ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

ভাঙতি বিড়ম্বনা এবং ক্যাশলেস সমাজ

ভাঙতি বিড়ম্বনা এবং ক্যাশলেস সমাজ
×

নাজমুল হাসান দারাশিকো

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৩ | আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভাঙতি নাই, ছোট নোট দেন–এই কথা কখনও শোনেন নাই, এমন মানুষ পাওয়া অসম্ভব। এর সঙ্গে রয়েছে পুরোনো, ময়লা ও ছেঁড়া নোট বদলে দেওয়ার অনুরোধ। সম্প্রতি ভারতের নয়াদিল্লি ভ্রমণে ছেঁড়া নোট বদলের অনুরোধ না শুনলেও ভাঙতির সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে বেশ।

ভাঙতি টাকার এই সংকট দিল্লির সর্বত্র। একবার ভাঙতির অভাবে না খেয়েই রাতযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। একাধিকবার গন্তব্যে পৌঁছে বাড়তি ভাড়া দিতে হয়েছে গাড়িচালককে। এমনকি সুপারস্টোরে কেনাকাটা শেষেও ভাঙতির জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। এই সংকট বলা চলে সরকারেরই সৃষ্ট! ভারতের মতো বিশাল দেশে ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট একটি ব্যয়বহুল ও বিশাল কর্মযজ্ঞের বিষয়। ফলে তারা ডিজিটাল পেমেন্টকে উৎসাহিত করছে গত প্রায় এক দশক ধরে। 

এখন ভারতে ডিজিটাল পেমেন্টের জয়জয়কার। সবখানেই কিউআর কোডসংবলিত স্টিকার। তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠানের সেবা ব্যবহার করে নাগরিকরা যে কোনো প্রয়োজনে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন। এমনকি রাস্তার পাশে ভ্রাম্যমাণ অস্থায়ী দোকানগুলোতেও কেনাকাটা শেষে মোবাইল থেকে পেমেন্ট করা যায়। এছাড়া, ব্যক্তিগত ফান্ড ট্রান্সফারেও মোবাইলের ব্যবহার প্রচুর।

ব্যাংক ও নন-ব্যাংক প্রতিষ্ঠান ছাড়াও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) তো বাংলাদেশেও আছে, কিন্তু ভারতের মতো এতটা জনপ্রিয় নয় কেন–সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বুঝলাম, ডিজিটালি পেমেন্ট ও ফান্ড ট্রান্সফারে ভারত সরকারের গৃহীত কিছু পদক্ষেপই এর কারণ। 

এর অন্যতম হলো পেমেন্ট ও ফান্ড ট্রান্সফারে কোনো ফি/চার্জ না রাখা। ইন্টারঅপারেবিলিটি সেবা গ্রহণের জন্য গ্রাহককে একটি বাড়তি পয়সাও গুনতে হয় না। ব্যবহারকারীরা সেবাদাতাদের অ্যাপগুলোর নিরাপত্তা, সেবার মান ইত্যাদি নানা বিষয় বিবেচনায় সেগুলোকে বেছে নিচ্ছেন। এ ছাড়াও, সরকার ক্যাশলেস লেনদেনকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন রকম সুবিধা দিচ্ছে। যেমন দর্শনীয় স্থানগুলোর টিকিট কিনতে একদিকে যেমন প্রায় ১০ শতাংশ ছাড় পাওয়া যায়, তেমনি প্রবেশপথের দীর্ঘ লাইন এড়িয়ে পৃথক ছোট লাইনেও প্রবেশ সম্ভব। 

বাংলাদেশে এমএফএস-এর প্রচলন একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলেও এর ব্যবহার এখনও সর্বজনীন নয়। মানুষ অনেকটা বাধ্য হয়েই এই সেবা গ্রহণ করে। মাত্র কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ ব্যাংক এনপিএসবির আওতায় পূর্ণোদ্যমে ইন্টারঅপারেবিলিটি সেবা প্রদান শুরু করেছে। এখন থেকে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লেনদেনের কোনো জটিলতা নেই–সহজেই ব্যাংক, এমএফএস এবং পিএসপিগুলোর মধ্যে অর্থের আদান-প্রদান সম্ভব। কিন্তু এই উদ্যোগ সফল হবার ব্যাপারে এখনও কিছু বাধা রয়ে গেছে।

ভারত কীভাবে এই সেবাটি বিনামূল্যে প্রদান নিশ্চিত করেছে? উত্তর হলো–ভর্তুকি দেওয়ার মাধ্যমে। অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের খরচ পুষিয়ে নেওয়ার জন্য মার্চেন্ট লেনদেনের জন্য চার্জ করছে, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আয় বাড়াচ্ছে। অনেকে ঋণ দিয়ে আয় বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাগুজে নোট ছাপানো ও ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমিয়ে এনেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকও এই পন্থা অবলম্বন করতে পারে। বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন টাকা ছাপানোর জন্য ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন টাকা ব্যয় করা হয়। এছাড়া অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। ডিজিটাল পেমেন্ট খাতে ভর্তুকি দেওয়া গেলে টাকা ছাপানো ও ব্যবস্থাপনার খরচ কমানোও সম্ভব হবে।  জনগণকে বোঝাতে হবে যে ডিজিটাল লেনদেনই নিরাপদ ও লাভজনক। তবেই ক্যাশলেস সমাজ গঠন সম্ভব হবে এবং ভাঙতি ও ছেঁড়া-ফাটা নোটের সমস্যার সমাধান হবে। 

নাজমুল হাসান দারাশিকো: ব্যাংকার

আরও পড়ুন

×