কথা বলার মঞ্চ চান ক্রিকেটাররা
দাবি দাওয়া নিয়ে সাকিবরা- ফাইল ছবি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৩:১২
ঝড়টা কি পূর্বাভাস ছাড়াই এসেছিল? নাকি পূর্বাভাসের মাত্রা ছাপিয়ে তার চেয়েও বেশি কিছু ছিল? অনেকটা সুনামির মতো, সুনীল সাগরের গভীর তলদেশের কোনো বিস্ম্ফোরণ, যার ঝাঁকুনিতে নড়ে গিয়েছিল বিসিবির ভিত! যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সামলে নেওয়া গেছে সেই সুনামি- তিনদিনের ব্ল্যাকআউটের পর আজ ফের মিরপুর ফিরছে তার চেনা ভুবনে। কিন্তু বিশ্বাস-অবিশ্বাসের একটা চোরা স্রোত যে রয়েই গেছে, তা হয়তো ক্যামেরার সামনে হাসিমুখের ছবিতে ধরা পড়বে না।
ক্রিকেটাররা কেন দাবিগুলো বিসিবির কাছে আগে পেশ করলেন না? কেন দাবি আদায়ের জন্য সময় বেঁধে না দিয়েই ধর্মঘটে গেলেন? কেন দুই দিন কেউ ফোন না ধরে যোগাযোগ করেননি? বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন হন্যে হয়ে। কিন্তু যারা কখনও তার মুখের ওপর কথা বলেননি, সেই মেহেদী হাসান মিরাজের মতো ক্রিকেটার কীভাবে বলবেন কঠিন সত্যটা। আর এই 'বলা'র জন্যই তারা একটা মুখপাত্র চান, ক্ষোভগুলো জমিয়ে না রেখে জানিয়ে দেওয়ার জন্যই তারা একটা মঞ্চ চান। আর সেই 'মঞ্চ' তৈরির জন্য সব ক্রিকেটারের মধ্যে যে ঐক্য রয়েছে- সেটি বিসিবিকে দেখিয়ে দেওয়ার জন্যই এই আন্দোলন করেছিলেন ক্রিকেটাররা। বিসিবির সব সিদ্ধান্ত ঢোক গিলে মেনে না নিয়ে প্রতিবাদ করতে হবে। কারও দয়াদাক্ষিণ্য নয়, নিজেদের প্রাপ্যটাই নিতে চান ক্রিকেটাররা- ভেতরের এমন একটি অনুভব থেকেই ছিল এই আন্দোলন।
সেখানে হয়তো প্রথাগত আন্দোলনের (আগে দাবি পেশ করা, তারপর সেটা না মানলে
ধর্মঘট) মতো সব কিছু ছিল না। শুধু আর্থিক সুবিধা বাড়ানো, কিংবা কিছু নিয়ম
বদলানোর জন্যই এই আন্দোলন ছিল না। এটা ছিল বিসিবিকে এই বার্তা দেওয়া যে-
ক্রিকেটাররা সবাই ঐক্যবদ্ধ। সে কারণেই গুলশানের হোটেলে প্রথম দিনের চেয়েও
বেশি ক্রিকেটারের উপস্থিতি ছিল। বিসিবিতেও কোনো প্রতিনিধি না পাঠিয়ে প্রায়
একশ' ক্রিকেটার হাজির হয়েছিলেন। এখানে বিসিবিপ্রধান 'ষড়যন্ত্র'র গন্ধ
পেয়েছেন; কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি তা প্রমাণ করতে পারেননি। তবে এটা ঠিক,
ক্রিকেটারদের এই আন্দোলনের পেছনে কিছু সমর্থক তো ছিলই। কিন্তু আন্দোলনের
রূপরেখা ঠিক করেছেন কিছু সিনিয়র ক্রিকেটারই। ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন একটা
অনুযোগ ছিল বহুদিন- জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা মিশতে পারেন না প্রথম শ্রেণির
ক্রিকেটারদের সঙ্গে। 'ওরা ভাই তারকা...' জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে
কখনও কখনও ড্রেসিংরুম শেয়ার করলেও আত্মিক টান ছিল না তেমন। সেই দূরত্বই এই
