দশ যুব সংগঠনের বৈশ্বিক স্বীকৃতি
‘ইয়ুথ–লিড ক্লাইমেট অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’-এ স্বীকৃতি পাওয়া ১০ যুব সংগঠনের জলবায়ুযোদ্ধারা... ছবি: ভিএসও
সোহানুর রহমান
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
নোনাজলে বদলে যাচ্ছে উপকূলের জীবন। উত্তরের তাপ ও খরায় ঝুঁকিতে কৃষি। হাওরে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় অনিশ্চিত ফসল ও জীবিকা। সেই ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে নিজেদের এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খুঁজছেন তরুণরা। এই স্থানীয় উদ্যোগগুলোর স্বীকৃতি হিসেবে যুব নেতৃত্বাধীন জলবায়ু পুরস্কার ২০২৬ পেয়েছে ১০টি সংগঠন। তাদের কার্যক্রম নিয়ে লিখেছেন সোহানুর রহমান
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ একেবারে সম্মুখসারিতে। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ০.৫% এরও কম হলেও ঋতুবৈচিত্র্য, ভৌগোলিক অবস্থান, নিম্ন বদ্বীপ অঞ্চল এবং ঘনবসতির কারণে দেশটি জলবায়ু সংকটের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অঞ্চলভেদে আলাদা। স্থানীয় তরুণ সংগঠনগুলো মানুষের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সমাধানমুখী উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার স্বীকৃতি
সেই স্থানীয় নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ভলান্টারি সার্ভিস ওভারসিজ–ভিএসও বাংলাদেশ আয়োজন করেছে যুব নেতৃত্বাধীন জলবায়ু পুরস্কার ২০২৬। ১৫ সেপ্টেম্বর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১০টি যুব সংগঠনকে সম্মাননা দেওয়া হয়। নির্বাচিত সংগঠনগুলো স্থানীয়ভাবে পরিকল্পিত জলবায়ু উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য অনুদান সহায়তা পাচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘স্পার্ক দ্য চেঞ্জ, লিড দ্য ক্লাইমেট ফিউচার।’
নোনাজল আর সুপেয় জলের টান
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। লবণাক্ততা বাড়লে কৃষি ব্যাহত হয়। অনেক এলাকায় সুপেয় পানির সংকটও তীব্র হয়। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বসতি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্যোগ ও নদীভাঙনে ঘর-বাড়ি হারিয়ে, জীবিকা হারিয়ে বাস্তুচ্যুতি বেছে নেয় স্থানীয়রা। এই বাস্তবতায় ২০১৭ সাল থেকে কাজ করছে খুলনার আপস যুব সংগঠন। জলবায়ু ক্যাম্প, বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে সচেতনতা, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে তারা তরুণদের যুক্ত করছে। উপকূলীয় মানুষের জন্য পানীয় জল, জীবিকা ও জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়গুলোও তাদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা রেদওয়ানুল রুহান বলেন, ‘এই পুরস্কার শুধু সম্মাননা নয়। স্থানীয় পর্যায়ে তরুণদের নেতৃত্বে জলবায়ু মোকাবিলার উদ্যোগেরও স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতি আরও কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ নিতে উৎসাহ দেবে।’
সংগঠনটির পরিচালক নাজমুস সাকিব বলেন, ‘জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষের পাশে থাকার পাশাপাশি আরও বেশি তরুণকে জলবায়ু নেতৃত্বে যুক্ত করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।’
শিকড়েই খোঁজ সহনশীলতার
উত্তরাঞ্চলে পানিব্যবস্থাপনা, খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশবান্ধব জীবিকার স্থানীয় উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০২৩ সালে যাত্রা শুরু করা দিনাজপুরের মুক্তচিন্তা যুবসেবা সংঘের পুরস্কারপ্রাপ্ত উদ্যোগের নাম ‘শিকড় থেকে সহনশীলতা’। উদ্যোগটিতে পারিবারিক পুষ্টিবাগান, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও জৈব সার ব্যবহারের মতো কার্যক্রমকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পানি ও কৃষির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ মোকাবিলায় স্থানীয় সক্ষমতা বাড়াতে পারে। সংগঠনটির সভাপতি জিলহজ্জ সরকার বলেন, ‘স্থানীয়দের শুধু সহায়তার গ্রহীতা হিসেবে দেখলে হবে না। তাদের নিজেদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকেও সমাধানের অংশ করতে হবে।’ সংগঠনটির
