের সুযোগ্য পুত্র ১৯ বছর বয়সী মুশফিকুর রহমান ইফাতের ‘ছাগলকাণ্ড’ প্রমাণ করেছে– দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশ কীভাবে অর্থবিত্ত বানায় এবং তা কীভাবে ভোগ করে। জ্ঞাত আয় ও ব্যয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য তথা দুর্নীতির দৃশ্যমান সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতিবাজরা সমাজে যে সমীহ অর্জন করে থাকেন, সেটাও কম উপভোগ্য নয়। দুর্নীতির অর্থের উচ্ছিষ্ট উপভোগ করে তাদের সহকর্মী, আত্মীয়স্বজনও।
ইফাতের পরিচিতরা তাকে বিত্তবান ও ক্ষমতাবান লোকের ছেলে হিসেবে এতদিন সমীহই করেছে, যেমন সবাই করে থাকে। কেউ প্রশ্ন তোলেনি– সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ এক যুবকের ৭০ লাখ টাকা দিয়ে গরু কেনার সামর্থ্য কীভাবে হয়! কেউ প্রশ্ন তোলেনি, কীভাবে কোটি কোটি টাকার গাড়ি, দামি ঘড়ি, লাখ লাখ টাকার পাখি পোষার সাধ্য তৈরি হয় এক উঠতি তরুণের? তার নিজের দূরে থাক, অভিভাবকেরও বেতনবহির্ভূত আয় থাকার কথাই নয়। ইফাতের মা-বাবা এই বিলাসিতাকে প্রশ্রয়ই কেবল দেয়নি, রসদও জুগিয়েছে।
প্রথমে পুত্র হিসেবে স্বীকার করতে না চাইলেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম তার চৌদ্দগুষ্টির নাম-ঠিকুজি বের করে দেখিয়ে দিয়েছে– মতিউর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রথম সন্তান ইফাত। কিন্তু পাবলিকের সুখ ওই জানা পর্যন্তই। টাকা ও ক্ষমতা নিয়ে এখন আর প্রশ্ন তোলা যায় না। তুলতে পারলেও পরিস্থিতির হেরফের হয় না। বাংলাদেশের মানুষ এ রকম সহস্র নারী-পুরুষের ক্ষমতার দাপট ও টাকার গরম সম্পর্কে জানে।
এখন ব্যাংকের ছোট ছোট কর্মকর্তাও বিমানবন্দরের আউটলেটে পোস্টিং নিতে ঘুষ দেয়। কেন? প্রদত্ত ঘুষের হাজার গুণ কামানো যাবে বলে। তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা ‘নন-ক্যাডার’ সাব-রেজিস্ট্রার হয় মূলত টাকার পাহাড় তৈরি করার জন্য। সুতরাং রাজস্ব বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হয়েও শেয়ারবাজারে কারসাজির মতো ব্যবসা করাতে এমন কী দোষ! সেটা টেলিভিশন চ্যানেলে ফলাও করে বলা যাবে না কেন?
