সাক্ষাৎকার: অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
উভয় পক্ষকে সাময়িক হলেও সমঝোতায় আসতেই হবে
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৪ | ২২:৪৫
কোটা সংস্কার আন্দোলনের জের ধরে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৭ সালে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তাঁর সম্পাদনায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে ত্রৈমাসিক সাহিত্য-সংস্কৃতির পত্রিকা নতুন দিগন্ত। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হয়ে ১৯৫৬ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন; পরবর্তী সময়ে পিএইচডি করেছেন যুক্তরাজ্যের লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৩ জুন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের সহকারী সম্পাদক সাইফুর রহমান তপন
সমকাল: শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থামছে না; পুলিশ ও সরকারি দলের লোকদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে রোববারও বহু হতাহত হয়েছে। অন্যদিকে সরকার আবারও কারফিউ জোরদার করেছে। আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাই।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ার কারণেই এ ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটা দুঃখজনক ও হতাশাজনক। আমরা এর আগে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি দেখেছি, যেখানে কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছে। দেশ ও জাতির জন্য এহেন হতাহতের ঘটনা অত্যন্ত ক্ষতিকর। উভয় পক্ষের মধ্যে একটা সমঝোতা জরুরি।
সমকাল: শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: যখন শুরু হয় তখন এটিকে ‘কোটা আন্দোলন’, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ ইত্যাদি নামে ডাকা হয়েছে। আসলে এটি হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। শিক্ষার্থীরাই এটা স্পষ্ট করেছে। তারা বলেছে, সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা হলো বৈষম্যমূলক। তারা এর বিরুদ্ধে। মূল কথাটা এখানে বৈষম্য, এটাই আমার প্রথম কথা। সমাজে যে বৈষম্য চলছে, সেটা মানুষকে বিক্ষুব্ধ করছে। আমরা একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ চেয়েছিলাম। পাকিস্তান আমলে একটা বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা ছিল, আঞ্চলিক বৈষম্য ছিল, সেটা দূর করতে আমরা স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছি। কিন্তু স্বাধীন দেশে বিশেষত সামাজিক বৈষম্য রয়ে গেল; শুধু রয়ে গেল না, এখানে যত অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে ততই সে বৈষম্য বেড়েছে। কাজেই শিক্ষার্থীরা এখন যে আন্দোলন করছে সেটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে।
সমকাল: আমরা বর্তমান সরকারের আমলেই এর আগে বিশেষত শিক্ষার্থীদের কয়েকটি আন্দোলন দেখেছি; সেগুলোর সঙ্গে এ আন্দোলনের পার্থক্য কী?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমরা এর আগে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন দেখেছি, সেটা ছিল প্রাণ রক্ষার জন্য। বাংলায় একটা যুগল শব্দ আছে– জানমাল; অর্থাৎ জানের সঙ্গে মালও গুরুত্বপূর্ণ; মাল না থাকলে জানও বিপন্ন হয়। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছেলেমেয়েরা বেরিয়েছিল জান রক্ষার জন্য। আর এবারের আন্দোলন আরও ব্যাপক পরিসরে সংঘটিত হচ্ছে। সম্পদের মালিকানা ব্যক্তিগত থাকবে, না সামাজিক হবে– এটাই মূল প্রশ্ন আজকের দিনে সারাবিশ্বে। আমাদের এখানেও ব্যক্তিমালিকানা স্ফীত হয়েছে। দেখা গেল, যত উন্নতি হচ্ছে তত বৈষম্য বাড়ছে। এই যে আন্দোলনে এত সাধারণ মানুষ চলে এসেছে, এর কারণ তারাই এ বৈষম্যের সবচেয়ে বড় শিকার। অনেক শিশু মারা গেছে, বোঝা যায় তারা নিরাপদে নেই; অনেক শ্রমজীবী মানুষ মারা গেছেন, যারা ওই বৈষম্যে পিষ্ট হচ্ছেন। যারা মারা গেছেন তাদের কেউ জীবিকার তাগিদে বেরিয়েছিলেন, কেউ চিকিৎসার জন্য বা ওষুধ কেনার জন্য। এটা স্পষ্ট, এ আন্দোলনে মানুষের অংশগ্রহণ ব্যাপক, সর্বস্তরের মানুষ এতে যোগ দিয়েছেন।