সাধারণ সম্পাদক লাবনী দেবনাথ বলেন,
‘আমরা সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পরিবেশ ও জলবায়ু শিক্ষা নিয়ে কাজ করছি। মাশসাইকেল নামে মাশরুমভিত্তিক পরিবেশবান্ধব জীবিকার উদ্যোগও আছে আমাদের।’
দশ সংগঠন, দশ পথ
পুরস্কার পাওয়া অন্য সংগঠনগুলোর কাজের ক্ষেত্র এক নয়। খুলনার পূর্ণিমা সংগঠন তরুণদের জলবায়ু নেতৃত্ব ও পরিবেশ সচেতনতার উদ্যোগ পরিচালনা করছে। বরগুনার অগ্রগামী সংগঠন স্থানীয় জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করছে।
কক্সবাজারে উই ক্যান পোকখালী ইউনিয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে জলবায়ু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। জাগরণী ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনও স্থানীয় পর্যায়ে তরুণ নেতৃত্ব ও পরিবেশভিত্তিক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।
ময়মনসিংহের প্রতিজ্ঞা ইয়ুথ অর্গানাইজেশন পরিবেশ ও জেন্ডার এবং ঢাকার যুব পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থা তরুণদের জলবায়ু আন্দোলন ও অ্যাডভোকেসিতে সম্পৃক্ত করছে। পাবনার পল্লী একতা উন্নয়ন সংস্থা স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে কাজ করছে।
সব মিলিয়ে ১০টি সংগঠনের উদ্যোগে পানি, কৃষি, খাদ্য, জলাভূমি, পরিবেশ শিক্ষা ও স্থানীয় অংশগ্রহণের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
এই বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের জলবায়ু বাস্তবতার আঞ্চলিক পার্থক্যকে সামনে আনে। ভিএসও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর খবিরুল হক কামাল বলেন, ‘এই পুরস্কারের মাধ্যমে স্থানীয় নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন, তরুণ নেতৃত্ব ও স্বেচ্ছাসেবাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। জলবায়ু মোকাবিলায় স্থানীয় তরুণদের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের আরও যুক্ত করার লক্ষ্যও রয়েছে।’
স্থানীয় উদ্যোগ থেকে কপ সম্মেলনে
বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ করার লক্ষ্যও শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। জলবায়ু অঙ্গীকারের সাফল্য মাপা হবে মানুষের পানি, কৃষি, বসতি ও জীবিকার ওপর চাপ কতটা কমছে, সেখানেও। জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন–কপ প্রশমন, অর্থায়ন, অভিযোজন, ন্যায্য রূপান্তর ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা নিয়ে যে আলোচনা হয়, তার বাস্তব প্রয়োজন দেখা যায় স্থানীয় সমস্যাগুলোতে। উপকূলের সুপেয় পানি, উত্তরের কৃষি কিংবা হাওরের ফসল রক্ষার মতো বিষয়গুলো তাই বৈশ্বিক অঙ্গীকারের বাস্তব পরীক্ষার জায়গা। সহায়তা ও সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ের মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে।
জলবায়ুর জন্য তরুণদের নতুন পথ
উপকূল থেকে উত্তরবঙ্গ ও হাওর–দশটি যুব সংগঠনের কাজের পথ আলাদা। তাদের কাজ প্রমাণ করে, জলবায়ু সমাধানের বড় অংশ শুরু হয় মানুষের নিজের ঘর, জমি, পানি ও জীবিকার জায়গা থেকে। সেই স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে তরুণরা এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নতুন পথ তৈরি করছেন। ভবিষ্যতের জলবায়ু নেতৃত্ব তাই শুধু কপের মঞ্চে নয়, গড়ে উঠছে দেশের গ্রাম, উপকূল, পাহাড়, চর ও হাওরের মাঠে তরুণদের হাত ধরে। নীতিনির্ধারণে তরুণদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি যুব নেতৃত্বাধীন জলবায়ু আন্দোলন, উদ্ভাবনী প্রকল্প এবং সবুজ কর্মকাণ্ডে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু সংকটের কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই পৃথিবী বিনির্মাণে সবাইকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক: জলবায়ু সুবিচার কর্মী ও নির্বাহী সমন্বয়কারী, ইয়ুথনেট গ্লোবাল
- বিষয় :
- স্বীকৃতি