সরকারের আসল অস্বস্তি যেখানে
রাজনীতি
জো বাইডেনের সঙ্গে তোলা সেলফি ঘিরে উচ্ছ্বাসের পর ওবায়দুল কাদেরের আরেকটি বক্তব্য নিয়ে ক’দিন আলোচনা হবে বোধ হয়। তাঁর ভাষায়, ‘তলে তলে আপস’ হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। আর এখানে ভূমিকা রেখেছে নয়াদিল্লি! একটি দলীয় সভায় খোলাখুলিই বলেছেন কথাগুলো।
বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি কোনো নির্বাচনে যায়নি, তা কিন্তু নয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তারা অংশ নিয়েছিল খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি পেয়ে। বাস্তবে প্রতিশ্রুতির বিপরীতটাই ঘটে বলে বিএনপি ও তার মিত্ররা তখন থেকে বলে আসছে। সেটি দেশের ‘নিকৃষ্টতম নির্বাচন’ বলেও ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। সরকার নিজেই বলছে, ওই রকম নির্বাচন আর হবে না। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনের কারণে বিএনপি ও তার মিত্রদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে সরকার। তারা বলছে, এ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচন নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনও তারা বর্জন করে চলেছে।
নির্বাচন তো করবে নির্বাচন কমিশন– এমনটা বলে সরকার সুবিধা করতে পারছে না। আইন করে কমিশনকে ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’ দেওয়া হয়েছে– এ কথায়ও কাজ হচ্ছে না। ২০১৪ সালের নির্বাচন যেমন তেমন; ২০১৮-এর নির্বাচন মাঠের বিরোধী দলের কাছে সরকারের যাবতীয় প্রতিশ্রুতিকে মূল্যহীন করে দিয়েছে। আগামী নির্বাচন নিয়ে নজিরবিহীন আগ্রহ দেখানো গণতান্ত্রিক বিশ্বসম্প্রদায়ও বর্তমান ব্যবস্থাপনায় সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে আস্থা রাখতে পারছে না। পারলে তো নির্বাচনের সাত-আট মাস আগে ঘোষিত যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতির প্রয়োগ এরই মধ্যে শুরু হয়ে যেত না। ইইউও জানিয়ে দিত না– নির্বাচনে ‘পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষক দল’ তারা পাঠাচ্ছে না। এমন সব নীতিগত অবস্থানের মধ্যে কার সঙ্গে কার সেলফি উঠল, সেটা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘তলে তলে আপস’ হয়ে যাওয়াটাও কষ্টকল্পনা। এসব বক্তব্য বরং সরকারের নড়বড়ে অবস্থানই নির্দেশ করে। দিনের শেষে এসব কথাবার্তা কর্মী-সমর্থকদের আদৌ উজ্জীবিত করে কিনা– সেটাও প্রশ্ন।
বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন ঘিরে যেভাবে ভিসা নীতি দেওয়া হয়েছে, তেমনটা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়া খুব কম দেশের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। সম্প্রতি লাইবেরিয়ায় নির্বাচনের মাসখানেক আগে ভিসা নীতি কার্যকরের কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইইউ সেখানে পর্যবেক্ষক পাঠাবে, কিন্তু বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে না। এর মানে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের চোখে বাংলাদেশ পরিস্থিতি লাইবেরিয়ার চেয়ে খারাপ। এখানকার নির্বাচনসংশ্লিষ্ট প্রশাসন লাইবেরিয়ার চেয়েও কম বিশ্বাসযোগ্য! ঘটনাটি ঘুরিয়েও দেখা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা হয়তো চাইছে, এখানে একটি মানসম্মত নির্বাচন হোক এবং জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার আসুক ক্ষমতায়। হয়তো সে লক্ষ্যেই এত তোড়জোড় তাদের। এদিকে বিএনপি ও তার মিত্ররা অনেক দিন ধরেই চাইছে দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। কিন্তু সে দাবি আদায়ে আন্দোলন জমাতে পারছে না। অভিজ্ঞতার জোরে সরকারও মনে করছে, শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপর তেমন চাপ সৃষ্টিতে তারা ব্যর্থ হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অতীতে একই দাবি আদায়ে বিএনপি সরকারের ওপর আন্দোলনের চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছিল। শেষে জনপ্রশাসনের একাংশও তাদের সঙ্গে এসে রাজপথে অবস্থান নিলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তবে গত প্রায় ১৫ বছরে গোটা প্রশাসনকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, ক্ষমতাসীনদের বিশ্বাস– আগেকার মতো করে কিছু আর ঘটবে না। বিএনপি ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সব কিছু সরকার একেবারে গুছিয়ে রেখেছে। এতটা গুছিয়ে রাখার সুযোগ কোনো সরকারই পায়নি।

