দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রান্তজন যেন ভেসে না যায়
লকডাউন
আমরা করোনা সংক্রমণের নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি থেকে আবার কেন বিস্ম্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতিতে পড়লাম; এর পেছনের কারণগুলো সচেতন মানুষমাত্রেই জানা। এত বিপর্যয়, সংক্রমণ, মৃত্যু- তার পরও আমাদের জনগোষ্ঠীর বৃহদাংশের মাঝে সচেতনতার ব্যাপারে বিস্ময়কর উদাসীনতা ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে অনীহা! যেখানে এমন চিত্র দৃশ্যমান, সেখানে পরিস্থিতির অবনতি ছাড়া উন্নতির আশা আমরা করি কীভাবে! করোনা প্রাণঘাতী; কিন্তু তা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব, যদি সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পদে পদে এর ব্যত্যয় ঘটেছে, ঘটছে এবং এর পরিণামেই নেমে এসেছে ফের বিপর্যয়। এর অভিঘাত নানা দিকে আরও যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গত বছরের ধাক্কাই তো এখনও আমরা সামলে উঠতে পারিনি।
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার এখনও করোনার প্রথম ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। প্রথম ধাক্কা সামলাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই শুধু নয়; নিম্ন-মধ্যবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তরাও সঞ্চয় ভেঙেছেন। অনেকের মাথায় চেপেছে ঋণের বোঝা। এর মধ্যেই ঘটতে শুরু করল গত মার্চের মতো এবারও মধ্য মার্চ থেকে ফের সংক্রমণের বিস্তার। যে সংক্রমণ ৫ শতাংশে নেমে এসেছিল, তা এখন ২০ শতাংশের ওপরে। জনস্বাস্থ্যবিদরা আশঙ্কা করছেন, মে মাস পর্যন্ত এ হার আরও বাড়তে পারে। এমতাবস্থায় সরকার এক সপ্তাহ ফের কঠোর লকডাউনের কথা ভাবছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ও করোনা সংক্রমণ কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্যরা অন্তত দুই সপ্তাহ পূর্ণ লকডাউনের সুপারিশ করেছেন। বিদ্যমান বাস্তবতায় এর বিকল্পও নেই। এ বাস্তবতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই শুধু নয়; সব শ্রেণির মানুষের কপালেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কীভাবে জীবনযাত্রা চলবে- এ প্রশ্নটিই এখন মুখ্য।
সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ খাবার, গৃহস্থালিসহ আনুষঙ্গিক প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাধ্য হয়ে ব্যয় করার ক্ষেত্রে একেবারে না পারলেই নয় এ অবস্থায় চলে এসেছেন। এ পরিস্থিতি চলছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিপদ তো আরও বেশি। এমনিতেই তাদের জীবন চলে না; আবার সর্বাত্মক লকডাউন তাদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের শামিল। সরকার করোনা দুর্যোগে নানা খাতে প্রণোদনা দিয়েছে, দিচ্ছে; কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য তেমন জোরালো কোনো কর্মসূচি চোখে পড়ছে না। গতবার লকডাউন পরিস্থিতিতে যখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছিল, তখন সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে তাদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু তা ছিল প্রয়োজনের নিরিখে নিতান্তই অপ্রতুল। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, খাদ্য বা পণ্যসামগ্রী বিতরণে যখন এলাকায় কোনো মহল তৎপরতা চালিয়েছে, তখন সে এলাকার প্রান্তিক লোকজন কাড়াকাড়ি করেছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদ তাদের এমন দিশেহারা করে তুলেছিল।
