প্রায় গোটা বিশ্ব যখন করোনায় আক্রান্ত, তখন এর প্রতিষেধক ভ্যাকসিনের উদ্ভাবন আশার আলো দেখালেও একই সঙ্গে ভ্যাকসিনের চাহিদার ব্যাপকতায় এর প্রাপ্তি নিয়ে শঙ্কাও তৈরি করেছিল। সেই শঙ্কা যে অমূলক ছিল না, বর্তমান পরিস্থিতি এরই সাক্ষ্যবহ। ওষুধ প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভ্যাকসিন উৎপাদক প্রতিষ্ঠান। তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি ও ভারত সরকারের সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা আমাদের জন্য স্বস্তির বিষয় হিসেবে বিবেচিত- মূল্যায়িত হলেও একই সঙ্গে আমাদের আরও কিছু বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখা প্রয়োজন ছিল। একটা মাত্র উৎসের ওপর নির্ভর করাটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল বলে মনে করি না। এত অল্পসংখ্যক ভ্যাকসিন হাতে নিয়ে ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম শুরু করাটা ছিল অপরিপকস্ফ সিদ্ধান্ত। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, সেরামের ভ্যাকসিন কেনায় তিন পক্ষের স্বাক্ষরিত চুক্তিতেই দায়মুক্তির বিষয়টি রয়েছে। অর্থাৎ কোনো পক্ষ যদি বিশেষ কোনো পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে কেউ দায়ী থাকবে না।

শুরু থেকেই ভারতের করোনা পরিস্থিতি খারাপ ছিল। ক্রমান্বয়ে তা অধিকতর খারাপ হওয়ায় তারা ভ্যাকসিন রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে ভারতের সার্বিক করোনা পরিস্থিতি আরও খারাপ। একই সঙ্গে সেখানে করোনার 'নতুন ধরন'ও পাওয়া গেছে। বিপর্যয় কিংবা দুর্যোগ বলে-কয়ে আসে না সত্য; কিন্তু করোনা পরিস্থিতি নিয়ে প্রায় গোটা বিশ্বই রয়েছে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে। নিশ্চয়ই আমাদের সরকারের নীতিনির্ধারকদের অবস্থানও তা-ই ছিল বা আছে। ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশে যখন করোনা সংক্রমণের বিস্তার ঘটছিল, তখনই আমাদের সরকারের নীতিনির্ধারকদের উচিত ছিল অন্য উৎসের দিকে হাত বাড়ানো এবং ভ্যাকসিন সংগ্রহে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে সংগ্রহের বিষয়টি নিশ্চিত করা। সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন দুই ডোজ নেওয়ার আবশ্যকতার কথা অজানা ছিল না। এ অবস্থায় প্রথম পর্যায়ে যাদের নিবন্ধিত করা হলো, তাদের একই ভ্যাকসিন দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া যাবে কিনা এই সমীকরণও সঠিকভাবে যে করা হয়নি তা-ও এখন প্রতীয়মান।

এখন পর্যন্ত করোনার যেসব ভ্যাকসিন আবিস্কৃত হয়েছে, সেসবের কার্যকারিতা যে শতভাগ নয়, তা প্রতিটি উৎপাদক সংস্থাই বলেছে। কোনোটা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ, আবার কোনোটা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ কার্যকর। সেই অনুপাতে গড়ে ২০ ভাগ ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। তা ছাড়া সব ভ্যাকসিনই একইভাবে কিংবা প্রক্রিয়ায় তৈরি নয়। কাজেই যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ ভ্যাকসিন পেয়েছেন, তাদের দ্বিতীয় ডোজও তা-ই পেতে হবে- এটি হলো সরল বিশ্নেষণ। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত সংবাদে জানা গেছে, আমাদের হাতে অ্যাস্ট্রাজেনেকার যে ভ্যাকসিন মজুদ আছে, তাতে সবার দ্বিতীয় ডোজ পাওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি পড়তে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে- যদি তা-ই হয়, তাহলে করণীয় কী? প্রথম ডোজগ্রহীতা দ্বিতীয় ডোজ যাতে একই ভ্যাকসিন পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। ভারতের বিদ্যমান এ পরিস্থিতিতে সেরাম ইনস্টিটিউট যদি আমাদের চুক্তিমাফিক এখন সব ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে নাও পারে, অন্তত দ্বিতীয় ডোজের জন্য যে সংখ্যক ভ্যাকসিন প্রয়োজন, সেই ভ্যাকসিন সেখান থেকে আনার ব্যবস্থা করতে হবে উভয় দেশের সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমে। আমার মনে হয়, ভারতের সঙ্গে আমাদের যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান, তাতে তাদের সংকট সত্ত্বেও দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আলাপ-আলোচনায় আমাদের সংকট নিরসনের পথ খুলতে পারে।

