সমাজ
জাকারবার্গের 'পৃথিবী' এবং একটি গুরুতর প্রশ্ন
মামুনুর রশীদ
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২১ | ১২:০০
সংবাদপত্রের আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ যা বাংলাদেশের ফেরি দুর্ঘটনা, করোনা পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা শিবিরে হত্যাকাণ্ড এবং ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনী দাঙ্গায় নিহতের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদটি হচ্ছে- ফেসবুকের করপোরেট নাম এখন 'মেটা'। নাম পরিবর্তনে কি বাংলাদেশের রামুতে বুদ্ধমূর্তি রক্ষা পাবে? কিংবা পীরগঞ্জের পূজামণ্ডপ ভাঙার হাত থেকে মানুষ রক্ষা পাবে? মার্ক জাকারবার্গ কি জেনেছেন- বাংলাদেশের পূজামণ্ডপে সাম্প্রতিককালে কী সব ঘটেছে, কত মানুষ গৃহহীন হয়েছে; সেই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পৃথিবীর দেশে দেশে কত নিরপরাধ মানুষ জেল খাটছে?
পৃথিবীকে মার্ক জাকারবার্গ দুটি ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছেন। একটি ভার্চুয়াল পৃথিবী, আরেকটি বাস্তবের পৃথিবী। এক সময় জানতাম, পৃথিবী দু'ভাগে বিভক্ত- শোষক ও শোষিত। এখন ভার্চুয়ালের অলীক পৃথিবী আর বাস্তবের নিত্য নিষ্ঠুরতার পৃথিবী।
ফেসবুক নিয়ে অনেক কথা উঠেছে। তার মধ্যে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই নানা অভিযোগ। একটি বড় অভিযোগ- ফেসবুক গণতন্ত্রবিরোধী। কীভাবে গণতন্ত্রবিরোধী; সহজ ভাষায় আমি যতটুকু বুঝি- মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নগুলো বিভ্রান্ত করে দিতে পারে; মানুষের বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানতে পারে; মানুষে-মানুষে সম্পর্ককে জটিল করে দিতে পারে। এই জটিলতা যে কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে তা অনুমান করা শক্ত। ফেসবুকের একটা বড় ফাঁক হচ্ছে, ইচ্ছা করলেই যে কোনো নামে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। কোথা থেকে এই অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, তা জানা কঠিন।
প্রথম লন্ডভন্ডের অ-কাজটি হয়েছিল চট্টগ্রামের রামুতে। একটি ফেসবুক আইডি থেকে ভুল বার্তা প্রকাশ করে স্বার্থান্বেষী মহল এক বড় লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। গুজবপ্রিয় বাঙালি সেই উস্কানিতে সায় দিয়ে স্বার্থান্বেষীদের উদ্দেশ্য সফল করেছিল। এবার রংপুরের পীরগঞ্জেও ঘটল একই ঘটনা। ইতোমধ্যে অন্যান্য জায়গায়ও ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। গুজবের সারকথা হচ্ছে, সে দ্রুত ছড়ায় এবং প্রতিবারই গুজব সৃষ্টিকারীরা নতুন কিছু সংযোজন করে। ফলে তিল মুহূর্তেই তাল হয়ে যায়। অনুন্নত বিশ্বের মানুষ সত্যকে যাচাই করার জন্য কালক্ষেপণ করে না।
অনেক বড় বড় রাষ্ট্রনায়কও কান-কথা শুনতেন বলে জানা গেছে। এই কান-কথা ফেসবুকের মতোই মারাত্মক। ফেসবুকের সত্য কখনও কখনও কারও কারও কাছে নিরেট সত্য বলেই মনে হয়। যে ফেসবুককে কেন্দ্র করে চারদিকে এত লণ্ডাকাণ্ড ঘটছে, তা এখন একেবারেই শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবার হাতে হাতে ঘুরছে। ফেসবুক চলছে অরিবাম, আর জাকারবার্গের ঝুলিতে প্রতি মুহূর্তে জমা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। শোনা গেছে, কিছুদিন আগে বাংলাদেশে ছয় ঘণ্টা ফেসবুক বন্ধ থাকার কারণে জাকারবার্গের নাকি বিপুল পরিমাণ অর্থের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণও যে বিশাল হবে, তাতে সন্দেহ নেই। সংখ্যাটা একটু অতিরিক্তই মনে হয়। কেউ কেউ বলেন, ৫০ হাজার কোটি টাকা। কারণ স্বতঃসিদ্ধ কোনো প্রমাণ নেই।
এক মা তার সন্তানদের নিয়ে খুবই বিব্রত ছিলেন। সর্বক্ষণ তার দুটি ছেলে ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত থাকত। এই নিয়ে তার অশান্তির শেষ ছিল না। সন্তানদের জন্য তিনি সর্বক্ষণ কান্নাকাটি, চিৎকার- চেঁচামেচি করতেন। কিন্তু এক দিন দেখা গেল, সেই মা নিজেই ফেসবুক চালাতে শুরু করেছেন। ছেলের বাবা ছেলেদের মতোই ফেসবুক নিয়ে বসে থাকতেন। এক সময় পরিবারে শান্তি নেমে এলো; চারজনই ফেসবুকে ব্যস্ত। বিপত্তিটা ঘটল বড় ছেলেকে নিয়ে। কলেজপড়ূয়া ছেলেটি একদিন বাড়ির সিন্দুক ভেঙে বেশকিছু টাকা নিয়ে পালিয়ে গেল ফেসবুকের বান্ধবীকে বিয়ে করবে বলে। ফেসবুকের বান্ধবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখা গেল, সে বয়সে তার দ্বিগুণ, তিন-চারটি সন্তানের মা। ছেলেটির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ইতোমধ্যে তার টাকাও প্রায় সব খরচ হয়ে গেছে। বাড়িতে ফেরার কোনো উপায় নেই। বাস্তব পৃথিবী তার কাছে একটা কঠিন পাথরের মতো মনে হলো। অনন্যোপায় হয়ে এই ছেলেটি যা কিছু টাকা ছিল তাই দিয়ে মাদকের সর্বোচ্চ মাত্রাকে কিনে ফেলল। এই মাদক কেনার সময় ধরা পড়ে সে চলে গেল কারাগারে। ইতোমধ্যে তার সবচেয়ে বড় বন্ধু সেলফোনটি হারিয়ে গেছে। এইবার কারাগারে জীবনের সবচাইতে কঠোরতম অবস্থার মুখোমুখি হলো। মা-বাবা পাগলপ্রায়।
