ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থান

বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থান

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ১৬:৪০ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৫:৫৩

ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্ব খাদ্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইফরি প্রতি বছর বিশ্বের প্রতিটি দেশে ক্ষুধা সূচক, হাঙ্গার ইনডেক্স, জিএইচআই প্রকাশ করে থাকে। এর মাধ্যমে দেশটির সামষ্টিক আয়ের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ক্ষুধা নিবারণে কতখানি অবদান রাখে, তার তথ্য জানা যায়। মনে রাখা ভালো, উন্নয়ন অগ্রগতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে জনকল্যাণ আর ক্ষুধা হ্রাসের মাঝে ঊর্ধ্বগামী কল্যাণ নিহিত থাকে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের জোরদার সামষ্টিক আয় বৃদ্ধির ফলে সামাজিক রূপান্তর ঘটেছে বলে নোবেল বিজয়ীদ্বয় অমর্ত্য সেন ও অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি এবং মাহবুবুল হকসহ অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছেন। সে পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্বিক সূচকের হালচাল দেখা যেতে পারে।
ইফরি জীবনধারণের কয়েকটি দিকের তথ্যে একটি দেশ কত নম্বর পায়, তার হিসাব করে। যেমন- ক. পুষ্টি ঘাটতি (পূর্ণ বয়স্কের মাথাপিছু দৈনিক কিলো ক্যালরিপ্রাপ্তি); খ. মরণশীলতা; গ. শিশুর অপুষ্টিতে বয়সের তুলনায় কম উচ্চতা তথা স্ট্যান্টিং; ঘ. তীব্র অপুষ্টিতে উচ্চতার তুলনায় ওজন কম হওয়া, ওয়েস্টিং (ভালোমতো অস্থিমজ্জা গঠিত না হওয়া)। সাধারণত মোট নম্বরে ক ও খ-তে এক-তৃতীয়াংশ করে গুরুত্ব (ওয়েইট) এবং গ ও ঘ-তে ছয় ভাগের এক ভাগ করে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেসব হিসাব-কিতাবে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের নম্বর এসেছে ২৫.৮ এবং বিবেচনাধীন ১১৭টি দেশের মধ্যে তুলনামূলকভাবে নিচের দিকে ৮৮৩তম স্থানে অবস্থান করছে। ১৭.১ নম্বর নিয়ে শ্রীলংকা ৬৬তম, নেপাল ২০.৮ নম্বর নিয়ে ৭৩তম, পাকিস্তান ২৮.৫ নম্বর নিয়ে ৯৪তম, ভারত ৩০.৬ নম্বর নিয়ে ১০২তম এবং আফগানিস্তান ৩৩.৯ নম্বর নিয়ে ১০৪তম অবস্থানে রয়েছে।
এখানে উল্লেখের দাবি রাখে, ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশ ক্রমাগতভাবে তার নম্বর হ্রাস করে র‌্যাংকিংয়ে ওপরে উঠে আসছে। দেশের নম্বর ১৯৯২ সালে ছিল ৫৩.৬, ক্রমান্বয়ে তা ২০০০ সালে ৩৬.১, ২০০৬ সালে ৩২.২, ২০১৬ সাল ২৭.৭, ২০১৮ সালে ২৬.৫ এবং ২০১৯ সালে ২৫.৮-এ নেমেছে। ইফরি উদ্ভাবিত সূচকে যে দেশের স্কোর বা নম্বর শূন্য, সে দেশ সম্পূর্ণ ক্ষুধামুক্ত। নম্বর ০৯ বা তার কম হলে ক্ষুধা সমস্যা নেই বলে ধরা হয়। নম্বর ১০ থেকে ১৯.৯ হলে ক্ষুধাপীড়িত, ২০-৩৪.৯ হলে তীব্র ক্ষুধাপীড়িত, ৩৫ থেকে ৪৯.৯ হলে দীর্ঘস্থায়ী তীব্র ক্ষুধাপীড়িত এবং ৫০-এর ঊর্ধ্বে হলে চরম ও বিপজ্জনক ক্ষুধার রাজ্য বলে ধরা হয়।
গত ১৬ অক্টোবর বুধবার বিবিসি লন্ডনের সকালবেলার সংবাদ ভাষ্যে বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক সম্পর্কিত ২০১৯ সালের তথ্য প্রচার করে। প্রচারকালেই সংবাদমাধ্যমটি আইসিডিডিআরবির নিবেদিতপ্রাণ গবেষক ও জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুলের পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক অধ্যাপক ডা. তাহমীদ আহমেদের মতামত জিজ্ঞেস করে। অধ্যাপক তাহমীদ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান যে তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছে, তা পুরোনো বলে অভিমত প্রকাশ করেন। তিনি জানান, হালনাগাদ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক পুনঃপ্রস্তুত করা হলে বাংলাদেশের নম্বর কমে র‌্যাংকিং যথেষ্ট ওপরে উঠবে বলে বিবিসিকে জোর দিয়ে বলেন অধ্যাপক তাহমীদ।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, দুটি বিবেচ্য বিষয়ে সাম্প্রতিক সময় বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ভালোভাবেই ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্বনন্দিত। শিশুমৃত্যু :জীবিত জন্ম নেওয়া এবং বয়স এক বছর পূর্ণ করার আগে মৃত্যুবরণকারী শিশুর সংখ্যা এখন হাজারে ২৯। আর পূর্ণ বয়স্ক এক ব্যক্তির দৈনিক ২১০০ কিলো ক্যালরি প্রদেয় খাদ্য কিনতে না পারা লোকের সংখ্যা বিপুলভাবে হ্রাস পেয়ে ২১ শতাংশে নেমে এসেছে। তাছাড়া বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ্‌ সার্ভিসেস, ২০১৮ অনুসারে স্ট্যান্টিং এখন ৩১ শতাংশ; যদিও বিবিসি পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে একে ৪০ শতাংশ বলে ইফরির বরাত দিয়ে প্রচার করেছে। অনুরূপভাবে ওয়েস্টিং এখন বাংলাদেশে ০৮ শতাংশে নেমে এসেছে, বিবিসি প্রচারিত ১৪ শতাংশ নয়। এসব হালনাগাদ তথ্য সংবলিত নতুন বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক তৈরি করা হলে বাংলাদেশের প্রাপ্ত নম্বর ২১-এ নেমে যাবে এবং র‌্যাংকিং হবে ৭০-এর মতো। এসব উন্নয়ন বিষয়ক ইতিবাচক বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে সামষ্টিক আয় প্রবৃদ্ধির সুফল কম ভাগ্যবানদের আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে চাপ বাড়ে। তবে সচেতন মহল, বিশেষ করে ভাগ্যবান শিক্ষিত সমাজ পুরোনো সূচক ব্যবহার করে বাংলাদেশের অবস্থান অবদমনের ভুল শুধরাতে সচেষ্ট হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী

আরও পড়ুন

×