ওই অভিজ্ঞতার আলোকে ভাবলে বিস্ময় লাগে- এবার কী হবে? কারণ দীর্ঘদিনের চলমান করোনা-দুর্যোগে অসংখ্য মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এর মধ্যে নতুন এ অভিঘাত তাদের জন্য যে আরও ভয়াবহ হবে, তা সহজেই অনুমেয়। আমাদের অভিজ্ঞতায় এও আছে, বিপন্ন-বিপর্যস্ত মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা যথাযথভাবে ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছেনি। ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। মহামারির মতো দুর্যোগেও দুর্নীতিবাজ অসাধুরা তাদের উদরপূর্তিতে পিছিয়ে থাকেনি। দেখা গেছে, বিপদটা অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য একেবারে খাড়াখাড়িভাবে এসেছিল। এবার পরিস্থিতি এর চেয়েও খারাপ। এ অবস্থায় করণীয় কী- প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এ জন্য সামাজিক সহায়তা তহবিল গঠন করা যেতে পারে। আমাদের সমাজে বিত্তশালীর সংখ্যা কম নয়। এ সংখ্যা বিগত দু-তিন দশকে অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েছে। বাজেটে কালো টাকা সাদা করার উপায় রাখা হয়। এর মানে, সমাজে বিপুলসংখ্যক মানুষ আছেন যাদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ অর্থ রয়েছে প্রচুর।
শিল্পপতি, বড় বড় ব্যবসায়ী ও সচ্ছলরা মিলে বেসরকারি পর্যায়ে সহায়তা তহবিল গড়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিসর বাড়ানোর কথা আমলে নিতে পারেন। যাদের কথা উল্লেখ করলাম তারা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মানবিক সহায়তার হাত যদি বাড়ান, তাহলে তাদের ওপর খুব একটা চাপ পড়বে না; কিন্তু বিপুল জনগোষ্ঠীর কল্যাণের পথ সুগম হবে। একই সঙ্গে সরকারকেও ভাবতে হবে, কীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ এর বাইরেও যাদের জীবন-জীবিকায় শক্ত টান পড়েছে, তাদের জন্য পৃথক তহবিল গড়ে কঠোর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করে সহায়তা কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়। আমাদের সমাজে এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়, যাদের চলার মতো সঞ্চয় নেই; কিন্তু তারা কারও কাছে হাত পাততে পারেন না। চিন্তা-পরিকল্পনার আওতায় এসব মানুষকেও আনতে হবে। সংবাদমাধ্যমে দেখছি, কীভাবে করোনা দুর্যোগ মোকাবিলা করছে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে অসাধু দায়িত্বশীলরা নিজেদের আখের গোছাতে কতটা নগ্ন হতে পারে; এই তিক্ত অভিজ্ঞতাও আমাদের আছে।
বস্তি, উপকূল, হাওরাঞ্চল, দলিত, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ বলতে গেলে কোনোরকমে টিকে আছেন। এ জনগোষ্ঠীর মানুষ শুধু যে খাবার কিনতে হিমশিম খাচ্ছে, তা-ই নয়; বিরাট এক অংশের মানুষ ধারদেনা করে তা পরিশোধ করতে পারছেন না। উপরন্তু আরও ঋণের জন্য তাদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে ব্যক্তি পর্যায় বা সংস্থার কাছে। সুদের বোঝা ঘাড়ে নিচ্ছেন ঋণ গ্রহণের সঙ্গে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার তাদের বিপন্ন-বিপর্যস্তদের পাশে দাঁড়াতে নির্দেশনা দিতে পারে। গতবার কোনো কোনো এনজিও সহায়তামূলক কিছু কর্মসূচি নিয়েছিল এবং এর সুফল কিছুটা হলেও মানুষ ভোগ করেছিল। করোনা দুর্যোগ জাতীয়ভাবে যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে। এও সত্য, যারা আগে বিপন্নদের কাতার ছিলেন না; গত এক বছরে তাদের অনেকেই বিপন্ন জনগোষ্ঠীভুক্ত হয়েছেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মী অনেকের একই অবস্থা। এর মধ্যে প্রবাসফেরত মানুষের সংখ্যাও কম নয়। প্রবাসীরা তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেনই; সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিরও ক্ষতি হয়েছে তারা চলে আসায়। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান তো অর্থনীতিতে কম নয়।
বৈশ্বিক বিপদ করোনার অভিঘাত আরও নানা দিকে লেগেছে প্রকটভাবে। তা যে আরও প্রকট হবে, তাতে সন্দেহ নেই। এ জন্য প্রয়োজন জাতীয় পরিকল্পনার ভিত্তিতে আমাদের আগামীর কর্মপন্থা আরও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা। তাই দুর্যোগ মোকাবিলায় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি পর্যায়ের অংশগ্রহণের জন্য সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তবে সহায়তা তহবিল গঠন করাই চূড়ান্ত কথা নয়। এর সার্বিক ব্যবস্থাপনাও সুচারু করা জরুরি। ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি দুর্নীতির মতো ব্যাধির বিস্তার ঘটায়- আমাদের সামনে এমন দৃষ্টান্তও কম নেই। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষায় সময় ক্ষেপণ না করে এখনই যথাযথ উদ্যোগ-ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
রমজান আসন্ন। বাজারে উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবি কার্যত সিন্ধুর মাঝে বিন্দুর মতো। তাদের কার্যক্রম, পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা সবই প্রশ্নবিদ্ধ। বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীরা বসে নেই। তারা তাদের মতো অপকৌশল চালিয়ে ভোক্তার পকেট কাটতে ব্যস্ত। আলোচানায় বারবার উঠে আসে অদৃশ্য শক্তি সেই সিন্ডিকেটের কারসাজি। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের গত্যন্তর কী?
চলতি বছরের শুরুতে জাতীয় মূল্যস্ম্ফীতি বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছিল খাদ্য মূল্যস্ম্ফীতিও। ক্রমাগত খাদ্য উপখাতে মূল্যস্ম্ফীতি বৃদ্ধি বাজারকে করছে বেসামাল। আমরা ক্রমাগত বলে আসছি, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে দরকার সরকারের দায়িত্বশীল সব মহলের সমন্বয় ও কঠোর নজরদারি। একই সঙ্গে দরকার সরবরাহ ব্যবস্থার পথ মসৃণ রাখা। সরকারের দায়িত্বশীলরা বলেছেন, কোনো পণ্যের ঘাটতি নেই; সরবরাহেও ত্রুটি নেই। তাহলে প্রশ্ন- বাজারে কেন এ উত্তাপ? কেন অসাধুদের মূলোৎপাটন করা যায় না? তাহলে বাজারের নাটাই কার হাতে? একদিকে করোনার থাবা, অন্যদিকে রমজানের বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে অসাধুরা নিজেদের উদরপূর্তিতে ব্যস্ত। প্রায় সব ক্ষেত্রেই কঠোর হুঁশিয়ারি যেন শুধুই উচ্চারণসর্বস্ব। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পরও অনেক ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনায় হযবরল পরিস্থিতি দেখা গেছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে যেন ফের সেই চিত্র দেখতে না হয়, সে জন্য সরকারকে সময় ক্ষেপণ না করে করণীয় সব নিশ্চিত করা জরুরি।
দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গত এক বছরের বাস্তবতার নিরিখে আগামী বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টিও আমলে রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু প্রকল্প আছে বটে; কিন্তু এসব প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, নজরদারি ও প্রকৃত ভুক্তভোগীদের অন্তর্ভুক্তিকরণ ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন আছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্গে যারা সংশ্নিষ্ট, তাদের কেউ যাতে অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতা-দুর্নীতির স্পর্শে স্পর্শিত না হতে পারেন, এ জন্য দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের বিষয়কে প্রাধান্য দিতেই হবে। করোনার দ্বিতীয় অভিঘাত তাদের জন্য আরও বড় সংকটের ক্ষেত্র তৈরি করল। তাদের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন কিংবা কর্মসূচি গ্রহণই যেন শেষ কথা না হয়। এ সবকিছুর যথাযথ বাস্তবায়নের মধ্যেই রয়েছে তাদের জীবনমান উন্নয়নের চাবিকাঠি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