সমকাল: আন্দোলনটি তো স্পষ্টত এখন রাজনৈতিক রূপ ধারণ করেছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: শিক্ষার্থীরা শুরু করলেও আন্দোলনটি এখন আর তাদের হাতে নেই। ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছাত্ররা শুরু করলেও তা গণআন্দোলনে উন্নীত হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনও শুরু করেছিল ছাত্ররা। এক পর্যায়ে তা গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়। একটা বিরাট গণঅভ্যুত্থান, যা রাষ্ট্রকেই বদলে দিল। এ আন্দোলনটিও সে রকম বৈষম্যের বিরুদ্ধে। মানুষ বঞ্চিত, অসহায়। এ অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সে আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। রাষ্ট্র তাদের কোনো নিরাপত্তা দিচ্ছে না। উল্টো রাষ্ট্র যে উন্নতি ঘটাচ্ছে, তাতে ধনী আরও ধনী হচ্ছে, গরিব আরও গরিব। যে সত্যটা উন্মোচিত হলো এ আন্দোলনে সেটা হলো, মানুষ খুব অসহায় অবস্থায় আছে। সংবাদপত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় কেবলই বাবার কান্না, মায়ের কান্না, স্বজনের কান্না। আসলে সেগুলো কান্না নয়, আর্তনাদ। এ আর্তনাদই বেরিয়ে এলো এবারের আন্দোলনে। আঘাত পেয়ে তারা এ আর্তনাদ করল; যারা আঘাত পায়নি তারাও প্রতিবাদ করছে আন্দোলনে গিয়ে। কাজেই এ আন্দোলনকে আমরা বৃহত্তর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসবেই দেখব।
সমকাল: আন্দোলনকারীরা তাদের দাবিতে অনড়, সরকারও তার অবস্থান থেকে সরছে না। আপনি কি সমাধানের কোনো পথ দেখছেন?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: যে বহুমাত্রিক বৈষম্যজনিত ক্ষোভ থেকে এ আন্দোলনের সূত্রপাত, এর কোনো আশু সমাধান আমরা জানি না। তবে আজকে সারাবিশ্বেই পুঁজিবাদের কারণে মানুষে মানুষে যে বৈষম্য চলছে, তার বিরুদ্ধে আন্দোলনও চলছে। মানুষের সেই ক্ষোভেরই একটা প্রকাশ দেখি দেশের এ আন্দোলনে। আমি এটাকে দেখি পৃথিবীব্যাপী ওই যে বড় এক সংকট চলছে পুঁজিবাদের কারণে, তারই অংশ হিসেবে। এ থেকে মুক্তি কিন্তু কোনো সাময়িক ব্যবস্থার মাধ্যমে আসবে না। মুক্তির পথটা হচ্ছে গোটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উচ্ছেদের সংগ্রাম।
সমকাল: শিক্ষার্থীরা শেষমেশ এক দফা দিয়েছে– সরকারের পদত্যাগ; এ দাবি পূরণ না হলে তারা ঘরে ফিরবেন না বলেছেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে সরকারের পদত্যাগের বিষয়টি প্রধান করে এনেছে। কিন্তু সরকারের পদত্যাগ সাময়িক একটা স্বস্তি দিলেও বৈষম্য থেকে মুক্তি দেবে না। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় তাদের পরিবর্তে রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা আসবে, তাদের পক্ষে বৈষম্যের অবসান ঘটানো সম্ভব না। পদত্যাগ হচ্ছে একপ্রকার শাস্তি বা বিচার, সেটা দিয়ে মূল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমান শাসকদের জায়গায় যে আসবে তাদের আমলেও বিদ্যমান বৈষম্যমূলক উন্নয়নের ধারাই চলবে; তখনও আমরা বড় বড় প্রকল্প দেখব, সেতু, রাস্তা, মেট্রোরেল ইত্যাদি; আবার সেই মেট্রোরেলের নিচে রিকশা বা অটোরিকশা চলবে যাদের চালাবে হাড় জিরজিরে মানুষরা। দেখা যাবে সেই চালক নিজের রিকশায় তার আন্দোলনকারী সন্তানের লাশ বহন করছেন অথবা আহত সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন।
