ভিন্নমত-বাক্স্বাধীনতা দমনে সাইবার আইন সংশোধন করতে চায় সরকার
সেমিনারে জামায়াতের অভিযোগ
জাতীয় প্রেসক্লাবে জামায়াতের তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগ আয়োজিত ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬: নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ নাকি বাকস্বাধীনতা দমন?’ শীর্ষক সেমিনার
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৩৯ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৪৫
ভিন্নমত ও বাক্স্বাধীনতা দমনে সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘জনগণের রায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতায় বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন। সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধন করে কালাকানুন রাজনীতিক আর সাংবাদিকদের ওপর চাপিয়ে দিতে চান, তাহলে হয়তো এটাই হবে অনিবার্য পরিণতির নতুন মাত্রা।’ সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬: নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ নাকি বাকস্বাধীনতা দমন?’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেছেন তিনি। জামায়াতের তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগ এ সেমিনার আয়োজন করে।
সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের প্রধান রফিকুজজামান রুমান। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ডিজাটাল নিরাপত্তা আইনে শেখ মুজিবুর রহমানকে অবমাননা, মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন শাস্তিযোগ্য অপরাধ ছিল। কুখ্যাত এই আইনের এসব ধারায় সেই সময়কার বিরোধীদলের নেতাকর্মীরা মামলার আসামি হন। দেশে-বিদেশে সমালোচনার মুখে শেখ হাসিনা সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে ২০২৩ সালে সাইবার নিরাপত্তা আইন করেছিল। এই আইনেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীদের কটূক্তি করার অভিযোগে বহু মামলা হয়।
প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে। তা বিএনপি গত এপ্রিলে আইনের রূপান্তর করে। তবে ‘বাকশালীনতা’ রক্ষায় পাঁচ মাসের মাথায় সরকার আইনটি সংশোধন করতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ আমলের মতোই মানহানি, হেয়প্রতিপন্নকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে যুক্ত করতে যাচ্ছে। এতে আবারও হয়রানি, নিপীড়নের পথ খুলবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে প্রবন্ধে।
আইনের সংশোধনীর খসড়া নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের মানহানি হলে কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সরকারকে। কিন্তু রাষ্ট্রের মানহানি কী করলে হবে তা বলা নেই। ফলে সরকারের বিরুদ্ধে যে কোনো সমালোচনাকে রাষ্ট্রের জন্য মানহানিকর আখ্যা দিয়ে কনটেন্ট ব্লক করা হবে।
গুজব, অপতথ্যের ব্যাখ্যা স্পষ্ট করার দাবি
আইনের খসড়ায় মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন, গুজব, অপতথ্য, বুলিং এর যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত। প্রবন্ধে বলা হয়েছে, এগুলো অস্পষ্ট। ফলে যে কোনো আইনের অপব্যবহার হতে পারে। একজন ব্যাংক লুটেরাকে লুটেরা বললে, তিনি এর বিরুদ্বে মামলা করতে পারবেন- আইনের খসড়াটি পাস হলে। সাংবাদিকতা চাপের মুখে পড়বে।
বিদ্যমান আইন বহাল রাখার দাবি জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘চার-পাঁচ মাসে এমন কী হলো যে, সাইবার আইন সংশোধনে সরকার অস্থির হয়ে গেল? আসলে তাদেরকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভুতে ধরেছে। যা ইচ্ছা তাই বলবে এবং আইন বদলাবে, জনগণের রায় মানবে না।’
জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, ‘মেজরিটির জোরে অতীতের অনেক সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়েছিল। তাদের পরিণতি বর্তমান সরকার ভুলে গেছে। মেজরিটির জোরে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী হেবা আইনকে পরিবর্তন করল, গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষের রায় বাতিল করতে চেষ্টা করছে’।
মিস-ইনফরমেশন-ডিজইফরমেশনের ব্যাখ্যা ব্যাপকভাবে নেই
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সাইবার সুরক্ষা আইনে মানহানি, গুজব, অসত্য, তল্লাশি, জব্দ এসব পরিভাষার যে ব্যাখ্যার মধ্যে রহস্য রাখা হয়েছে, এগুলো দিয়েই তো সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাদের আটকানো হবে। গুজবের কী ব্যাখ্যা? অপতথ্য, মিস-ইনফরমেশন-ডিজইফরমেশন এগুলোর ব্যাখ্যা ব্যাপকভাবে নেই। কারণ কী? শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে এগুলো হাতে রাখা হয়েছে, যা দিয়ে বিরোধী দলকে ধরা যায়।’
অস্পষ্টতা থাকলে অপব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন গোলাম পরওয়ার। আইন প্রয়োগের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না, কে প্রয়োগ করছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ‘ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিন’ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শাসকের চরিত্র যদি কর্তৃত্ববাদী হয়, তাহলে আইনকে অপব্যাখ্যা, অপব্যবহার ও ভুল প্রয়োগের মাধ্যমে নিরপরাধ মানুষকেও শাস্তি দেওয়া সম্ভব।
সেমিনারে বক্তৃতা করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, নির্বাহী পরিষদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও নাজমুন্নাহার নীলু এমপি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, আমার দেশের যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ, ডিইউজের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, এনটিভির হেড অব নিউজ ফখরুল আলম কাঞ্চন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ, ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ প্রমুখ।