সরকারের একজন মন্ত্রী বলেছেন, সেরাম যদি চুক্তি অনুযায়ী আমাদের ভ্যাকসিন দিতে না পারে, তাহলে টাকা ফেরত দেবে। প্রশ্ন হচ্ছে- টাকা ফেরত পেয়ে কী হবে? টাকা কি ভ্যাকসিনের পরিবর্তে মানুষের দেহে প্রয়োগ করা যাবে? এখন আমরা অন্য উৎস থেকে ভ্যাকসিন আনার ও একই সঙ্গে নিজেরা উৎপাদনের জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছি। আমি মনে করি, এ দুই প্রক্রিয়াই বড় বেশি বিলম্বে শুরু হলো। এ প্রক্রিয়া যদি আরও সাত-আট মাস আগে শুরু হতো, তাহলে আজ আমাদের ভ্যাকসিন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো না। চীন বা রাশিয়ার ভ্যাকসিন চাহিদার নিরিখেই পরিকল্পনা করে সংগ্রহের লক্ষ্যে এগোতে হবে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ কোম্পানি সিনোফার্মের তৈরি করোনা ভ্যাকসিনের জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সুতরাং চীন থেকে ভ্যাকসিন নিতে সংশয় নেই। চীনের সঙ্গে দ্রুত এ ব্যবহারে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা জোরদার করুন। আমেরিকার মতো দেশও পাঁচ-ছয়টি উৎস থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহের তৎপরতা প্রথম থেকেই নিয়েছিল। এ রকম দৃষ্টান্ত আরও আছে। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সংশ্নিষ্ট অন্য মহল এসব ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা-বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারেনি। আমরা যদি এখন নিজেরা উৎপাদনে যাই, তাহলে উৎপাদন সহায়ক কাঁচামাল-প্রযুক্তির ব্যাপারে আমাদের অন্য দেশের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হবে। এসব ব্যাপারে কি যথাযথভাবে ভেবেচিন্তে এগোনো হচ্ছে? অবকাঠামোগত দিকটিও একই সঙ্গে ভাবতে হবে। দেশি কোম্পানি গ্লোব বায়োটেকের ভ্যাকসিন 'বঙ্গভ্যাক্স' শেষ পর্যন্ত উৎপাদন পর্যায়ে যাবে কিনা তা নিয়ে ধোঁয়াটে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, ভ্যাকসিনের মেধাস্বত্ব উন্মুক্ত হচ্ছে। ভ্যাকসিনের বৈশ্বিক উৎপাদন বাড়ানোর পক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ব্যাপারে ইতোপূর্বে আহ্বান জানিয়েছিলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের 'ক্রাইসিস' (!) আছে। অন্য যেসব দেশ অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন উৎপাদন করে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ভারতের কাছে ৩০ লাখ ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪০ লাখ ভ্যাকসিন চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এসবই খুব বিলম্বিত ভাবনা কিংবা বোধোদয় কি নয়?

