সমকালীন প্রসঙ্গ
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে চলেছে
মুনতাসির রহমান
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি নতুন বিমান কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন (সমকাল)। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল ঢাকায় একই মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে ১৪টি বিমান কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, যার দাম ধরা হয়েছিল প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার বা ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা।
মাহদী আমিন এ চুক্তির যুক্তি হিসেবে বিমান খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও খোদ বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের বক্তব্য ভিন্ন। গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি আবদার ছিল–তাদের বোয়িংগুলো যেন ব্যবহার করা হয়। আমরা সেগুলো কিনছি এবং ব্যবহার করছি’ (সমকাল, ১ সেপ্টেম্বর)। অর্থাৎ নিছক বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বোয়িং কেনার পেছনে আছে রাজনীতি। এ রাজনীতির কারণে গত সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার ওয়াশিংটনে স্বাক্ষর করে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি, ইংরেজিতে যা এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড।
উল্লেখ্য, ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়। আর চুক্তির মাত্র ১১ দিনের মাথায়, ২০ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেন। এর পরপরই মালয়েশিয়া তার সঙ্গে স্বাক্ষরিত অসম মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে। তবুও রহস্যময় এক কারণে বিএনপি সরকার চুক্তির বাস্তবায়ন বন্ধ করেনি। দুই দফার বোয়িং চুক্তি তারই অংশ।
চুক্তির বাণিজ্যিক অংশের কেন্দ্রে রয়েছে কৃষিপণ্য আমদানির অঙ্গীকার। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছর–প্রতিবছর অন্তত সাত লাখ টন মার্কিন গম কিনতে বাধ্য, সঙ্গে বছরে অন্তত ১২৫ কোটি ডলার মূল্যের বা ২৬ লাখ টন সয়াবিন ও সয়া-পণ্য, যার মোট আনুমানিক দাম বছরে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার। ইতোমধ্যে গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ প্রায় ছয় লাখ ৭৬ হাজার টন মার্কিন গম কিনেছে। সম্প্রতি সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে আরও কয়েক লাখ টনের চালান যুক্ত হয়েছে। উপরন্তু, এ গমের দাম টনপ্রতি প্রায় ৩০৮ ডলার, যেখানে রুশ গমের আন্তর্জাতিক দর ২২৬ থেকে ২৩০ ডলার– পার্থক্য টনপ্রতি ৭৫ থেকে ৮০ ডলার। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক জি-টু-জি চুক্তিতেও দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের তুলনায় মার্কিন গমে টনপ্রতি প্রায় ২৪ ডলার বেশি গুনতে হচ্ছে সরকারকে।
এদিকে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রায় সব মার্কিন পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সমান সুবিধা দিচ্ছে না। বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার থাকবে ১৯ শতাংশ, যা আগের এমএফএন শুল্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কার্যকর গড় শুল্ক দাঁড়াবে প্রায় ৩৪ শতাংশে। তৈরি পোশাক খাতে মার্কিন তুলা ব্যবহারের বিনিময়ে যে সুবিধা যুক্তরাষ্ট্র দেবে বলা হচ্ছে, তা কিন্তু এখনও স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্য থেকে প্রায় ১২৪ কোটি ডলার শুল্ক আদায় করেছিল, আর বাংলাদেশ মার্কিন পণ্য থেকে আদায় করেছিল মাত্র ১৮ কোটি ডলার–ব্যবধান প্রায় ছয় গুণ। নতুন চুক্তি কার্যকর হলে এই শুল্ক বাবদ যুক্তরাষ্ট্র পাবে প্রায় ২৮৫ কোটি ডলার, যেখানে বাংলাদেশের আদায় হবে প্রায় শূন্য।
চুক্তি মতে, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি বা জ্বালানি কিনতে পারবে না; যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে ঝুঁকিতে ফেলে এবং চীন-রাশিয়াসহ একাধিক ‘অবাজার অর্থনীতি’ দেশের তালিকা করে সেসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে বাধা আরোপ করা হয়েছে। এমনকি চুক্তিতে তিনবার স্পষ্ট হুমকি রাখা হয়েছে যে শর্ত না মানলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে আগের উচ্চ শুল্ক পুনরায় বসাবে।
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি কেনার অঙ্গীকার রয়েছে, যার সম্ভাব্য মূল্য আগামী ১৫ বছরে প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি (১৫ বিলিয়ন) ডলার। এর অংশ হিসেবে মার্কিন প্রতিষ্ঠান গানভরের সঙ্গে ১৩ বছর মেয়াদি চুক্তিতে মোট ১১৭ কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে, যার প্রথম চালান সম্প্রতি দেশে পৌঁছেছে। কাতার বা অন্য সরবরাহকারীর তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের বদলে কেন এই দীর্ঘমেয়াদি, উচ্চমূল্যের একক উৎসনির্ভরতা তৈরি করা হচ্ছে?
দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার এসব উদ্বেগ বিবেচনায় না নিয়ে চুক্তির পক্ষে সওয়াল করে যাচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাষ্য তো রীতিমতো বিরক্তিকর; তিনি বলছেন, এসব পণ্য ‘কোথাও না কোথাও থেকে আমদানি করতে হবে।’ যেখানে গবেষণা সংস্থা সিপিডি চুক্তিটি দ্রুত পর্যালোচনার দাবি করেছে এবং অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতো অর্থনীতিবিদ ও অধিকারকর্মীরা চুক্তি বাতিল চাচ্ছেন, সেখানে অসম ও সার্বভৌমত্ববিরোধী একটি চুক্তির পক্ষে সরকারের অবস্থান ধরে রাখা শুধু অগ্রহণযোগ্য নয়, প্রতিরোধের মুখেও পড়তে পারে।
মুনতাসির রহমান: রাজনীতি বিশ্লেষক।
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