ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উদ্যোক্তা হওয়ার মূলমন্ত্র

অন্যদৃষ্টি

উদ্যোক্তা হওয়ার মূলমন্ত্র

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২১ | ১৮:৩৫ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২১ | ২০:৫৭

করোনা মহামারিতে লাখো স্বপ্নপূরণের পথিক আজ যেন দিশেহারা ও ক্লান্ত। যারা ভেবেছিল শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরিতে প্রবেশের মাধ্যমে পরিবারের হাল ধরবে, আজ তারাই চার দেয়ালে বন্দি। করোনাকালে চাকরি পাওয়া তো দূরের বিষয়, চাকরির বিজ্ঞাপনই যেন সোনার হরিণের রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতি চার যুবকের মধ্যে একজন বেকার রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা মহামারিতে শিক্ষিত যুবকরা একদিকে কর্ম পাচ্ছে না, অন্যদিকে তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে।

সরকারি চাকরির বিজ্ঞাপন বন্ধ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই, প্রবাসীদের দেশে ফেরত আসা সব মিলিয়ে কর্মসংস্থানের হযবরল অবস্থা। এমতাবস্থায় তরুণদের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে তা বলা কঠিন। আবার তরুণরা উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখলে তাদের মনে হাজারো প্রশ্ন বাসা বাঁধে। তাদের প্রশিক্ষণ দেবে কে, কোথা থেকে আসবে অর্থ, উদ্যোক্তা হয়ে যদি সফল হওয়া না যায়-এ ধরনের নানান প্রশ্ন। এসব ভেবে একসময় উদ্যোক্তা হওয়ার লালিত স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে। উদ্যোক্তা হওয়ার প্রধান অস্ত্র মনের শক্তি। একজন পশু পালন গ্র্যাজুয়েট হিসেবে আমি বলব সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনাই পারে শিক্ষিত যুবকদের বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে। সঠিক দিকনির্দেশনা এবং বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান না থাকার কারণে শিক্ষিত যুবকরা সহজে উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারছে না।

উদ্যোক্তা হওয়ার আগে কিছু বিষয় জেনে নেওয়া খুবই জরুরি। ছোট উদ্যোক্তারা কীভাবে মুরগি পালন করে, গরু মোটাতাজা করে, মাছ ও হাঁসের সমন্বিত চাষ করে কীভাবে সফল হলো তা শুনে মনের মাঝে গেঁথে ফেলতে হবে। খামারিরা কঠিন পরিস্থিতিগুলো কীভাবে মোকাবিলা করেছেন এবং কিছু মানুষের রক্তচক্ষু চাহনি ডিঙিয়ে কীভাবে তারা আজ সফল তা শুনতে হবে এবং নিজের মনের আকাঙ্ক্ষা ও সাহস বাড়াতে হবে। নিজেকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে চাইলে সুশৃঙ্খল এবং মনকে স্থির করতে হবে। শত পাহাড় পেরিয়ে এবং মনের ভাবনাগুলোকে প্রস্ম্ফুটিত করার জন্য প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী মেলা এবং ওয়াপসা কর্তৃক আয়োজিত মেলায় যোগ দেওয়া উচিত। সরকারি এবং বেসরকারি কাজে নিযুক্ত অভিজ্ঞ পশু পালন কর্মকর্তা এবং ভেটেরিনারি সার্জনদের পরামর্শ নিতে হবে। পাশাপাশি প্রাণী সম্পর্কিত বিভিন্ন বই পড়তে হবে। শুধু মনে মনে ভাবলে ভালো উদ্যোক্তা হওয়া যায় না। তার চলাফেরা এবং সুদূরপ্রসারী ভাবনার মাঝে থাকতে হবে ইতিবাচক মন-মানসিকতা। এই লক্ষ্যে দেখতে হবে কৃষি দিবানিশি, কৃষি ও জীবন, কৃষিকথা, মাটি ও মানুষ এবং দীপ্ত কৃষি ইত্যাদি অনুষ্ঠান, যা ইতিবাচক ভাবনাগুলোকে ইস্পাতের মতো ধারালো করবে। শত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এবং জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নিজেকে শ্রেষ্ঠ কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে আশাবাদী হতে হবে। তাই এই সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জনের জন্য যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন মেয়াদি কর্মশালায় এবং একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ ও গবাদি পশু পালন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হবে।

অনেকে ভাবেন, আমার তো এত টাকা নেই। আমি কি পারব ব্যবসা করতে? এমন হাজারো প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে যায় উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নটুকু। মনে রাখবেন, উদ্যোক্তা হতে হলে মোটা অঙ্কের টাকা লাগে না, লাগে শুধু অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং আকাঙ্ক্ষা। তাই অল্প মূলধন দিয়ে আপনিও হতে পারেন একজন শ্রেষ্ঠ কৃষি উদ্যোক্তা। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তাদের খামার স্থাপনে উদ্বুদ্ধকরণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। তাছাড়া কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে থাকে।

স্বপ্নকে মনের মণিকোঠায় বন্দি রাখলে হবে না, এর উত্তম পরিচর্যার মাধ্যমে নিজেকে প্রস্ম্ফুটিত করে তুলতে হবে এবং নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভা জাগ্রত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, জীবনের কোনো পথ মসৃণ নয়। রক্তমাখা পথ পেরিয়ে, বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে, সমাজের কিছু মানুষের রক্তরাঙা চাহনিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলতে হবে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন যে ছিল, সেই স্বপ্নই আজ আশার পথ দেখায়।

কৃষিবিদ ; ব্যবস্থাপক, ঢাকা ব্রিডার্স অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড
nazmul36505@gmail.com

আরও পড়ুন

×