আন্দোলনে ঘুচে গেছে। আর পত্রিকায় আসা ক্রিকেটারদের সারিবদ্ধ ছবির পেছনে
দাঁড়ানো ওই ক্রিকেটারদের জন্যই হার্ডলাইনে আন্দোলনে যাওয়ার সবচেয়ে বেশি
তাগিদ অনুভব করেছে তারকা ক্রিকেটাররা। আন্দোলনে তাই প্রথম শ্রেণির
ক্রিকেটারদের স্বার্থ সংশ্নিষ্ট দাবিই ছিল বেশি। যেমন, জাতীয় লীগের ম্যাচ
ফি বাড়ানো (জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা এই লীগ বেশি খেলেন না), বিসিবির
চুক্তিতে থাকা ক্রিকেটারদের বেতন বাড়ানো (প্রায় ৭০ জন ক্রিকেটার রয়েছেন এই
তালিকায়), স্থানীয় যাতায়াত ভাতা বাড়ানো, টুর্নামেন্ট বেশি বাড়ানো- এই সব
দাবি পূরণ হলে জাতীয় দলের তারকাদের বাইরে ওই ৭০ জন ক্রিকেটারই বেশি উপকৃত
হবেন।
তাহলে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের দাবিগুলো কী? বিভ্রান্তিটা হচ্ছে ঠিক
এখানেই। বিসিবিপ্রধান নাজমুল হাসান পাপন আগ্রাসী ভঙ্গিতে সেদিন যে
সুযোগ-সুবিধার ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন, তা বেশিরভাগই জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের।
আর্থিকভাবে জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা যে সচ্ছল নন, তা বলা যাবে না। আন্দোলন
থেকে আর্থিক সুবিধা আরও না বাড়লেও তাদের খুব একটা ক্ষতি হবে না। তাদের
দাবিটা তো আসলে ভেতরের, তারা আত্মসম্মান চান। কারও দয়াদাক্ষিণ্য নয়, যে
পরিচালক কখনও ক্রিকেটই খেলেননি তার মুখ থেকে পারফরম্যান্সের বিশ্নেষণ শুনতে
নয়। কোনো সিরিজের মাঝেই ফর্মে না থাকা কোনো ক্রিকেটারকে নিয়ে
বিসিবিপ্রধানের আগ বাড়িয়ে মন্তব্য তাদের পছন্দ নয়। দল সাফল্য পেলেই কৃতিত্ব
বিসিবিপ্রধানের, আর হারলে 'ওরা পারছে না' শুনতে চান না কোনো ক্রিকেটার।
তাতে করে কখনও কখনও দলের সংহতিতেই আঘাত লাগে, ড্রেসিংরুমের পরিবেশেও সেই
ছেলেটা একলা হয়ে যায়, যাকে নিয়ে বিসিবিপ্রধান কথা বলেন। মনের এই না বলা
বিদ্রোহগুলো নিয়েই জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা এই আন্দোলনে প্রথম শ্রেণির
ক্রিকেটারদের সঙ্গে ছিলেন। ভালো হতো বিসিবিপ্রধানের পাশে থাকা পরিচালকরা
যদি তেরো দফার বাইরে ক্রিকেটারদের অলিখিত এই আরেকটি দফার ব্যাপারে তাকে
অবহিত করতেন।
বিসিবির স্বচ্ছতা, জবাবদিহির জন্য ক্রিকেটাররা যে মঞ্চ চাইছেন সেটা
ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)-এর সংস্কার।
সেখানে বোর্ডের সঙ্গে নেই এমন কেউই নেতৃত্ব দেবেন। ক্রিকেটারদের কথাগুলো
বলতে পারবেন বিসিবি সভাপতিকে। তাহলে হয়তো আর কখনও এভাবে আইনজীবী ভাড়া করে
মিডিয়ার সামনে দাবি পেশ করতে হবে না সাকিবদের। ভালো খবর এই যে, এবারের
জাতীয় লিগ শেষেই কোয়াবের একটি সংস্কার হতে চলেছে এবং সব শঙ্কা কাটিয়ে ভারত
সফরটা হচ্ছে।