যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বাংলাদেশি শিক্ষক
বুয়েটের মেধাবী তৌহিদুল
.
গল্প শুনেছেন আশিক মুস্তাফা
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ | ২৩:৪৩ | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ | ১৩:৪৯
তৌহিদুল ইসলাম। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রাক্তন এ শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য বিদ্যাপীঠ ও বিশ্বখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। শুধু তাই নয়; স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫ সালে তৌহিদুলের অধীনে চালু হবে নতুন ল্যাব। সেখানে নেওয়া হবে পিএইচডি স্টুডেন্ট ও পোস্টডকদের। তারুণ্যে ভরপুর এ স্বপ্নবাজের স্বপ্ন ছোঁয়ার গল্প শুনেছেন আশিক মুস্তাফা

কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং অনুসারে পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রথম ১০-এর মধ্যে কয়েক বছর ধরেই নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখেন পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মেধাবী শিক্ষার্থী। অথচ এখানে না পড়েও অসাধারণ ফল এবং গবেষণার জন্য সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মো. তৌহিদুল ইসলাম। শুধু তাই নয়, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫ সালে তৌহিদুলের অধীনে চালু হবে নতুন ল্যাব। যেখানে বেশ কয়েকজন পিএইচডি স্টুডেন্ট ও পোস্টডক নেওয়া হবে; যারা মেডিকেল ডেটা বিশ্লেষণ, রোগ নির্ণয়, মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং বা পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করেন, তারাই কেবল তৌহিদুলের ল্যাবের জন্য উপযুক্ত।
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
তৌহিদুলের জন্ম পাবনা জেলার সরিষা গ্রামে। বেড়ে ওঠা রাজশাহীর চারঘাটে। তিন ভাই ও এক বোন তাঁর। বাবা মো. হাবিবুর রহমান ছিলেন প্রকৌশলী। ছোট ভাইয়ের জন্মের পর মা সালেহা হাবিব অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ কারণে প্রায় দুই বছর বয়সে তৌহিদুল দাদির কাছে চলে যান। শৈশব ও দাদির স্মৃতিচারণ করে তৌহিদুল বলেন, ‘এখনও মনে পড়ে, রাতে দাদি আমাকে গল্প শোনাচ্ছেন আর টিনের চালে ঝুমঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। এটাই আমার শৈশবের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি। দাদি ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে মারা যান। এরপর আমার ফুপু আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যান রাজশাহীর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী ছোট্ট মফস্বল শহর চারঘাটে। আমার শৈশব সেখানে কেটেছে। জীবনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন আমার ফুপা। তিনি পল্লী বিদ্যুতে একটি মাঝারি চাকরি করতেন, কিন্তু প্রচুর পড়াশোনা করতেন। ফুপা বলতেন, ‘তুমি পারবে এবং সর্বোচ্চ উচ্চতায় তোমাকে পৌঁছাতেই হবে।’ তিনি আরও বলতেন, ‘টাকা-পয়সা জীবনে খুব বেশি প্রয়োজন হয় না, তাই জ্ঞানের পেছনে ছুটতে হবে।’
গ্রাম আর প্রকৃতির পাঠশালা
তৌহিদুল ইসলাম তাঁর পাঠশালার গল্প করতে গিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। বলেন, “গাছপালায় ঘেরা অসম্ভব সুন্দর মনের মানুষের শহর চারঘাট আর সারদা। আমি নার্সারি থেকে ক্লাস টু পর্যন্ত পড়েছি চারঘাটের একটি কিন্ডারগার্টেনে। পাশেই সারদা পাইলট স্কুল। সেখানে পড়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্ডারগার্টেন থেকে ফুপা মাঝে মধ্যে পাইলট স্কুলের মাঠে নিয়ে যেতেন। আমার জীবনে সবচাইতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব রেখেছে সম্ভবত সারদা সরকারি পাইলট স্কুল। এখানে ক্লাস থ্রি থেকে এসএসসি পর্যন্ত পড়েছি। শিক্ষকদের ভালোবাসায় আমার স্কুলের দিনগুলো ছিল প্রচণ্ড রঙিন। স্কুলে কবিতা আবৃত্তি, রচনা প্রতিযোগিতা ও উপস্থিত বক্তৃতায় অংশ নিতাম। ছিলাম ক্লাস ক্যাপ্টেন। এসএসসি পরীক্ষার পর নটর ডেম কলেজে ভর্তি হই। আমার বাবার খুব ইচ্ছা ছিল যেন ডাক্তার হই, কিন্তু ফুপু-ফুপা বলতেন, ‘তোমার যা করতে ভালো লাগে তা-ই করো।’ তবে ছোটবেলা থেকে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নও দেখতাম। তো নটর ডেম শেষ করে বুয়েটে ভর্তি হয়ে বিষয় নির্বাচন করি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। এ বিষয় নেওয়ার মূল কারণ বাবা। আমার বাবাও ছিলেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং তাঁর দুর্দান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান আমাকে মুগ্ধ করত।”
