ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিলেট বিএনপি

দুই বলয়ের বিরোধে নতুন মাত্রা, মেয়র প্রার্থী নিয়েও দূরত্ব

দুই বলয়ের বিরোধে নতুন মাত্রা, মেয়র প্রার্থী নিয়েও দূরত্ব
×

মুকিত রহমানী, সিলেট

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:২০ | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেটে বিএনপি মূলত দলের চেয়ারম্যানের দুই উপদেষ্টা বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলয়ে বিভক্ত। দীর্ঘদিন তাদের মধ্যে দূরত্ব চলছে। সেই দূরত্ব থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও পৃথক কর্মসূচি পালন করা হয়। সরকার পতনের পরও বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধে জড়ান দুই বলয়ের নেতারা।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, সিলেট বিএনপিতে এক সময় আরিফুল হক চৌধুরী বলয় শক্তিশালী হলেও গত কয়েক বছরে মুক্তাদির বলয় টপকে যায়। বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের অধিকাংশ কমিটিতে জায়গা করে নেন মুক্তাদির বলয়ের নেতাকর্মীরা। শীর্ষ এই দুই নেতার মধ্যে বিরোধ চললেও প্রকাশ্যে খুব একটা আসেনি। মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মধ্যে মাঝে মধ্যে এ বিরোধ প্রকাশ্যে রুপ নেয়।
২০২৫ সালের ৩০ মে নগর বিএনপি আয়োজিত জিয়াউর রহমানের শাহাদৎ বার্ষিকীর সভায় আরিফুল হক চৌধুরীকে একহাত নেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। বিষয়টি তখন সমালোচনার জন্ম দেয়। গত বছরের ১ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসনের সুস্থতা কামনায় নগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইনের উদ্যোগে এতিম শিশুদের মধ্যে খাবার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানের ব্যানারও খুলে নেওয়া হয়। সর্বশেষ সিলেটে রাষ্ট্রপতির নাগরিক সংবর্ধনায় নগর বিএনপি এবং দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতার অনুষ্ঠান বর্জন নিয়ে আলোচনায় আসে বিএনপি।

নগর বিএনপি একাধিক কারণ দেখিয়ে অনুষ্ঠান বর্জন করলেও দূরত্ব চলছে দীর্ঘদিন ধরে। সর্বশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর নগর বিএনপির কার্যালয় উদ্বোধন থেকে পুরাতন বিরোধ নতুন করে দেখা দেয়। ওই দিন বাণিজ্যমন্ত্রীর বাসায় কার্যালয় উদ্বোধনকালে নগর বিএনপির সহসভাপতি ও সিটি নির্বাচনের দলের মেয়র মনোনয়ন প্রত্যাশী রেজাউল হাসান লোদী দাওয়াত পাননি। এমনকি সিসিকের বর্তমান প্রশাসক ও আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ও আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমদ সিদ্দিকীসহ একাধিক নেতাকর্মী দাওয়াত পাননি। তাদের দাওয়াত না দেওয়াকে কেউ কেউ সিটি নির্বাচনের মহড়া হিসেবে দেখছেন। সেখান থেকে নতুন করে বিরোধের প্রভাব পড়ে সিটি করপোরেশন আয়োজিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নাগরিক সংবর্ধনায়। রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা আয়োজন করতে গিয়ে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী অনেকটা একক ক্ষমতা ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ উঠে। তিনি ইচ্ছে করে মেয়র পদে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীসহ একাধিক শীর্ষ নেতাদের দূরে রাখেন বলেও অভিযোগ করা হয়। ফলে গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির নাগরিক সংবর্ধনা বর্জন করেন তারা।

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির নাগরিক সংবর্ধনা সফল করতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুটি প্রস্তুত সভা করা হয়েছিল। প্রথম সভাটি ৮ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে করা হয়। পরের দিন আবার সার্কিট হাউসে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর উপস্থিতে সভা করা হয়। দুটি সভায় সংবর্ধনা সফলে নাগরিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু তা না করায় সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর ওপর ক্ষুব্ধ হন নগর বিএনপিসহ অনেক নেতাকর্মী। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রপতির বহরে দলের নেতাদের জন্য অনুমোদিত তিনটি গাড়ির মধ্যে দুই নম্বর গাড়িটির মাজার ও সার্কিট হাউসে প্রবেশের অনুমতি ছিল না। সেই গাড়িতে নগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী ছাড়াও ছিলেন দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. এনামুল হক, কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুর রাজ্জাক, সহসাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ সিদ্দিকী, কেন্দ্রীয় সদস্য ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, কেন্দ্রীয় সদস্য হাদিয়া চৌধুরী মুন্নী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালক বদরুজ্জামান সেলিম। এতে ক্ষুব্ধ হন এসব নেতারা। তৃতীয়ত আগামী সিসিক নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোয়নের পথ সুগম করতে সংবর্ধনা সভা এককভাবে সিসিক প্রশাসক করেছেন বলে অভিযোগ উঠে।
এ বিষয়ে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি (সিসিক প্রশাসক) নগর বিএনপিকে পাস কাটিয়ে সংবর্ধনা আয়োজন করেছেন কিনা 
তা তিনি ভালো জানেন। এটা স্পষ্ট যে, তিনি সমস্ত ক্রেডিট নিতে চেয়েছেন। আমরা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সব জায়গায় ছিলাম। কিন্তু অনুষ্ঠানে যাইনি। সে জন্য সার্কিট হাউসে দেখা করে আমরা দুঃখ প্রকাশ করেছি।
সূত্রমতে, আগামী সিসিক নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপি নেতাদের মধ্যে আলোচনায় আছেন বর্তমান প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ্ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাছিম হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সহসভাপতি ও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান। এদের মধ্যে অধিকাংশই বাণিজ্যমন্ত্রীর বলয়ের নেতা।

এ ছাড়া সিলেট বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেক দল ও ছাত্রদলের কমিটির নেতাকর্মীরাও দুই বলয়ে বিভক্ত। সিটি নির্বাচনসহ স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেট বিএনপিতে আরও প্রকাশ্যে বিরোধ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন নেতাকর্মীরা। এমনকি রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনার পর দিন জেলা ও নগর বিএনপির সাংগঠনিক সভায়ও বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতা বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে তুলে ধরেন।
নগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন রাষ্ট্রপতিকে সংবর্ধনা আয়োজনে একক ক্ষমতা দেখিয়েছেন প্রশাসক, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দলীয় নেতাদের বাদ দিয়ে সিসিকের কর্মচারী দিয়ে দাওয়াত কার্ড বিতরণ করেছেন। আমাদের বহনকারী গাড়ির অনুমতি থাকার পরও প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ বিষয়ে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতির নাগরিক সংবর্ধনা দলীয় কোনো বিষয় নয়। অনুষ্ঠানটিকে সর্বজনীন করতে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মানুষ ছিলেন। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন। তাদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দাওয়াত করা হয়েছে। নগর বিএনপির অনুষ্ঠান বর্জন বিষয়ে তিনি জানান, অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতাসহ সব পর্যায়ের নেতারা ছিলেন। কিছু নেতারা মনঃক্ষুণ্ন হয়ে আসেননি।

আরও পড়ুন

×