এ অবস্থায় কেউ কেউ এমনও বলছে, নজিরবিহীন দলীয়করণের শিকার প্রশাসন দিয়ে তিন মাসের দলনিরপেক্ষ সরকারও কি পারবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে? এটাও বলা হচ্ছে, দলনিরপেক্ষ সরকার নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব নিলে ঠিকই ‘কেবলা পরিবর্তন’ হয়ে যাবে প্রশাসনের। তবে টানা তিন মেয়াদে দলীয় সরকারের ক্ষমতা চর্চার পর পরিস্থিতি নিশ্চয় অনেকখানি ভিন্ন। এ যুক্তিতে অনেকে আবার যেভাবেই হোক, নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে প্রশাসনসহ রাষ্ট্রব্যবস্থার জরুরি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন। এটা করা গেলে সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু নয়; নির্বাচনের পর সুশাসনের সম্ভাবনাও বাড়বে বলে তাদের ধারণা। ২০১৮ সালের নির্বাচনটা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্পন্ন হলে এত জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি আদৌ হতো না। সেটি নাকি ছিল ‘আসন সমঝোতার নির্বাচন’। এক বর্ষীয়ান রাজনীতিকের নেতৃত্বে ওই নির্বাচনে আসা বিএনপি ও তার মিত্রদের উল্লেখযোগ্য আসনে জিততে দিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের দিকে যাওয়ার একটা বন্দোবস্ত নাকি হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল, সরকার তার মিত্র জাতীয় পার্টিকে সংসদে প্রধান বিরোধী দল করে আনে। এটা কীভাবে ঘটেছিল, তা হয়তো ভবিষ্যতে জানা যাবে। তবে ওই নির্বাচনের ভেতর দিয়ে যে সমূহ ক্ষতি হয়ে গেছে, সেটা তো আর মুছে ফেলা যাবে না। এর ভেতর দিয়ে দেশে একটি ‘কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা’ গড়ে উঠেছে, যা বিএনপি বাদে অন্যান্য বিরোধী পক্ষকেও মাঠে দাঁড়াতে দেয়নি। এ ধারাতেই সরকারপক্ষীয়রা বয়ান তৈরি করেছে, বর্তমান সরকারের কোনো ‘বিকল্প নেই’।
বিকল্প আছে কি নেই, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তো জনগণের। সেই অধিকার প্রয়োগের ন্যূনতম সুযোগ করে দেওয়ার দাবি এবার জোরদার। গণতান্ত্রিক বিশ্বসম্প্রদায়ও এটা প্রবলভাবে সামনে এনেছে। ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ বলে তাদের বক্তব্য এড়ানোও যাচ্ছে না। বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যুও সামনে এনেছে তারা। মানবাধিকার ও ভোটাধিকার সমুন্নত রাখায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ বটে। আর সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্র বিকাশে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ভূমিকা বরাবরই ছিল এ দেশে। বিশেষত বিরোধী দলগুলো একে সবসময় স্বাগত জানিয়েছে। এখন হঠাৎ এর তীব্র বিরোধিতা সহজ নয়। দেশের সিংহভাগ মানুষ তাদের নির্বাচনবিষয়ক ভূমিকায় উৎসাহিত বোধ করলে তা উপেক্ষা করাও কঠিন। সে কারণে সরকার আশা করে এবং সুযোগ পেলেই দেখাতে চায়, পশ্চিমাদের তেমন কোনো চাপ নেই তাদের ওপর। ‘ভুল বোঝাবুঝি’ থাকলেও তা মিটে গেছে! বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন ঘিরে পশ্চিমা অবস্থানকে তাদের ‘ব্যবসা পাওয়ার বাহানা’ বলেও বর্ণনা করা হচ্ছিল। কিন্তু এটা বাস্তবে তাদের সুচিন্তিত অবস্থান, যা কিছু ব্যবসা দিয়ে বিনিময়যোগ্য নয়। এখানে একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার এলে তার সঙ্গে কাজ করতে সুবিধা হবে এবং এটা হবে এ অঞ্চলে তাদের নিরাপত্তা জোরদারেরও অংশ– এ উপলব্ধি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের চালিত করছে। এটা সরকারের জন্য প্রধান বাধা বটে। সরকারের অস্বস্তিটা ওখানেই। হাসান মামুন: সাংবাদিক, বিশ্লেষক