সত্য ঘটনাটি আর বাড়িয়ে লাভ নেই। পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারবেন, এর পর কী হতে পারে? এমনিই অসংখ্য ঘটনা প্রতি মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে ঘটছে। তাই তো কহে ফেসবুক নাটকের এক পিতা ফেসবুকটি কিনতে চায় কোনো ব্যবসার উদ্দেশ্যে নয়; এটিকে সে বন্ধ করে দেওয়ার অভিপ্রায় তার। তাতে নাকি পৃথিবীর ৩০০ কোটি লোক অপমান, গ্লানি এবং হতাশার হাত থেকে রক্ষা পাবে। ফেসবুকে শুধু যে প্রেম-ভালোবাসার বিনিময় হয়, তা তো নয়; এখন দেখা যাচ্ছে বড় বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনেও ফেসবুক কতটা সহায়ক ভূমিকা রাখছে। যে কোনো সৃজনশীল কাজ-অকাজ, উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট পণ্য সবকিছুই বাজারজাত করা সম্ভব। নিকৃষ্টটাই পরিমাণে বেশি। গোয়েবলসের সেই মিথ্যাচারের কাহিনিটি সম্ভবত ফেসবুক দ্বারা সত্য হবে।
এ কথা ঠিক, প্রযুক্তির উন্নয়ন কোনো অবস্থাতেই থামিয়ে রাখা যাবে না। গত কয়েক দশকে পৃথিবীতে এক বিশাল প্রযুক্তিবিপ্লব ঘটে গেছে। সেই বিপ্লব ঠেকিয়ে রাখার উপায় কারও নেই। যেমন অ্যাটম বোমার চেয়ে প্রতিনিয়ত যে আরও আধুনিক মারণাস্ত্র আসছে; মানব জাতি জেনে-শুনেও তা বন্ধ করছে না। মহাকাশ বাণিজ্য দিন দিন ব্যাপক আকার ধারণ করছে। শিগগিরই হয়তো মানুষ মঙ্গলে যাতায়াত শুরু করবে এবং বিপুল অর্থের অপচয় করবে। এবার করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময় বোঝা গেল মানুষের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কত অল্প গবেষণা হচ্ছে, কত অল্প খরচ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, মারণাস্ত্র এবং মহাকাশ চর্চায় কী পরিমাণে অর্থ ব্যয় হচ্ছে। আবার এই করোনার কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছে; তাতে আবারও মার্ক জাকারবার্গের অর্থের ঝুলি ক্রমাগত স্ম্ফীত হচ্ছে।
একদা ইথার তরঙ্গের মাধ্যমে বেতারের আবিস্কার হয়েছিল। সেই আবিস্কার মানুষের জীবনযাপনকে দ্রুততর ও কল্যাণকর করেছে। সেই পথ ধরে প্রযুক্তি বিদ্যায় যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের সংকেত। এত দ্রুত সেই সংকেতের উন্নয়ন হতে থাকে, এখন তা প্রায় মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কখনও মানুষ একটি রোবট আবিস্কার করতে চাচ্ছে, কিন্তু রোবটটা এক সময় মানুষকে আর মানতে চাচ্ছে না। স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন রোবট তাই মানববিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে। ফেসবুকের অপব্যবহার রোধ করারও কোনো উপায় নেই। যদিও অনেক দেশে ফেসবুক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানেও প্রশ্ন ওঠে- মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
জাকারবার্গ অনেক বুদ্ধিমান মানুষ, যদিও বুদ্ধিমান মানুষরাই পৃথিবীর অনেক ধ্বংসাত্মক কাজ করে থাকে। যেমন অ্যাটম বোমা কোনো নির্বোধ লোক আবিস্কার করেননি। জাকারবার্গকে সেই পথ খোঁজার চেষ্টা করতে হবে, যেখানে ফেসবুকে এসব ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞরা রাতদিন চেষ্টারত দুস্কৃতকারীর পরিচয় জানতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা জানতে পারেন না। জানতে পারেন না শুধু; ভুল তথ্য পেয়ে থাকেন। সে কারণে আদিম তদন্ত পদ্ধতিকেই কাজে লাগাতে হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া পূজামণ্ডপের তাণ্ডবের ব্যাপারে বিচারিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিচারকরা সরেজমিন উপস্থিত হয়ে বিষয়গুলো দেখবেন- এভাবে কত তদন্ত করা সম্ভব? আসল কথা হচ্ছে, আমাদের দৃষ্টির অজান্তে একটা অলীক পৃথিবী গড়ে উঠেছে, যা একটা কল্যাণকর সমাজ নির্মাণের পরিপন্থি। তবুও প্রশ্নটি উত্থাপন করা হলো, কারণ বিষয়টি গুরুতর।
নাট্যব্যক্তিত্ব
- বিষয় :
- সমাজ
- মামুনুর রশীদ