প্রতিবেশ
জলবায়ু পরিবর্তন এবং আসন্ন 'কপ ২৬'
ড. আবেদ চৌধুরী
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২১ | ১২:০০
জলবায়ু দুর্দশার দিন আমাদের দ্বারপ্রান্তে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা এ নিয়ে সন্দেহে ভোগেন; ভাবেন, এই ঝড়-তুফান-সাইক্লোন বৃহত্তর কোনো ক্রান্তির ইঙ্গিত বহন করে না; বরং এটা এক স্বল্প স্থায়ী আকস্মিক ঘটনা; যা এসেছে আবার চলে যাবে; তাদের সংখ্যাও পৃথিবীতে নেহাত কম নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের ক্রমাগত ও বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ জলবায়ু-সন্দেহবাদীদের পায়ের নিচের মাটি সরিয়ে নিয়েছে। মহাদেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া দাবানল শুধু মাইলের পর মাইল বনাঞ্চল পুড়িয়েই নিঃশেষ করেনি; পুড়িয়েছে সংশয়বাদীদের সন্দেহকেও। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে তার চেয়েও বড় সংকটের মহাদুর্যোগ করোনা মহামারি। বর্তমান সময় যে বিভীষিকাময়- এতে আর কারও সন্দেহ নেই।
এই বিভীষিকাময় সময় থেকে মানব সভ্যতাকে নিস্তার দিতে পৃথিবীর বড়-ছোট সব দেশের একযোগে কাজ করে যাওয়ার কথা। এরই ফলস্বরূপ এবার যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে আয়োজিত হতে যাচ্ছে ২৬তম ইউএন ক্লাইমেট চেঞ্জ কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস-কপ ২৬।
'কপ ২৬'-এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং বিশ্বের জনগণকে এর ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে অবহিত করা। বাংলাদেশও এই জলবায়ু পরিবর্তন রোধ প্রকল্পে সংযুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই মিলেমিশে কাজ করার সংকল্প কথা দেওয়া আর শেষ পর্যন্ত কথা রাখা। তা নিয়েই লেগেছে গোলযোগ।
জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে কার্বন নিঃসরণ। আমরা যদি পৃথিবীর দেশগুলোর নেট কার্বন নিঃসরণের হার হিসাব করে দেখি তাহলে দেখতে পাই, প্রতি বছর ১০০ শতাংশের মধ্যে চীন ২৯ দশমিক ১৮ শতাংশ (১১,২৫৬ মেগা টন), যুক্তরাষ্ট্র ১৪ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ (৫,২৭৫ মেগা টন), ভারত ৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ (২,৬২২ মেগা টন), রাশিয়া ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ (১,৭৪৮ মেগা টন), জাপান ৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ (১,১৯৯ মেগা টন) কার্বন নিঃসরণ করে থাকে। এ ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বছরে ৩ হাজার ৪৫৭ মেগা টন কার্বন নিঃসরণ করে। মোদ্দা কথায় তারা হলো 'ক্লাইমেট পলুটার'। শুধু চীন, যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে যা মোট নিঃসরণের ৪০ শতাংশেরও বেশি।
কথা ছিল, এসব দেশ কার্বন নিঃসরণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে তারা নিম্ন আয়ের ভুক্তভোগী দেশগুলোকে বছরে ১শ বিলিয়ন ডলার দেবে। নিম্ন আয়ের এ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- ফিলিপাইন, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, যাদের নিঃসরণের হার যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ (১১৫ দশমিক ১৪ মেগা টন), শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ (৬৭ দশমিক ৫৬ মেগা টন), শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ (১৫ দশমিক ১৫ মেগা টন), শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য শতাংশ (১ দশমিক ১২ মেগা টন)। কিন্তু দিচ্ছি-দেব বলে এ টাকা ক্লাইমেট তহবিলে জমা পড়ছে না। দরিদ্র দেশগুলো এ কারণে মিটিগেশন বা নিঃসরণ রোধ ও অ্যাডাপ্টেশন বা অভিযোজনের কাজও করতে পারছে না।
তারা প্রথমে ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রণোদনার আশ্বাস দিয়েছিল। এই আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস প্রথম শ্রেণির দেশগুলোর মাধ্যমে ঠিকমতো পূরণ হচ্ছে না। বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার
রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন, কপ ২৬ সামনে রেখে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া 'দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটে কপ-২৬-এর লক্ষ্য সম্বোধন করা :সমস্যা এবং ব্যাখ্যা' শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ টালবাহানা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পৃথিবীজুড়ে সব জীবের ওপরেই বিদ্যমান। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ জৈববৈচিত্র্য। জীববিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানব সভ্যতার শুরু থেকে গাছ ও প্রাণী বিলুপ্তির হার, সাধারণ হারের এখন প্রায় ১০০০ গুণ। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, শুধু তাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান লক্ষণ হলো তাপমাত্রা বৃদ্ধি। আর এ তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ২০ বছরে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ কোরাল রিফ ধ্বংস হয়ে যাবে। যার ফলে প্রায় ৪,০০০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির শঙ্কায় পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) তথ্যমতে, পরবর্তী শতাব্দীতে তাপমাত্রা ২ দশমিক ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে পৃথিবী দেখবে আরও ঘন ঘন খরা, তাপপ্রবাহ, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের সঙ্গে যেমন ওতপ্রোতভাবে জলবায়ু জড়িত, তেমনই এ জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানব সভ্যতা ও এর জীবিকা। শঙ্কা করা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুধু অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ যে ক্ষতি হবে তাতে প্রায় ১০,০০০ মানুষ চাকরি হারাবে। এ ছাড়াও খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, পৃথিবীর প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ এখনও কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। যদি জলবায়ু পরিবর্তনের হার অপরিবর্তিত থাকে, এটি আমাদের খাদ্য ও কৃষিতে জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন, খরারূপে কুপ্রভাব বিস্তার করবে। এতে খাদ্য ও সুপেয় পানির অভাব দেখা দেবে। এতে প্রত্যেক মানুষের জীবন প্রভাবিত হবে। তাই বলা চলে, জীববৈচিত্র্য তথা মানুষের জীবিকা রক্ষা করতে সব দেশের ঐক্যবদ্ধভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুটি জিনিস এ যুদ্ধকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রথমটি হলো, জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ। যেমন- বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনে বিনিয়োগ, পোড়ানো ইটের বদলে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করা এবং এ পদক্ষেপ বাস্তবায়নে প্রথম কাতারের দেশগুলো থেকে তহবিল সংগ্রহ করা।
দ্বিতীয়টি হলো, এর প্রভাব প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রে আলাদা করে প্রশমিত ও অভিযোজনের ব্যবস্থা করা। যেমন- সমুদ্রসংলগ্ন দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় হওয়ার আশঙ্কা বেশি। সে ক্ষেত্রে সেসব এলাকায় ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যেসব এলাকায় পানির সংকট দেখা দেয় সেসব এলাকায় গভীর ভূতল থেকে পানি তোলা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মতো ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়াও আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। বিভিন্ন বীজের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে খাদ্যাভাব দেখা দেবে।
উদাহরণস্বরূপ আমরা ধানের কথা ধরতে পারি। ২০১৮ সালের কৃষিবিদ্যা ও মৃত্তিকাবিজ্ঞানের আর্কাইভ শীর্ষক একটি জার্নালের তথ্যমতে, আগামী শতাব্দীতে তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি ধানের ফলন প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে। কারণ তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধানের পরাগায়ন ক্ষমতা কমতে থাকে। ওই গবেষণার ফলাফল যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্নেষণ করতে চাই তাহলে ফলাফল এরূপ দাঁড়ায়, ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলেও আমরা ফলন পাব। কিন্তু ওই ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে যত তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে আমরা তত কম ফলন পেতে থাকব। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে প্রায়ই ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা দেখছে। ফলে, বাংলাদেশ তার চাহিদা ও প্রত্যাশা থেকে কম ফলন পাচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা এবং এর প্রধান খাবার ভাতের চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ তাপমাত্রা-সহনীয় নতুন ধানের বীজ উৎপাদন, রোপণ ও ফলনের ব্যবস্থা করতে হবে।
এ উদ্দেশ্য সামনে রেখে সিলেটের কানিহাটিতে আমরা নতুন এক প্রজাতির ধানের জাত উদ্ভাবন করেছি, যা এক রোপণে ১ বছরে ৫ বার ফলন দেবে। এ ছাড়াও আমরা আমন ও বোরো ধানের বহু ধরনের জাত উদ্ভাবন করেছি, যা চলতি মৌসুম থেকে এক মাস আগে ফলন দেবে। এতে ওই ফসল প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাবে।
আসন্ন 'কপ ২৬' সফল করতে এবং আমাদের জলবায়ুর পরিবর্তন রোধে প্রথম কাতার হোক কিংবা শেষ কাতার সবাইকে একত্র হয়ে কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনে কেউ সমস্যা সৃষ্টিকারী আর কেউ এর ফল ভোগকারী। কিন্তু দুর্যোগের এই অন্তিম সময়ে শেষ পর্যন্ত সবাইকে একসঙ্গে যোগ দিতে হবে। পরিত্রাণ লাভের এই মহাপ্রক্রিয়ায় আমরা সবাই এক চরম বিপৎসংকুল পৃথিবীর নাগরিক।
জিন বিজ্ঞানী
- বিষয় :
- প্রতিবেশ
- ড. আবেদ চৌধুরী