ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাদ যায়নি মন্দিরও

হেফাজতের সহিংসতা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাদ যায়নি মন্দিরও

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২১ | ১৯:৩১ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৫:৫৫

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলায় ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর কওমি মাদ্রাসা ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সমাবেশ থেকে একযোগে হিন্দু বাড়িতে হামলা হয়। ভাঙচুর ও লুটপাট চলে দুই শতাধিক বাড়িঘর এবং ১৫টি মন্দিরে। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে অনেকবার সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দিলেও কখনও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেনি। এমনকি ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় হিন্দু-মুসলমান মিলে এখানকার মন্দিরগুলো রক্ষা করেছিল। গত রোববারের হেফাজতে ইসলামের হরতালে এই প্রথম মন্দিরে আঘাত এলো। ১২০ বছরের প্রাচীন আনন্দময়ী কালী মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ হয়েছে সারা শহরেই। সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘরেও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার হেফাজতকর্মীদের তাণ্ডবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সোমেশ রঞ্জন রায় জানান, সরাইল উপজেলার কালিকচ্ছের বসন্ত কুমার তলাপাত্রের দানকৃত জমিতে ১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আনন্দময়ী কালীবাড়ি মন্দির। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এ মন্দিরে সারা বছর ধরেই চলে। অন্য ধর্মের লোকেরা অবসর সময়ে মন্দির প্রাঙ্গণে এসে নিরিবিলি সময় কাটান। এই মন্দিরটিতে হামলা স্থানীয় সাধারণ হিন্দু-মুসলমান সবাইকে বিস্মিত করেছে।
গত রোববারের হামলার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মন্দিরের পুরোহিত জীবন চক্রবর্তী বলেন, 'সেদিন ছিল দোল পূর্ণিমা উৎসব। আমি ও আমার পিতা পুরোহিত মদন মোহন চক্রবর্তী পূজায় বসেছি। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটের দিকে নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার স্লোগান দিয়ে পাঞ্জাবি-টুপি পরিহিত ১৫-২০ জনের একটি দল লোহার প্রধান গেট ভেঙে মন্দিরে প্রবেশ করে হামলা চালায়। মোদি (ভারতের প্রধানমন্ত্রী) কালী পূজা করে- এই বলে তারা কালী মন্দিরে ভাঙচুর শুরু করে। হামলাকারী এক যুবকের হাতে বালতি ছিল যাতে সাদা পাউডার। তবে তারা মন্দিরে ভাঙচুর করে স্বর্ণালংকার লুট করলেও আগুন দেয়নি।'
গতকাল দুপুরে আনন্দময়ী কালীবাড়িতে কথা হয় জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও আয়কর উপদেষ্টা সোমেশ রঞ্জন রায়ের সঙ্গে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, 'আজকে প্রয়াত বড় হুজুর হজরত মাওলান সিরাজুল ইসলাম এবং মুফতি নুরুল্লাহ হুজুর বেঁচে থাকলে কালী মন্দিরে ন্যক্কারজনক এই ভাঙচুরের ঘটনা ঘটত না।'
জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা দিলীপ নাগ দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মনির হোসেন বলেন, হেফাজতের কাছে মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কেউ যেমন নিরাপদ নয়, তেমনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও যে নিরাপদ নয় গত রোববার মন্দিরে হামলার ঘটনা তারই ইঙ্গিত।
'একাত্তরের মতোই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে' :গতকাল বিকেলে হেফাজতকর্মীদের ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করেছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে যেভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। বিশ্বাস করা যায় না, এমন ধ্বংসযজ্ঞ তারা চালিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুনর্নির্মাণ করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
আরও চার মামলা, গ্রেপ্তার ২১ :পুলিশ জানায়, সদর উপজেলার বুধল এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনায় ও হাইওয়ে থানায় হামলার ঘটনায় সদর থানায় তিনটি এবং সরাইলে সহিংসতার ঘটনায় সরাইল থানায় একটি মামলা হয়েছে। এই চারটি মামলায় অজ্ঞাতনামা সাড়ে পাঁচ হাজার লোককে আসামি করা হয়েছে। এ নিয়ে সহিংসতার ঘটনায় মোট ১১টি মামলা হলো। সদর মডেল থানার ওসি আবদুর রহিম বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় সদর থানায় ৮টি মামলা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×