সমকাল: বর্তমান আন্দোলন তাহলে কোন দিকে যেতে পারে?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: বর্তমান আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত হলেও এর সংগঠকরা বৈষম্যের চিত্র খুঁজে পেয়েছে। কোটা প্রথা সামনে এলেও এর গভীরে আছে বিদ্যমান বৈষম্য। তারা দেখছে, দেশে চাকরি তেমন নেই, মূলত যা আছে তা হলো সরকারি চাকরি। শিক্ষার্থীরা মনে করছে, সরকারি চাকরির জন্যই তারা লেখাপড়া করছে। সরকারি চাকরির বাইরে কোথাও এমন কোনো চাকরি নেই যা তাদের মানসম্মত জীবনযাপনে সহায়তা করবে। এ বেকারত্ব চলমান উন্নয়নেরই ফসল। ফলে শিক্ষার্থীরা এ উন্নয়নের ফাঁকিটাও ধরে ফেলেছে। আমি বলছি না, এটা একটা বিপ্লবী আন্দোলন; তবে বৈষম্যের চিত্র উন্মোচন করায় তা অনেক দূর অবধি যেতে পারে।
সমকাল: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বা ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলোর বা তাদের নেতাদের আমরা মূল ভূমিকায় দেখেছি। এখানে কিন্তু তা দেখা যাচ্ছে না; বলা যায়, নির্দলীয় শিক্ষার্থীরাই এটা পরিচালনা করছেন। ছাত্র আন্দোলন বা গণআন্দোলনে কি আমরা নতুন কোনো অধ্যায় দেখছি?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ, এটাকে একটা নতুন ধারার আন্দোলন বলা যায়। স্বাধীনতা-পূর্ব আন্দোলনগুলোতে সমাজতন্ত্রীদের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদীরাও ছিল; তবে সমাজতন্ত্রীরাই এগিয়ে ছিল, যদিও ক্ষমতায় চলে আসে জাতীয়তাবাদীরা। যারা পুঁজিবাদে বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগ যেমন জাতীয়তাবাদী, বিএনপিও জাতীয়তাবাদী। কিন্তু চলমান আন্দোলন যেহেতু পুঁজিবাদবিরোধী– কারণ পুঁজিবাদই বৈষম্যকে লালন করে, জাতীয়তাবাদীরা এর নেতৃত্বে আসতে পারছে না; আওয়ামী লীগ তো প্রতিপক্ষ, আন্দোলনটিতে সমর্থন দানের পরও বিএনপিও এর চালকের আসনে বসতে পারছে না। এটা হলো এ আন্দোলনের আরেকটা অনন্য দিক। এর নেতৃত্ব দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা, সাধারণ মানুষ এতে শামিল হয়েছেন, যারা দলের লোক হিসেবে এখানে আসছেন না। গণতন্ত্র হলো অধিকার ও সুযোগের সাম্য, যা সংবিধানে লেখা থাকলেও বাস্তবে নেই। জাতীয়তাবাদীদের কারণেই তা নেই, শিক্ষার্থীরা এটা বোঝে।
সমকাল: কিন্তু চূড়ান্ত যে লক্ষ্যে আন্দোলনটি যেতে পারে বলে আপনি বলছেন, শিক্ষার্থীদের পক্ষে কি আন্দোলনটিকে সেদিকে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না, তারা তা পারবে না। সে ধরনের নেতৃত্ব দেওয়াও শিক্ষার্থীদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ইতোমধ্যে নগ্নভাবে উন্মোচিত বৈষম্যের উপলব্ধিটা থেকে যাবে, যা ভবিষ্যতে নতুন কারও নেতৃত্বে নতুন কোনো আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটাবে।
সমকাল: এ প্রেক্ষাপটেই কি আপনি উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার প্রয়োজন উপলব্ধি করছেন? কিন্তু তার জন্য যে আলোচনা দরকার, সেটা তো হচ্ছে না।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমি মনে করি, আন্দোলনটির বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষে তাকে সেই কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এ অবস্থায় আন্দোলন দীর্ঘ সময় চালানোর চেষ্টা হলেও, মানুষ রোজ রোজ রাস্তায় নামবে না, অন্যদিকে সরকার রাষ্ট্রশক্তির চূড়ান্ত ব্যবহার করে তা থামানোর চেষ্টা করবে; মাঝখান থেকে একের পর এক নিরীহ প্রাণ ঝরতে থাকবে, সম্পদ ধ্বংস হবে। এটা কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। তাই দু’পক্ষকে একটা সমঝোতায় আসতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সে সমঝোতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে আমি এটাও বলছি, সে সমঝোতা হবে সাময়িক। কারণ বৈষম্যের যে চিত্র অতি নির্মমভাবে উন্মোচিত হলো, তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ আবারও বিস্ফোরিত হবে, হয়তো অন্যরূপে; আরও ব্যাপক পরিসরে।
সমকাল: আপনাকে ধন্যবাদ
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: সমকালকেও ধন্যবাদ।