ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে অসহায় নারী

মধ্যপ্রাচ্যে অসহায় নারী

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৭:৩৫ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৫:৫৩

মধ্যপ্রাচ্যের সবকিছু জেনেও সভ্যতার বাইরের এতটা অনিরাপদ জনপদে আমাদের দেশের অসহায় মেয়েদের পাঠিয়ে আমরা কতটা অন্যায় করেছি, তা কি ভেবে দেখছি। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাত মাইগ্রেন্ট শ্রমিকরা, যারা বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে পাঠায়। দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখা মানুষগুলো কতটা নির্যাতিত, নিগৃহীত, নিপীড়িত তার ভয়াবহ চিত্র জানা যায় বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া খবর ও ভিডিও ফুটেজে। বিলিয়ন ডলার আয় করা সেসব মানুষের প্রবাস জীবনের অত্যাচারের গা শিউরে ওঠা নির্মম কাহিনিগুলো কেন যেন রাষ্ট্রযন্ত্র অথবা সাধারণ মানুষ কারও চেতনাকেই খুব বেশি স্পর্শ করে না। অনেক কিছু নিয়ে আবেগ থাকলেও ভাগ্যহত সেই মানুষগুলো আমাদের হৃদয়ানুভূতিতে তেমন দোলা দিতে পারে না। মৃত্যুর ৫৩ দিন পর সৌদি আরব থেকে লাশ হয়ে ফিরেছে মানিকগঞ্জের হতভাগ্য নাজমা। এই মেয়েটি জীবিত থাকা অবস্থায় দেশে আসার জন্য ছটফট করেছে, বাঁচতে চেয়েছে, বাঁচার জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছে। গৃহত্যাগী এই নারী কিছুটা সচ্ছলতার জন্য গৃহকর্মী হিসেবে চাকরি করতে গিয়েছিল বিদেশে, বর্বর সেই দেশ তাকে বাধ্য করেছিল যৌনদাসী হতে। যাদের ভাগ্য কিছুটা সুপ্রসন্ন, তারা সল্ফ্ভ্রমসহ সবকিছু হারিয়ে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে দেশে ফিরতে পেরেছে অর্ধমৃত জীবনটা নিয়ে। বাকিদের ভাগ্য নাজমার মতোই, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়েছে। গত দশ মাসে সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশ থেকে ১১৯ জন হতভাগ্য নারীকর্মী লাশ হয়ে ফিরেছে দেশে, যাদের বেশিরভাগই যৌন নির্যাতনসহ অন্যান্য নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে অথবা নির্মমভাবে তাদের হত্যা করেছে সে দেশের মানুষ নামের ঘৃণ্য জীবগুলো। পেট্রো ডলারের দাপট আর সারা পৃথিবীর ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হজের টাকায় এরা উন্মাদনার শেষ পর্যায়ে চলে গেছে। দরিদ্র দেশ থেকে গৃহকর্মীর নাম করে এসব অসহায় নারীকে নিয়ে বিকৃত আদিম আনন্দে উলল্গসিত তারা। অথচ তাদের দেশে আছে শরিয়া আইন। এই আইন প্রয়োগ হয় শুধু প্রবাসী আর রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যারা কথা বলে, তাদের জন্য। নির্যাতনের অভিযোগে শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, এমনকি পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্র যেখানে সৌদি আরবে নারী পাঠানো নিষিদ্ধ করেছে, সেখানে আমরা উল্টো চুক্তি করেছি তাদের সঙ্গে। চুক্তির আওতায় একজন নারী শ্রমিক পাঠালে তবেই একজন পুরুষ শ্রমিক নেবে তারা। কতটা অসম্মানিত চুক্তি। আমাদের দেশের মানুষরা জন্ম থেকেই জেনে আসছে, সৌদি আরব পবিত্র স্থান, সেখানে গিয়ে মরলে জান্নাত নিশ্চিত। তাই সেখানকার মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিজেদের জান্নাত হারানোর ভয়ে আমরা চুপ করে থাকি। অসহায় নাজমাদের জন্য এ দেশের তৌহিদি জনতার অনুভূতি জাগ্রত হয় না। কারণ দেশটা সৌদি আরব বলে কথা। অথচ অসভ্য সে দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধগুলো প্রতিনিয়ত সংঘটিত হচ্ছে। এ সত্যটুকু অনেকের বুঝতে, মানতে ও উচ্চারণ করতে কষ্ট হয়। এরা বড় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের দালাল, দরিদ্র দেশের নাগরিকদের মিসকিন, ভৃত্য, চাকর মনে করে। এরা অতি উগ্র, অত্যাচারী। ধর্মীয় লেবাসের অন্তরালে এরা কুৎসিত মানসিক বিকারগ্রস্ত এক একটা যৌন-উন্মাদ। সেই পুণ্যভূমিতে ধর্ষকের বিচার হয় জনসমক্ষে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে। অথচ আমাদের দেশের হতদরিদ্র নারীরা নিত্য ধর্ষিত হতে থাকে প্রতি মুহূর্তে, যার কোনো বিচার হয় না। আমরা মধ্যম আয়ের দেশের গল্প করি, প্রবাসী রেমিট্যান্সের গর্ববোধ করি। কিন্তু কী সহজেই আমাদের দেশের একটু সচ্ছলতার আশায় সেখানে যাওয়া অসহায় সন্তানরা ক্ষুধার্ত নেকড়ের খাদ্যে পরিণত হচ্ছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশেই নারীদের পাঠানো নিষিদ্ধ করা হোক। আমাদের জনশক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে, যেন পৃথিবীর অন্যান্য সভ্য দেশে তারা সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। বিদেশে বসবাসরত সব নাগরিকের সম্মান এবং অধিকার সুরক্ষিত, সমুন্নত থাকুক- এই প্রত্যাশা অন্যায্য নয়।
শিক্ষক

আরও পড়ুন

×