বুয়েট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার স্বপ্নও দেখতেন তৌহিদুল। সেই স্বপ্ন পূরণে তাঁকে গবেষণা শেখানোয় বিশেষ অবদান রাখেন বুয়েটের বেশ কয়েকজন শিক্ষক। তৌহিদুল বলেন, ‘বুয়েটের মোহাম্মদ কামরুল হাসান স্যার ও সেলিয়া শাহনাজ ম্যাডামের কাছে গবেষণার হাতেখড়ি। বুয়েট থেকে ৩.৮২ সিজিপিএ নিয়ে পাস করার পর সেলিয়া শাহনাজ ম্যাডামের অনুপ্রেরণায় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য আবেদন করি এবং স্কলারশিপসহ ২০১৪ সালে পড়তে যাই। আমার পিএইচডি ছিল ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। গবেষণার বিষয় ছিল মেডিকেল ইমেজ অ্যানালাইসিস এবং ক্যান্সার নির্ণয় ও চিকিৎসায় আলট্রাসাউন্ডের ব্যবহার।’
বর্তমান ব্যস্ততা ও গবেষণায় অর্জন
চিকিৎসা ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বর্তমানে গবেষণা করছেন তৌহিদুল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কীভাবে আগে থেকে হৃদরোগ, মস্তিষ্কের রোগ ও ক্যান্সার নির্ণয় করা যায়, সেসব বিষয় নিয়ে কাজ করছেন তিনি। কী ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করে ক্যান্সার রোগীদের জীবনমান ভালো করা যায় এবং চিকিৎসায় সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়, এটিও তাঁর গবেষণার একটি বিষয়। এখন পর্যন্ত ৪৪টি পিয়ার রিভিউড জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে পিএইচডিতে ২২টি প্রবন্ধ রয়েছে। গবেষণার জন্য ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ-এর সম্মানজনক কে৯৯/আর০০ পাথওয়ে টু ইন্ডিপেনডেন্স অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
যারা পড়তে চান স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে
তৌহিদুল ইসলামের মতো যেসব তরুণ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখেন তাদের উদ্দেশে তৌহিদুল বলেন, ‘স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পিএইচডি ও মাস্টার্স করতে ইচ্ছুক, তাদের টোফেল ও জিআরইতে ভালো স্কোর তুলতে হবে। এ ছাড়া স্নাতক পর্যায়ের সিজিপিএ বেশি থাকতে হবে। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স, বায়োমেডিকেল ডেটা সায়েন্স ও বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থীরা যদি স্ট্যানফোর্ডে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে চান, যে কোনো পরামর্শের জন্য আমাকে ই-মেইল করতে পারেন-tauhid@stanford.edu।’
আগামীর স্বপ্ন
আগামীর স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আগামীতে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মানুষের জীবনযাত্রা এবং স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটাতে চাই। এছাড়াও দেশের মানবসম্পদ, বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠীকে আইটি খাতে পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। আইটি খাতে সরকারের মনোযোগী হওয়া উচিত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এক বিপ্লবী প্রযুক্তি, যার ওপর আমেরিকা ট্রিলিয়ন
ডলারের ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশেও এমন ইন্ডাস্ট্রি এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সনির্ভর স্টার্টআপ এনভায়রনমেন্ট তৈরি সম্ভব। এসব ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ এবং তা নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করতে চাই। আর দেশের তরুণদের যে কোনো প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াতে চাই!’
- বিষয় :
- বুয়েট