অবৈধ অর্থ ও সম্পত্তি এখন আর লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। বরং সেটা যত দেখানো যায়, ততই সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান। দেখিয়ে দেখিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে কিঞ্চিৎ দিয়ে ‘দানবীর’ কিংবা ‘সমাজসেবী’ সাজতে পারলে পরকালের রাস্তাও সহজ হয়ে যায়। আজকাল কেউ আর প্রশ্ন তোলে না– দানের অর্থ হালাল পথে এসেছে কিনা। আর দেখানো ও দেখার জন্য এখন সামাজিক মাধ্যম তো হাতে হাতে।
এ দেশে অবৈধ টাকা ও ক্ষমতাকে সমীহ করার প্রবণতা ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। কী উপায়ে কার টাকার পাহাড় তৈরি হলো, সেটা এখানে কোনো ইস্যুই নয়। যারা দুই নম্বরির টাকা বানাতে পারছে না, তারা এখানে ব্যর্থ হিসেবেই পরিচিত। অবৈধ টাকা ও সম্পত্তির মালিক হয়ে বিত্তহীন সৎ মানুষদের ‘ফকিন্নি’ বলে গালি দেওয়ার নতুন রেওয়াজ দেখা যাচ্ছে দেশে।
এখন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতার অংশ হলেই নগরে, গ্রামে শত শত একর জমির মালিক হওয়া যায়। সে জমিতে কৃষি নয়; হবে রিসোর্ট, জুতার কারখানা, হোটেল-মোটেল, বিনোদন পার্ক, বাড়ি, ফ্ল্যাট, গরু-ছাগল-পাখির সংগ্রহশালা আরও কত কিছু! এভাবে টাকাওয়ালারা উৎপাদন ব্যবস্থা পাল্টে দিয়ে প্রাণ-প্রকৃতি সব গিলে খায়। শুধু সম্পত্তিতে খায়েশ মিটছে না। এখন পয়সা দিয়ে শিক্ষা সনদ শুধু নয়, ডক্টরেট ডিগ্রিও কেনা হচ্ছে। এমনকি ‘জনপ্রতিনিধি’ হওয়া কোনো ব্যাপারই নয়, টাকা ছিটাতে পারলে। মতিউর রহমানের এক স্ত্রী লায়লা কানিজ যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছেন, তার পেছনে নগদ নারায়ণের ক্ষমতা কি নেই?
সবই ঠিক ছিল; এক ‘উচ্চবংশীয়’ ছাগল এসে মতিউর রহমানের সবকিছু এলোমেলো করে দিল। তিনি এতটাই বেসামাল হয়ে পড়লেন– নিজের সন্তানকে অস্বীকার করছেন!
যা হোক, পিতা মতিউরের দুর্নীতি প্রমাণ হওয়ার আগেই পুত্র ইফাত লাপাত্তা; যেমনটা তদন্ত চলাকালীন দেশ ছাড়তে পেরেছেন বেনজীর; এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের সূত্র সোনা চোরাচালান থেকে সরে যাচ্ছে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের দিকে; সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকার বাহাদুর অপেক্ষা করছে অভিযোগের; সাবেক সেনাপ্রধানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কে নেবে, তার সুরাহার সংবাদ কারও জানা নেই। যে দেশের ব্যাংক খাত প্রায় ধসে যেতে বসেছে, সেই দেশের ব্যাংক থেকে কত সহজে টাকা স্থানান্তর করা যায়, তা বেনজীর দেখিয়ে দিয়েছেন। সুপুত্র ইফাত ও তার সুযোগ্য পিতাও নিশ্চয় পারবেন সব ‘ম্যানেজ’ করতে।
সন্তান ইফাতের কান ধরে পিতা মতিউরের মাথা টানা যাক বা না যাক, আমরা জনগণ ব্যাপক বিনোদিত হয়েছি ১২ লাখি ছাগলের সুরত দেখে। ব্যবসায়ীরা ঠিকই জানে কোন ব্যবসা কখন লাফ দেবে, ক্রেতাদের সাধ্য ও শখ কেমন। এসব জানার জন্য ঘরে ঘরে জরিপ লাগে না; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখাই যথেষ্ট। সুতরাং বাজারে কোটি টাকার ছাগলের দেখাও মুক্তবাজারে মিলবে বলে আশা করা যায়।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর সময় প্রচার করা হয়েছিল– এতে দুর্নীতি কমবে। এরপর বারবার তা করা হয়েছে সরকার হিসেবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের তোষণ করতে। কিন্তু দুর্নীতি কমেনি। আগে বিছানার নিচে লুকানো হতো, এখন শেয়ারবাজারে খাটানো হয়, ছাগলও কেনা হয়। টাকা রোল করে। তার ওপর সরকারি চাকরি (সংশোধন) বিল ২০২৩-এ বলা হয়েছে, স্বশাসিত সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারের অধীন প্রতিষ্ঠানের কেউ ফৌজদারি অপরাধ করলেও বিভাগীয় অনুমোদন ছাড়া গ্রেপ্তার করা যাবে না। সুতরাং নো চিন্তা,
ডু ফুর্তি!
নূরুননবী শান্ত: গল্পকার ও অনুবাদক
- বিষয় :
- নূরুননবী শান্ত
- সমাজ