ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দিবস

গুম প্রতিরোধে শুধু অতীতে নয়, ভবিষ্যতেও তাকান

গুম প্রতিরোধে শুধু অতীতে নয়, ভবিষ্যতেও তাকান
×

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ১১:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে দেশে মানুষের স্বাধীনতা হরণের নানা পদ্ধতি এখনও চালু আছে। কিন্তু গুমের মতো নিষ্ঠুর পদ্ধতি খুব কমই আছে। কারণ গুমের যন্ত্রণা একটি দিনের ঘটনা নয়। একজন মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে যে ভয় শুরু হয়, তা তাঁর পরিবারের জীবনে বছরের পর বছর, কখনও প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলতে থাকে। পরিবার জানে না– মানুষটি বেঁচে আছে, না মরে গেছে। মৃত্যু অন্তত শোকের একটি পরিণতি তৈরি করে। গুম সেই পরিণতিটুকুও কেড়ে নেয়। এ কারণেই ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস কেবল নিখোঁজ মানুষদের স্মরণ করার একটি দিন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা, নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন। 

লাতিন আমেরিকার সামরিক শাসন থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, সশস্ত্র সংঘাত, কর্তৃত্ববাদী শাসন কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রেক্ষাপটে অসংখ্য মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। তাদের অনেকে আর কখনও ফিরে আসেননি। তাদের পরিবারগুলো আজও জানে না, তাদের প্রিয়জনের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল। এই দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থায় গুম একটি স্বতন্ত্র ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ ‘গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন’ (ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স–আইসিপিপিইডি) গ্রহণ করে। কনভেনশনটি গুম প্রতিরোধ, গুমকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি, কার্যকর তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য প্রতিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে।

২০২৬ সালে এই কনভেনশন গ্রহণের ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গুমের ঘটনা অব্যাহত থাকা মনে করিয়ে দেয় আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারকে বাস্তব সুরক্ষা ও জবাবদিহিতে রূপান্তর করাই বড় চ্যালেঞ্জ। তাই জাতিসংঘের এবারের আহ্বান– ‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশনস নাউ’। ভুক্তভোগী ও তাদের অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ আছে এতে।

গুমের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর একটি হলো অস্বীকারের সংস্কৃতি। একজন মানুষকে আটক করা হয়েছে– এমন কোনো তথ্য নেই; কোথায় রাখা হয়েছে– কেউ জানে না; তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে কিনা– সেটিও অজানা। ফলে পরিবার ন্যায়বিচারের প্রথম দরজাতেই আটকে যায়। তাই গুম প্রতিরোধের অন্যতম মৌলিক শর্ত– কোনো মানুষকে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নিয়ে তাঁর অস্তিত্ব বা অবস্থান অস্বীকার করার সুযোগ না থাকা। প্রত্যেক আটক ব্যক্তির তথ্য যথাযথভাবে নথিভুক্ত হতে হবে; তাঁকে দ্রুত বিচারিক কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করতে হবে এবং পরিবার ও আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। 

বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর। গত দেড় দশকে দেশে গুমের বহু অভিযোগ উঠেছে। কেউ দীর্ঘ সময় পর ফিরে এসেছেন, কেউ পরে আদালতে হাজির হয়েছেন। আবার অনেকের আজও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এসব অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ ওই বছরেই আগস্টে আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী কনভেনশনে যোগ দিয়েছে। সেই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা ও অধিকারে রূপান্তর করাই এখন বড় দায়িত্ব।

এই প্রেক্ষাপটে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের লক্ষ্যে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রস্তাবিত আইনটির বিভিন্ন বিধান নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের উদ্বেগও রয়েছে। অতীতের অনেক অভিযোগের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের নাম এসেছে। অথচ খসড়া আইনে গুমের ঘটনায় তদন্তের মূল দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়া হয়েছে। উপরন্তু তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে শুধু আইনি ক্ষমতা দিলেই হবে না; তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, কার্যকর জবাবদিহি এবং সম্ভাব্য অভিযুক্তদের প্রভাবমুক্ত থাকার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।

বিচারকে শুধু কয়েকজন ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে গুমের প্রকৃত কারণগুলো অনাবিষ্কৃত থেকে যেতে পারে। তদন্তে জানতে হবে– কীভাবে একজন মানুষকে আইনের বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো; কার নির্দেশে বা কার জ্ঞাতসারে তা ঘটল; কোন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তাকে সহায়তা করল এবং কেন তা প্রতিরোধ করা গেল না।

একটি পরিবার শুধু বিচার চায় না। তারা জানতে চায়– কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল; কে নিয়ে গিয়েছিল; কেন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল। এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।

কেউ যদি মারা গিয়ে থাকেন; পরিবার তাঁর মরদেহ পাওয়ার অধিকার রাখে। কেউ যদি জীবিত থাকেন; তাঁকে খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর কেউ যদি রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে সেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের পরিচয় গোপন রাখার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। সত্য জানার অধিকার, বিচার ও প্রতিকার– এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনও গুরুত্বপূর্ণ। গুমের কারণে বহু পরিবার অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বছরের পর বছর প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও আদালতের দ্বারে ঘুরতে হয়েছে অনেক পরিবারকে। তাদের ক্ষতি শুধু অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে সত্য, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার নিশ্চয়তাও দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস তাই শুধু অতীতের দিকে তাকানোর দিন নয়; এটি ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবার দিন। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো পরিবারকে থানায় গিয়ে শুনতে হবে না– ‘এখানে এমন কেউ আটক নেই’। অথচ তারা জানে, তাদের স্বজনকে কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা নিয়ে গেছে। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যেখানে কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন না এবং নিরাপত্তার নামে নাগরিকের অধিকারকে অদৃশ্য করে দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী

আরও পড়ুন

×