ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনৈতিক ও জাতিগত বিভাজনের ভাষা উর্দু

রাজনৈতিক ও জাতিগত বিভাজনের ভাষা উর্দু

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৭:০৩ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৫:৫৩

ভাষা আন্দোলন বললে সাধারণভাবে ১৯৪৮ থেকে '৫২ সালের ঘটনাবলিই আমাদের সামনে চলে আসে। যদিও ভাষাবিষয়ক বিতর্ক আরও পূর্ব থেকেই চলে আসছিল। অথচ ভাষার রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা খুব একটা ওয়াকিবহাল নই। উর্দু ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে জানলে ভাষার রাজনীতির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পরিস্কার চিত্র পাওয়া যাবে।
একাদশ শতকের প্রথমার্ধে পারস্য থেকে আগত ফার্সিভাষী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সংযোগের মধ্য দিয়ে কথ্য ভাষা হিসেবে উর্দু ভাষার বিকাশ শুরু হয়। বিশেষ করে উভয় ভাষাভাষী অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী ভাবের আদান-প্রদান করার জন্য 'ডায়ালেক্ট' হিসেবে এই ভাষার প্রচলন শুরু করেন। পরবর্তীকালে মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যেসব সুফি-সাধক ধর্ম প্রচার করতে এসেছিলেন তাঁরাও লক্ষ্য করলেন যে, ভারতবর্ষের হিন্দিভাষী সাধারণ মানুষের কাছে উর্দু ভাষা বোধগম্য। কেননা উর্দু ভাষার শব্দভাণ্ডারের মূল উৎস হলো হিন্দি আর ফার্সি। এ ছাড়াও আরবি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচ শব্দও উর্দু ভাষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য হওয়ায় সুফি-সাধকগণ ধর্ম প্রচারের মাধ্যম হিসেবে উর্দু ভাষাকে বেছে নিয়েছিলেন। উর্দু ভাষা বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে 'রেখতি' নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে এর নাম হয় উর্দু। মোঙ্গলদের মাধ্যমে তাতার ভাষার 'উর্দু' শব্দ কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে বিভিন্ন ভাষার শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছে। যেমন তার্কিশ ভাষায় এর উচ্চারণ হয় 'ওর্দু', ইংরেজিতে কিছুটা বিকৃত হয়ে 'হর্দে' উচ্চারিত হয়। উর্দু শব্দের অর্থ হলো রাজকীয় শিবির। সাধারণ মানুষের ভাষা হিসেবে একাদশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে উর্দুর বিকাশ শুরু হলেও মোগল আমলে এই ভাষা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। মোগল সম্রাট আকবরের সময় সেনাবাহিনীর সদস্যরা উর্দু ভাষাকে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের (লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা) মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিল। মোগল সেনাবাহিনীর সদস্য এবং তাদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়। মোগল সম্রাট শাহজাহানের সময়ে সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে এটি আরও জনপ্রিয়তা পায়। এছাড়া সুফি-সাধকদের মাধ্যমে এটি ধর্ম প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হয়। এতদসত্ত্বেও মোগল আমলে ফার্সিই ছিল রাষ্ট্রের
দাপ্তরিক ভাষা। তবে সাধারণ মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম বা 'লিঙ্গুয়া-ফ্রাঙ্গার' মর্যাদা কোনো ভাষাই
লাভ করেনি।
দীর্ঘ ছয়শ' বছর ফার্সি রাজভাষার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিল বলে এটি ভারতের সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গিয়েছিল। ফার্সি ভারতে মুসলিম শাসনামলে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহ্নত হওয়ার মাধ্যমে এই ভাষা ভারতের হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ভাষিক বন্ধনে আবদ্ধ করতে সক্ষম হয়। সুলতানি আমল থেকে মোগল আমল পর্যন্ত মুসলিম শাসনামলে ভারতীয়দের মনস্তত্ত্বে ধর্মীয় বিভেদের নজির খুব একটা নেই। পদস্থ হিন্দু রাজকর্মচারীরাও ফার্সি ভাষা শিখতেন। এই ভাষা হিন্দু-মুসলিমদের মিলনের একটি মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয়েছিল। দীর্ঘ মুসলিম শাসনামলে ফার্সি ভাষা হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। এই ভাষাকে দুর্বল করার মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিমদের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে বিনষ্ট করার লক্ষ্যে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে ভাষাভিত্তিক বিভেদের বীজ বপন করেন। ব্রিটিশরা 'ভাগ কর, শাসন কর' নীতি বাস্তবায়নের জন্য ভারতীয়দের মধ্যে ভাষাভিত্তিক ঐক্যে কৌশলে চিড় ধরিয়ে দিলেন। ব্রিটিশরা ভারতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যেসব উপায় অবলম্বন করেছিলেন, তার মধ্যে ভাষাভিত্তিক বিভক্তকরণ কৌশল ছিল অন্যতম। এ ছাড়া তাদের অন্য আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, ফার্সির গুরুত্ব কমিয়ে দিয়ে ইংরেজি ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার পথ সুগম করা। ভারতীয়দের মননে ভাষাভিত্তিক রাজনৈতিক চিন্তার অনুপ্রবেশ ঘটানোর বিষয়টি ইংরেজরা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ ছিল। ব্রিটিশ শাসকরা ১৮৩৩ সালে ফার্সির রাজভাষার মর্যাদা প্রত্যাহার করে নিলেন। এরপর উর্দু ভাষার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেলেও সেটিকে দাপ্তরিক ভাষা করা হয়নি। ইংরেজিকে দাপ্তরিক ভাষা করা হয় এবং শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি উর্দু ভাষাকেও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হয়। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে উর্দু ভাষাতত্ত্ব, ধ্বনিবিজ্ঞান ও শব্দতত্ত্ব নিয়ে প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক অধ্যয়ন শুরু হয়। ১৮৩৫ সালে দিল্লিতে উর্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে দিল্লি কলেজ নামে পরিচিতি পায়। এই কলেজের লেখাপড়ার মাধ্যম ছিল উর্দু। এ ছাড়াও ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় উত্তর ভারতের লক্ষেষ্টৗ, হায়দরাবাদ, গুজরাট প্রভৃতি অঞ্চলে উর্দু ভাষা ও সাহিত্যের অগ্রগতি সাধিত হয়। ইংরেজরা ভারতের মাটি থেকে ফার্সি ভাষাকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। এ জন্য উর্দুকে পৃষ্ঠপোষকতা করা তাদের পরিকল্পনার অংশ ছিল। ব্রিটিশদের ভাষানীতির ফলে অবচেতন মনে হিন্দুরা হিন্দি ভাষা এবং মুসলিমরা উর্দু ভাষাকে নিজস্ব ভাষা হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। এভাবে ইংরেজদের প্রচ্ছন্ন পৃষ্ঠপোষকতায় ভাষাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিভাজনের বিষবৃক্ষ ফলবতী হতে থাকে।
ব্রিটিশদের সূক্ষ্ণ রাজনৈতিক চালে উর্দু, ফার্সি ও হিন্দি ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে অবচেতনভাবেই ভাষাভিত্তিক স্বাতন্ত্র্য চেতনার জন্ম লাভ করে। অন্যদিকে তারা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ সৃষ্টির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক বিভক্তির বীজ বপন করে। ন্যাশনাল কংগ্রেস হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে এবং মুসলিম লীগ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করে। এই বিভক্তির পেছনে ব্রিটিশদের অদৃশ্য হাত ক্রিয়াশীল ছিল।
এই বিভক্তির পথ বেয়ে ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠীর সমর্থন এবং এর নৈতিক ও আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু পাকিস্তানিরা এই রাষ্ট্রের জন্মের অব্যবহিত পরেই ব্রিটিশদের দেখানো পথে এবার তারা ভাষাভিত্তিক বিভক্তির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিকে বিভক্ত করার নীতি গ্রহণ করলেন। এ ক্ষেত্রে তারা উর্দু ভাষার শরীরে ধর্মের চাদর পরালেন। অথচ আমরা পূর্বের আলোচনায় লক্ষ্য করেছি, উর্দু ভাষার সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। পাকিস্তানিরা লক্ষ্য করল যে, বাঙালির জাতিগত ঐক্যের মূল ভিত্তি হলো ভাষা। কাজেই উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে একক বাঙালি জাতিকে 'বাঙালি হিন্দু' ও 'বাঙালি মুসলিম' এই দুইভাগে বিভক্ত করা সম্ভব হতো। সম্ভব হলে পূর্ববাংলার সম্ভাব্য ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী উত্থান রোধ করা সম্ভব হতো। হিন্দু-মুসলিমদের নৃতাত্ত্বিক ঐক্যকে বিভক্ত করা গেলে বিভক্ত বাঙালিকে দাবিয়ে রাখা সহজ হতো। একেবারে সহজ হিসাব। এই উদ্দেশ্যে তারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রয়াস চালায়; অন্যদিকে বাংলা ভাষা সংস্কারের নামে বাংলা ভাষা থেকে সংস্কৃত শব্দকে বাদ দিয়ে আরবি ও উর্দু শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে 'পাক বাংলা' ভাষা সৃষ্টির প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। একই উদ্দেশ্যে আরবি হরফে বাংলা লেখার উদ্যোগও তারা গ্রহণ করে। ভাষাকে কেন্দ্র করে কৌশলী রাজনৈতিক চাল দিয়েছিল ব্রিটিশরা, সেটি কেউ বুঝতে পারেনি। কিন্তু পাকিস্তানিরা একই পথে হাঁটল কোনো রাখঢাক না করেই। বাংলাকে তারা হিন্দুয়ানি ভাষা হিসেবে আখ্যা দিল। ভাষাভিত্তিক বিভক্তির এই অপচেষ্টা সফল হলে পূর্ববাংলার জনগোষ্ঠী ব্রিটিশ-পরবর্তী দীর্ঘ পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের জালে আটকে যেত। বাঙালি ভাষাভিত্তিক সমৃদ্ধ কৃষ্টি ও সংস্কৃতি হারিয়ে হতোদ্যম জাতিতে পরিণত হতো। পাকিস্তানিদের সব পরিকল্পনা ঠিকই ছিল; কিন্তু হিসাবে একটু ভুল ছিল। কেননা বাঙালির নৃতাত্ত্বিক বন্ধন এত ঠুনকো ছিল না। বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা গড়ে উঠেছিল দীর্ঘ পথপরিক্রমায়। এই পরিচয় ছিল ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়েও প্রাচীন। এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর প্রথম পরিচয় হলো বাঙালি; অতঃপর তারা হিন্দু অথবা মুসলমান কিংবা বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান। ফলে মিথ্যা ধর্মীয় উন্মাদনা এ অঞ্চলের মানুষকে বিপথে চালিত করতে পারেনি।
সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
mrahimdu77@gmail.com

আরও পড়ুন

×