রাশিয়ার 'স্পুটনিক-ভি' যথেষ্ট কার্যকর ভ্যাকসিন, তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত। এই ভ্যাকসিন সংগ্রহে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা জরুরি। আমাদের এক মন্ত্রণালয় থেকে অন্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর থেকে অধিদপ্তরে চিঠি চালাচালি কিংবা কার্যক্রমের শিথিল প্রক্রিয়ার বৃত্ত ভেদ করে রাশিয়া-চীন এই উভয় উৎসের সঙ্গেই দ্রুততার সঙ্গে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভ্যাকসিন আনার ব্যবস্থা করা উচিত। পরিস্থিতি বিবেচনায় জরুরি কথা হলো- যে উৎসের সঙ্গেই আমাদের চুক্তি হোক না কেন, দ্রুত যাতে ভ্যাকসিন দেশে পৌঁছে, সে লক্ষ্যে তৎপরতা চালাতে হবে।

দেশের সবাইকে যে কোনো মূল্যে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতেই হবে। ভ্যাকসিন নিলেই সংক্রমণ প্রতিরোধে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে গেলাম, তা নয়। ভ্যাকসিন নিলে একটা প্রতিরোধ শক্তি শরীরে গড়ে উঠবে এবং সংক্রমণের কবলে পড়লেও তা বিপজ্জনক পর্যায়ে না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তা ছাড়া একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধির যথাযথ অনুসরণও অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে আমাদের যে পরিস্থিতি, তা উদ্বিগ্ন না করে পারে না। কোনোভাবেই মানুষকে বোঝানো যাচ্ছে না- প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। গতবার লকডাউনে স্বাস্থ্যবিধি যাতে মানুষ মেনে চলে, এজন্য সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানো হয়েছিল এবং এর সুফলও মিলেছিল। কিন্তু এবার লকডাউনের সুফল কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মিলেছে বলে মনে করি না। কেন এবারও একই লক্ষ্যে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানো হয়নি, তাও বোধগম্য নয়। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে মাস্ক 'সামাজিক ভ্যাকসিন' হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু এই মাস্ক ব্যবহারে এখনও অনেককেই যেভাবে নির্লিপ্ত দেখা যায়, তাও বিস্ময়কর। সংবাদমাধ্যমেই দেখি, অনেকেই চলাফেরা করছেন মাস্ক ছাড়া, আবার অনেকেই মাস্ক ব্যবহার এমনভাবে করছেন, যা ব্যবহার করা না করার শামিল। মানুষ এখন এ ব্যাপারে জানে সবই, কিন্তু অনেকেই মানে না! আমাদের সংক্রমণ হার এখন সামান্য কম দেখা গেলেও একই সঙ্গে প্রশ্ন দাঁড়ায়, পরীক্ষার হারও কি কমেনি? সামনে ঈদুল ফিতর। আমাদের জনপরিসরে যে উদাসীনতা, খামখেয়ালিপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে যে কোনো সময় সংক্রমণ ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। ভ্যাকসিন নিয়ে যে শঙ্কা-বিভ্রান্তি জনমনে তৈরি হয়েছে, তা দূর করার দায়িত্ব সরকারের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, বিভাগের মধ্যে বিরাজমান সমন্বয়হীনতা ঘোচাতে হবে।

ভারতে যে নতুন ধরনের করোনার সন্ধান মিলেছে, তা আমাদের জন্য শঙ্কার কারণ। আমাদের সঙ্গে ভারতের স্থলসীমান্ত বিস্তৃত। ইতালি ও আফ্রিকার ধরন আমাদের এখানে ছড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতা ছিল, তাতে সংশয় নেই। বিদেশ প্রত্যাগতদের ক্ষেত্রে নিয়মকানুনের শিথিলতা বরং বলা ভালো, এক ধরনের উপেক্ষা আমাদের বিস্ম্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতিতে ফেলেছিল। এখনও আবার সেই শঙ্কাই দেখা দিয়েছে ভারতে করোনার নতুন ধরনের সন্ধান ও সংক্রমণ বিস্তৃতির কারণে। এবারও যদি আমাদের দায়িত্বশীলরা করণীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে সতর্ক-সজাগ-কঠোর না হন, তাহলে আমাদের এখানে দুর্যোগের ছায়া বিস্তৃত হতে পারে।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন